কিছু চাষিবাসি লোক ক্ষেতের কাজ সেরে ঘরমুখো ফেরার পথে এইখানে চায়ের দোকানে বসেছে বেঞ্চ জুড়ে। তাদের হাতে চায়ের গেলাস আর কোয়ার্টার পাঁউরুটি। তাদের মধ্যে সবচেয়ে জ্ঞানী লোকটি বলছিল, সেবার জাজপুরে যাত্রার আসর বসেছিল, বুঝলি। হই হই রই রই কাণ্ড। রামের বনবাস পালা হচ্ছে। খোদ লালমুখো সাহেব ম্যাজিস্ট্রেট যাত্রা দেখতে এসেছে। আসরের পাশেই চেয়ারে বসা। তা পালা তো শুরু হল। কিন্তু রামের বনবাসে যাওয়া নিয়ে ঘ্যানঘ্যানানি, প্যানপ্যানানি, কান্নাকাটি সাহেবের তেমন পছন্দ হচ্ছিল না। ঠোঁট বেঁকিয়ে হাসছে মাঝে মাঝে ভেড়ুয়াদের কান্নাকাটি দেখে। এমন সময় আসরে নামল বীর হনুমান। হনুমান দেখে সাহেব ভারী খুশি। হ্যাঁ, এতক্ষণে একটা জম্পেস ব্যাপার হল। সাহেব সঙ্গে সঙ্গে হনুমানের গায়ে একখানা দশ টাকার নোট ছুঁড়ে দিয়ে বলে উঠল, মোর হনু। মানে বুঝলি? মানে হল, আরও হনুমান চাই। অধিকারী তো তাড়াতাড়ি ছুটে গিয়ে আর একজনকে হনুমান সাজিয়ে আসরে নামিয়ে দিল। উপায় তো নেই, সাহেবের মর্জি, সাহেব ফের দশ টাকা বখশিস দিয়ে হেঁকে উঠল, মোর হনুমান। অধিকারীমশাই ফের ছুটে গিয়ে আর একজনকে হনুমান সাজিয়ে নামিয়ে দিল। ফের দশ টাকা। সঙ্গে সঙ্গে হুকুম, মোর হনু। সে আমলের দশ টাকা তো কম নয়। টাকার ছড়াছড়ি দেখে তখন রাম সীতা লক্ষ্মণ সবাই গিয়ে হনুমান সেজে এসে আসরে নেমে পড়ল। রামের বনবাস চুলোয় গেল, আসর জুড়ে শুধু হনুমানদের হুপহাপ ধুপধাপ। তা আমাদের অবস্থাও হয়েছে। তাই। যার রামচন্দ্র হওয়ার কথা ছিল, যার সতীলক্ষ্মী সীতা হওয়ার কথা ছিল, যার ভ্রাতৃভক্ত লক্ষ্মণ হওয়ার কথা ছিল সবাই নিজের নিজের পাঠ শিকেয় তুলে হনুমান হয়ে নেমে পড়েছে। দেশ জুড়ে এখন শুধু হনুমানদের দাপাদাপি। তাই বলছিলুম, গান্ধীবাবা আর সুভাষ বোস মিলে যে সাহেবদের তাড়াল তাতে লাভটা কী হল বল তো! এক পয়সার পাঁউরুটি দেড় টাকায় ঠেলে উঠেছে।
বিড়ি ধরানোর গন্ধটা বড্ড ভাল লাগল তার। গন্ধেরও কত রকমারি আছে। মিষ্টি ঝাঁঝালো গন্ধে মনটা চনমনে হয়ে যায়। জ্ঞানী লোকটা বিড়ি ধরিয়ে নিয়ে বলল, বুড়োশিবতলার জলায় এক সাহেবের মোটরগাড়ি কাদায় বসে গিয়ে হাঁসফাঁস অবস্থা। কিছুতেই তোলা যায় না। তখন কাশীনাথ আর শিবনাথ দুই ভাই ক্ষেতের কাজ সেরে ফিরছিল। কাঁধে হাল, হাতে বলদের দড়ি। অবস্থা দেখে দু ভাই নেমে পড়ল কাদায়। দড়ি বেঁধে বলদ দিয়ে টেনে গাড়ি তুলে দিল। তারপর ঠেলে নিয়ে পোঁছে দিল দু মাইল দূরের ডাকবাংলোয়। সাহেব খুশি হয়ে দুই ভাইকে একশো টাকা করে বখশিস দিলেন। তখনকার একশো টাকা বাবা! তার অনেক দাম। দুই ভাই টাকা পেয়ে জমিজিরেত কিনে ফেলল। চাষবাস করে অবস্থা ফিরিয়ে ফেলল লহমায়। গাঁয়ে পুকুর কেটে দিল, শিবমন্দির গড়ে দিল। গায়ে সেন্ট মেখে জুতো মসমসিয়ে যখন রাঁড়ের বাড়ি যেত তখন রাস্তার দুধার থেকে লোকে সেলাম ঠুকত। তাই বলছিলুম, গান্ধীবাবা আর সুভাষ বোস মিলে সাহেব তাড়িয়ে কাজটা ভাল করেননি মোটে। সাহেবরা মাথার ওপর ছিল, সে একরকম। এখন যে কে কখন মাথায় চড়ে বসছে নগেনের পোষা বাঁদরটার মতো কে জানে বাবা! যিনি যখন চড়েন তখন তিনিই আমাদের জো-হুজুর।
ট্রাকটা তেমনই কেতরে কুকুরের মতো ঠ্যাং তুলে আছে। খালাসিটা একখানা চাকা খুলে ফেলে আর একখানা লাগাচ্ছে। তার ওপাশে ঝুপসি গাছগাছালির ফাঁক দিয়ে আলোর চৌহদ্দির বাইরে থেকে ঠেলে উঠছে চাপ বাঁধা অন্ধকার। ফিনফিনে কুয়াশার সঙ্গে মিশে যাচ্ছে চায়ের উনুনের ধোঁয়া আর বাসের চাকায় ওড়া ধুলো। উত্তরে বাতাসে শীতের চোরা টান টের পাওয়া যায়।
মানুষের একটা ফেরা থাকে। কোথা থেকে যে আসে, কোথায় যে ফিরে যায় তার মীমাংসা আজও হল না। দিনশেষে সে বাড়ি ফেরে বটে, কিন্তু এটা ঠিক ফেরা নয়। আর একটা আসল ফেরা আছে তার। সেইটে একটু একটু ভাবিয়ে তোলে তাকে আজকাল।
ধীরেন কাষ্ঠ উঠে পড়ল। পেচ্ছাপের বেগটা আর সামলানো যাচ্ছে না। চাপতে গেলে আজকাল হয়ে পড়ে।
শিশুগাছের তলায় বসে বেগটা ছেড়ে দিয়ে ধীরেন কাষ্ঠ একটা ভারী আরাম পেল। এইসব ছোটোখাটো প্রাকৃতিক কাজের মধ্যেও মাঝে মাঝে একটা ভারী আনন্দ হয় তার। পেচ্ছাপ করার আরামটা কি সবাই টের পায়? কে জানে বাবা! ধীরেন কাষ্ঠ পায়।
ব্যাপারটা যাচাই করার জন্যই সে ভালমানুষের মতো গিরীশ মুহুরিকে জিজ্ঞেস করেছিল, মুতে কেমন আরাম পাও হে গিরীশ?
গিরীশ তখন মাচা থেকে কচি লাউডগা কাটছিল। সুতোয় বেঁধে ভাতে দিয়ে সর্ষের তেল মেখে খেতে চমৎকার। প্রথমে কথাটা বুঝতে পারেনি। তারপর বুঝতে পেরে ভারী চটে উঠে বলল, ও তোমার কেমন কথা ধীরেনদা! মাথাটাই গেছে দেখছি! বলি সব ছেড়ে মুতের খতেন নিতে লেগেছ কেন?
কথাটা আরও দু-চারজনের কাছে যাচাই করার ইচ্ছে ছিল ধীরেনের। কিন্তু আর সাহস পায়নি। আজকাল লোকে বড় খপ করে চটে যায়। অথচ কত কী যে জানতে ইচ্ছে করে, জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করে লোককে।
ফ্যান্সি স্টোর্সের সামনে দাঁড়িয়ে শো-কেসে সাজানো জিনিসপত্র ভারী অবাক চোখে দেখছিল ধীরেন। যত দিন যাচ্ছে কত কী নতুন নতুন জিনিস আসছে। মানুষের যে কত কী লাগে আজকাল! ধীরেনের লাগে না বটে, কিন্তু জিনিসগুলি সম্পর্কে তার অপার কৌতূহল। এই যেমন শ্যাম্পু বা কর্নফ্লেক বা বোতলের কড়াইশুঁটি কি দাড়ি কামানোর ফোম–যত দেখে তত ভাল লাগে তার।
