গায়ে কী জোর রে বাবা! ধীরেনের মতো জোয়ান লোককে টানতে টানতে নিয়ে গিয়ে ফেলল পাশের ঘরের বিছানায়। উন্মাদিনীর মতো তাকে খাবলাচ্ছে, খিমচোচ্ছে আর বলছে, জানো না কী? জানো না? বদমাশ! শয়তান! জানো না?
ধীরেনের বাঁধ ভেঙেছিল আগেই। এবার ভেসে গেল।
কতটা পাপ হল তা ধীরেন জানে না। কিন্তু কোনওদিন যদি ভগবান তাকে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করেন তা হলে ধীরেনও সপাটে বলবে, আমি কি ইচ্ছে করে করেছি কিছু? আপনিই তো ঠাকুর, ঘটকবাড়ির হারমোনিয়ম খারাপ করে রেখেছিলেন। তাও ভর সন্ধেবেলা। তার ওপর আবার পরদিন ঘটকবাড়ির মেয়েকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসছে বলে তাদের তর সয় না। এই এতগুলো যোগাযোগ এই ত্র্যহস্পর্শ ঠাকুর, আপনি ছাড়া আর কে ঘটাতে পারে? আমি তো সঙ্গেই যেতুম, কিন্তু সত্যকিশোরের খোল বাদ সাধল যে!
পাপবোধটা বড্ড খোঁচা দিচ্ছিল, যখন একটু বেশি রাতের দিকে বরুণ ফিরে এল। তখন ধীরেন নতুন খোল ছাওয়ার কাজটা অনেক এগিয়ে রেখেছে। বরুণ তার মুখখানা ভাল করে দেখল। তারপর মুখটা একটু তেতো করে বলল, রাত হয়েছে বাড়ি যা।
মিদ্দার বোকা লোক নয় যে, টের পাবে না। এসব বাতাসেই টের পাওয়া যায়, টের পেতে চাইলে। খুব দুশ্চিন্তা নিয়ে, দুরুদুরু বুকেই অত রাতে দু মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফিরেছিল ধীরেন। দুশ্চিন্তায় আর ভয়ে রাতে ভাল ঘুম হয়নি। তার মধ্যেও মনস্তাপে বারবার চমকে ঘুম ভেঙে গেছে।
পরদিন অপরাধী মুখ নিয়ে সে যখন গিয়ে মিদ্দারের বাড়িতে হাজির হল তখন কোনও বৈলক্ষণ চোখে পড়ল না। মিদ্দার তার কাজের ঘরে বসে কাজ করছে, বাতাসী ঘরকন্নার কাজ করছে। তাকে দেখে একটু হাসল। খুব মিষ্টি আর মানেওয়ালা হাসি।
একবার হলে পাপ আবার হতে চায়। একবার পর্দাটা সরে গেলে আর ঢাকা-চাপা দেওয়া যায় না কি না।
কিন্তু বরুণ মিদ্দার তো আর নিত্যি নিত্যি সন্ধেবেলা ঘটকবাড়ি হারমোনিয়ম সারাতে যায় না। সুতরাং বাতাসী অন্য পন্থা নিল। রান্নায় মিশিয়ে কী যেন একটা খাইয়ে দিল মিদ্দারকে। সেই খেয়ে মিদ্দারের ছুটল হাগা। একে রোগাভোগা মানুষ, চার-পাঁচবার দাস্ত করেই নির্জীব হয়ে নেতিয়ে পড়ল বিছানায়। গাঁয়েগঞ্জে ডাক্তারের ব্যবস্থা নেই। গ্যাঁদাল থানকুনি ছেঁচে বাতাসীই খাওয়াল তাকে। দুর্বল মানুষটা যখন ঘুমিয়ে পড়ল তখন ফের ব্যাপারটা হল। কী শরীর! কী শরীর বাতাসীর!
তবে ষড়যন্ত্রটা মোটেই ভাল লাগল না ধীরেনের। সে বলল, তুমি খুব পাষণ্ড আছ বাপু। মিদ্দারকে ওষুধ খাওয়ালে, মরেটরে যেত যদি?
যেত তো যেত। মরলে বাঁচি। সারাজীবন ওই নপুংসককে গলায় ঝুলিয়ে বেঁচে থাকব নাকি?
কাজটা ভাল করোনি। এরকম করলে আমি কিন্তু আর আসব না।
ইস্! না এসে পারবে?
পারবে না, সে ধীরেনও জানে। তার তখন নেশা ধরেছে।
বাতাসী একদিন প্রস্তাব দিল, আমাকে নিয়ে পালাবে?
এ প্রস্তাবে আকাশ থেকে পড়ল ধীরেন। বিয়ে করার মতো অবস্থাই তার নয়। বাপ এমনিতেই রোজ চাকরি-বাকরি করার জন্য হুড়ো লাগাচ্ছে। মাও মুখনাড়া দিয়ে তবে দুটি ভাত দেয়। তার ওপর অন্যের বউ ফুসলিয়ে বাড়ি নিয়ে তুললে তো চিত্তির। বাড়িতে কাকচিল বসতে পারবে না। তার ওপর বাতাসীর মতো মেয়েছেলে। এ তো দিনকে রাত করতে পারে। একে বিশ্বাস কী?
সে মিন মিন করে বলল, কাজটা ঠিক হবে না।
কেন হবে না শুনি? তোমার আপত্তি কীসের?
শত হলেও বরুণদাদা আমার গুরু, তার কাছে কাজ শিখছি। তার সঙ্গে নেমকরাহামি করব কী করে?
আহা, সাধুপুরুষ রে! নিমকহারামি যা করার তো করেই ফেলেছ। আমার পেটে তোমার ছেলে। নিমকহারামির আর বাকি আছে কিছু?
খবরটা শুনে ধীরেন অগাধ জলে পড়ল। ঘটনাটা সত্যি হয়ে থাকলে তো জল অনেক দূর গড়িয়েছে। ভয় খেয়ে ধীরেন বলল, আমার চালচুলো নেই বাতাসী, তোমাকে নিয়ে ঘর বাঁধার মতো অবস্থাও নয়।
বাতাসী বলল, তা হলে মিদ্দারকে সরাও। সরিয়ে দুজনে বেশ এখানেই থাকব।
ধীরেন অবাক হয়ে বলে, সরাব? সরাব কোথায়?
আহা, সরানো মানে বুঝলে না? দুনিয়া থেকে সরাও।
ধীরেনের মাথায় বজ্রাঘাত। মেয়েটা বলে কী? এ যে মিদ্দারকে খুন করাতে চাইছে! ভীষণ ভয় খেয়ে সে বলল, ছিঃ, ওসব বোলো না। বলতে নেই। শুনলেও পাপ হয়।
মশা মাছি মারলে যা পাপ হয় ভগবানের দুনিয়ায় মানুষ মারলে তার বেশি হয় না। বুঝলে? যদি পাপের ভয়ে পিছিয়ে যাও তা হলে তুমি বোকা। ভগবানের কাছে মশা, মাছি, পোকা, মানুষ সব সমান।
ধীরেন মাথা নেড়ে বলল, ওসব মরে গেলেও আমি পারব না।
তা হলে কাজটা আমিই করব। তুমি সাহায্য কোরো, তাহলেই হবে।
ধীরেন এ কথায় এত ভয় পেয়েছিল যে বলার নয়।
যে সময়ে তাদের কথা হচ্ছিল সে সময়ে মিদ্দার হাটে গিয়েছিল। ফিরে এসে উঠোনে দাঁড়িয়ে তাদের কথা বলতে দেখে গম্ভীর মুখ করে নিজের কাজের ঘরে গিয়ে ঢুকল। ভারী অপরাধবোধ হচ্ছিল ধীরেনের। একটু আগেই দুপুরবেলা মিদ্দারের বিছানাতেই জড়ামড়ি করে শুয়ে থেকেছে সে আর বাতাসী। দুপুর তুফানের মতো উড়ে গেছে। এখন বড় অবসাদ, বড় পাপবোধ। মিদ্দার বোধহয় সবই টের পায়, তবে কেন ফুঁসে ওঠে না? কেন তাড়িয়ে দেয় না ধীরেনকে? কেন ঝাঁটাপেটা করে না বাতাসীকে?
ধীরেন বড় টানাপোড়েনের মধ্যে পড়ে গেল। কী যে অবস্থা গেছে কদিন তা বলার নয়। কিন্তু আশ্চর্যের কথা এসব কাণ্ড যখন চলছে তখনও কিন্তু বরুণ মিদ্দার শান্ত, চুপচাপ। আপনমনে নিজের কাজ করে যায়। তার ঘর থেকে নানা বাদ্যযন্ত্র পরীক্ষার নানা সুরেলা শব্দ ওঠে। আর কোনওদিকেই যেন মন নেই মিদ্দারের।
