দোকানি স্বপন একটু ঝুঁকে বলল, টর্চ নেবেন বলেছিলেন, নিলেন না তো জ্যাঠা!
ধীরেন একটু তটস্থ হয়ে বলে, নেব বাবা। বড্ড দাম।
চল্লিশ-পঞ্চাশের নীচে ভাল জিনিস নেই যে। দশ-পনেরো টাকার মালে গ্যারান্টি নেই, আলোও হয় না তেমন।
দেখি। আর দু-চারদিন যাক।
আগে টর্চ লাগত না, আজকাল মনে হয় একটা হলে হত। অন্ধকারে সাপ-খোপের ভয় আছে ঠিকই, কিন্তু তার চেয়েও বেশি আজকাল কেমন যেন গা ছমছম করে। দিন দিন গা ছমছমে ভাবটা বাড়ছে আর বরুণ মিদ্দার যেন আজকাল কাছেপিঠেই ঘোরাঘুরি করে, তক্কে তক্কে থাকে। ধীরেন আজকাল এসব টের পায় খুব। গত পঁয়তাল্লিশ বছর বরুণ মিদ্দারের চিহ্নও ছিল না, এখন কেন যে ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছে কে জানে বাবা।
কথাটা পাঁচকান করার মতো নয়। পঁয়তাল্লিশ বছর আগে ধীরেন কাষ্ঠ নামে বাইশ-তেইশ বছরের যে তরতাজা জোয়ান দাপিয়ে বেড়াত তার সঙ্গে এখনকার এই ধীরেন কাষ্ঠর সম্পর্কটাই বুঝতে কষ্ট হয়। কালোর মধ্যেও ভারী নাকি সুন্দর চেহারা ছিল সেই ধীরেন কাষ্ঠর। আর ছিল নানা দিকে মন। ম্যাট্রিক পাসটা করেছিল কোনওক্রমে, তারপর আর পড়া হল না। তবে হাতের কাজে ঝোঁক ছিল খুব। ভাল লাটাই তৈরি করতে পারত, পুতুল গড়ত, মূর্তি তৈরি করতে পারত, কাঠের কাজেও ছিল ভাল হাত। কিন্তু পাঁচ রকম জিনিসে মন দিতে গেলে কোনওটাই তেমন হয়ে ওঠে না। বাবা চরণ কাষ্ঠ তাড়না করত খুব। টাকা আয় না করলে ঘরছাড়া করার হুমকি দিত।
সেই সময়ে পাশের গাঁ শূলপুরে বরুণ মিদ্দারের কাছে গিয়ে জুটল সে। গুণী মানুষ, ঘরে বসে মৃদঙ্গ, খোল, দোতারা এইসব তৈরি করত। বিক্রিবাটা কিছু খারাপ হত না। তবে হাঁফি রুগি বলে সারা বছর কাজ তুলতে পারত না। ধীরেনকে পেয়ে তার সুবিধে হল। ধীরেন চিৎপুর থেকে কাঁচা মাল কিনে আনত, খদ্দের ধরে আনত আর বাকি সময়টা কাজ শিখত।
কিন্তু জীবনটা তো সবসময় সোজা পথে চলে না। হঠাৎ হঠাৎ বাঁক ফেরে। আর তখনই ভাঙন লাগে।
মিদ্দারের ঘরে ছিল কালনাগিনী। যেমন তার লকলকে চেহারা, তেমনই তার ঠাটঠমক। চোখের ভিতর থেকে যেন ইলেকট্রিক ঠিকরে আসত। বাপ রে! প্রথম প্রথম দেখে তো ভয়ই খেয়ে যেত ধীরেন। এই ফুটন্ত যুবতী বউকে সামলায় কী করে রোগাভোগা বরুণ মিদ্দার!
কারণে অকারণে তাদের কাজের ঘরে এসে উদয় হত বাতাসী। দু হাত তুলে খোঁপা ঠিক করত– তাতে বুকখান ঠেলে উঁচু হয়ে উঠত বেশ, অকাজের কথা বলে বলে ভাব করত ধীরেনের সঙ্গে। বরুণ মিদ্দার কিছু বলত না। তবে মুখ দেখে মনে হত বউ নিয়ে তার স্বস্তি নেই।
কিছুদিনের মধ্যেই ইশারা ইঙ্গিত শুরু করে দিল বাতাসী। সুরেলা গলায় উঠোন থেকে হয়তো একটু রসের গান গেয়ে উঠল, বা ছাগলছানাটাকে কোলে নিয়ে এমন সব কথা বলে আদর করত যা ছাগলছানাকে বলার কথা নয়।
সেই বয়সে তখনও ধীরেনের মেয়েমানুষের বউনি হয়নি। বাধোবাধো ভাব তো ছিলই, ভয়ও ছিল বেশ। কীসে পাপ লেগে যায় কে জানে বাবা! কিন্তু ওই দামাল বয়সে বাঁধ রাখাও কঠিন কাজ।
মুশকিল হল বরুণ মিদ্দার ঘর থেকে বেরোত না মোটে। রোগাভোগা মানুষ বলেও বটে আর তার কাজটাও ঘরে বসা কাজ বলেও বটে। ফলে বাতাসীর বিশেষ সুবিধে হচ্ছিল না। ধীরেনও নিজেকে খুব সংযত রাখত। ইশারা ইঙ্গিত পেয়েও চোখ তুলে তাকাত না।
কিন্তু সুযোগসন্ধানীদের কখনও সুযোগের অভাব হয়নি। ভগবানই কি পাপীদের জন্য নানা ফাঁকফোকর তৈরি করে দেন? তাই যদি না হবে তবে হঠাৎ সেদিন সন্ধেবেলা ঘটকবাড়ি থেকে বরুণ মিদ্দারের ডাক আসবে কেন? ঘটকরা বড় মানুষ, ডাকলে না গিয়ে উপায় নেই। মেয়ের স্কেল চেঞ্জার হারমোনিয়ম খারাপ হয়েছে, ফলে তাকে পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে, আজই গিয়ে হারমোনিয়ম সারিয়ে দিয়ে আসতে হবে।
বরুণ মিদ্দার যখন শশব্যস্তে যন্ত্রপাতির ব্যাগ নিয়ে রওনা হচ্ছিল তখন ভালমানুষের মতো ধীরেন বলেছিল, চলুন আমিও সঙ্গে যাই। কাজটা শেখাও হবে।
কথাটা শুনে ঘাড়ও কাত করেছিল মিদ্দার। তারপরই দোনোমোনোতে পড়ে গেল। নিয়তি কেন বাধ্যতে। যে খোলটার কাজ চলছিল সেটা সত্যকিশোর দাসের। মস্ত কীর্তনীয়া। কাজটাও জরুরি। কাল সকালেই সত্যকিশোরের লোক আসবে খোল নিতে। নগদ টাকার কারবার। তাই মিদ্দার একটু ভেবে বলল, হারমোনিয়ম সারাতে সময় লাগবে। তুই বরং খোলটা এগিয়ে রাখ, আমি এসে বাকিটুকু করব।
নিয়তি! নিয়তি ছাড়া আর কী? মিদ্দার কুকুরের মুখের কাছে রসালো মাংসের টুকরো রেখে চলে গেল। আহাম্মক আর কাকে বলে!
বোধহয় পাশের শোওয়ার ঘরে দম বন্ধ করে অপেক্ষায় ছিল বাতাসী। তাকেই কি দোষ দিতে পারে ধীরেন? না, আজও দোষ দিয়ে উঠতে পারে না। উপোসি শরীর, তীব্র অতৃপ্ত কাম কামনা, মনের জ্বালা মানুষের মাথা ঠিক রাখতে দেয় নাকি?
মিদ্দার বাড়ির চৌহদ্দি ডিঙোতে না ডিঙোতেই বাতাসী যেন বাজপাখির মতো উড়ে এল।
অ্যাই!
ধীরেন ধুকপুক করা বুকে নিচু মাথা উপরে তুলেই দেখল দুটো চোখ জ্বল জ্বল করে জ্বলছে। শরীরের ছিলা টান টান।
ধীরেন ভালমানুষের মতো বলল, কী?
যেন ভারী অবাক হয়ে বড় বড় চোখ করে বাতাসী বলল, কী? কী?
তারপরই ছুটে এসে তার ঝাঁকড়া চুল দু হাতে খামচে ধরে ঝাঁকানি দিতে দিতে পাগলের মতো বলতে লাগল, কী? কী? তুমি জানো না কী? তুমি জানো না? ন্যাকা কোথাকার…।
