কবে?
তার কোনও ঠিক নেই। হয়তো আসছে সপ্তাহে, বা তার পরে কোনওদিন। বড়গিন্নি তো তাদের কানে বিষ ঢালতে ছাড়েনি। তাই বড় ভয় হচ্ছে। কী জানি বিষয়সম্পত্তি নিয়ে দাবি তুলবে কিনা।
তাহলে কী হবে মা?
কে জানে কী হবে। সম্পত্তি তো তোর বাবার, আমার নামে দলিলটুকুই যা। তাই ভয় হচ্ছে।
মরণ চুপ করে বসে রইল। ভিতরে যে আনন্দের আলোটা জ্বলে উঠেছিল সেটা ফের নিবে গেল। মরণ ভাবছে। মরণ বড় হচ্ছে।
০৬-১০. বিকেল যখন ঘনিয়ে আসে
০৬.
বিকেল যখন ঘনিয়ে আসে তখন মাঠের ওধারে জড়ামরি গাছপালার ফাঁকে যে কী তুলকালাম একটা কাণ্ড ঘটে যায় রোজ তা কেউ তাকিয়েই দেখে না ভাল করে। আকাশ থেকে আলোর চাকাটা তখন নামতে থাকে আর সেই সময়ে কোথাও কিছু না হঠাৎ একটা ভুতুড়ে মেঘ এসে তিন-চার খণ্ড হয়ে ভাসতে থাকে। আর গাছপালার কালচে রঙের ছায়া থেকে অশরীরীর মতো ভেসে উঠতে থাকে ঘোর ঘোর কুয়াশার মতো, ধোঁয়ার মতো, প্রেতের মতো সব জিনিস। পশ্চিমের আকাশে তখন লাল সাদা কালো মেঘের তুলির টান। দিগন্ত দ্রুত তার আলোর গালিচা গুটিয়ে নিতে থাকে। প্রথমে দীর্ঘ ছায়া দীর্ঘতর হতে থাকে, আর অন্ধকার বুনে চলে কালো এক মাকড়সা। প্রতিদিন এইভাবে দিন যায়, দিন আসে। কেউ ঘটনাটা গ্রাহ্যও করে না তেমন। বাসরাস্তায় ব্যস্ত দোকানপাট অন্ধকার নামতেই দিল না কখনও। পটাপট জ্বলে উঠল আলো। ঝাঁই ঝাঁই করে বেজে যায় কালীপদর ক্যাসেটের দোকানের গান। অষ্টধাতুর আংটি বিক্রি করতে বসা লোকটা একঘেয়ে গলায় তার আংটির গুণের কথা বলে, বিফলে মূল্য ফেরতের ভরসা দিয়ে যাচ্ছে। সেই কবে থেকে। তেলেভাজার গন্ধ ছড়িয়ে দেয় হরিপদ দাস। মাঠের ওধারে নানা দৃশ্য অবতারণার পর আলোর চাকা ডুবে গেল হায় হায় করে। কেউ দেখল না। টেরই পেল না ভাল করে। ধুলো উড়িয়ে দুখানা বাস গেল পরপর। লোক নেমেছে মেলা। বাস-আড্ডায় এখন মেলা লোক, বিস্তর বিকিকিনি। এ সময়টায় তার যে খিদেটা পায় সেটা হল বিস্কুটের খিদে।
মানুষের বুদ্ধিরও বলিহারি যেতে হয়। মাথা খাটিয়ে যে কোন জিনিসে কী প্যাঁচ বের করে তার ঠিকঠিকানা পাওয়া মুশকিল। এই যে নিতাইয়ের দোকানের নিমকি বিস্কুট–শুনতে সোজা হলে কী হয়, বিস্কুটখানা বিস্তর প্যাঁচালো। সে গুণে দেখেছে বিস্কুটখানায় অন্তত আটখানা থাক। পরতে পরতে জুড়ে কী করে যে বানিয়েছে মাথা খাটিয়ে, কে জানে বাবা! যেমন মুচমুচে তেমনই গালভরা স্বাদ। জিব যেন জুড়িয়ে যায়। মাঝে মাঝে এক-আধটা কালোজিরে দাঁতে পড়লে ভারী চমৎকার লাগে। গোটাগুটি কামড়ে খায় না সে। খবরের কাগজের ঠোঙায় বিস্কুটখানা নিয়ে প্রথম কিছুক্ষণ চুপ করে অনুভব করে। ছোঁয়ার মধ্যেও একটা উপভোগ হয় না কি? তার তো হয়। তারপর বিস্কুটখানা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দেখে। এই দেখাটাও খাওয়ারই একটা অঙ্গ। গানের আগে যেমন হারমোনিয়মের প্যাঁ পোঁ আর তবলা বাঁধার ঠুকঠাক। খুব সাবধানে বিস্কুটের ওপরের পরতটা দু আঙুলে ধরে ছাড়িয়ে নেয় সে। পাতলা ফিনফিনে চমৎকার লম্বাটে জিনিসটি টুক করে দাঁতে কামড়ে একটুখানি মুখে নেয় সে। অনেকক্ষণ ধরে চিবোয়। সঙ্গে সুড়ুত করে এক চুমুক চা। কী যে ভাল লাগে তখন! একটা পরত শেষ হলে আর একটা পরত, তারপর আর একটা। মোট আটখানা খেতে খেতে চা কখন শেষ হয়ে যায়। শেষ পরতখানা খাওয়ার সময় মনটা খারাপ লাগে। শেষ হলেই তো শেষ। আরও একখানা যে খাওয়া যায় না তা নয়, তবে সেটা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। এক একখানা বিস্কুট এক এক টাকা।
খাওয়া শেষ হওয়ার পর খাওয়ার রেশটা অনেকক্ষণ মুখের মধ্যে থেকে যায়। তখন চুপটি করে বসে সেটা উপভোগ করতে হয়। গোরু যেমন জাবর কাটে অনেকটা তেমনই। খাওয়াটা ফুরিয়ে গিয়েও যেন ফুরোয় না, তার স্বাদ জিবকে জড়িয়ে ধরে থাকে অনেকক্ষণ। বিস্কুট আর চায়ের স্মৃতি তাকে কিছুক্ষণ আচ্ছন্ন করে রাখে।
মাথাটা কিছু ভুলভুম্বুল হয়েছে আজকাল। কাছেপিঠের কথাই ভুল হয় বেশি। এই যদি হঠাৎ করে আদিগন্ত সব কথাই আচমকা ভুল পড়ে যায় তা হলেও খারাপ কিছু তো নয়। বাড়িঘর, ঠিকানা, বউ, ছেলেপুলে সব ভুলে পাকার হয়ে এই বাস-আড্ডার বেঞ্চে বসে হাঁ করে চেয়ে থাকা সেও কি খারাপ রে বাপু! বেশ জায়গা এটা। আলো-টালো আছে, গান বাজছে, বিকিকিনি হচ্ছে, বাস আসছে যাচ্ছে, মানুষের সঙ্গে বসে মানুষ সুখদুঃখের দুটো কথা কইছে, লোকের গ্যাঞ্জাম। এখানে বসেই কত কী দেখে দেখে সময় কেটে যায়। উত্তর দিকে কখন থেকে একটা মাল-বোঝাই ট্রাক খারাপ হয়ে পড়ে আছে। এখন হ্যাজাক জ্বেলে একটা খালাসি জ্যাক লাগিয়ে হ্যান্ডেল মেরে মেরে সেটা তুলছে। দেখার মতোই দৃশ্য। মানুষের বুদ্ধির কোনও কূলকিনারাই করে ওঠা মুশকিল। কী বুদ্ধি! কী বুদ্ধি! একরত্তি একটা যন্ত্র লাগিয়ে একটা মাত্র রোগাভোগা খালাসি ওই গন্ধমাদন ট্রাকটাকে কেমন তুলে ফেলছে দেখ! ট্রাকটা উঠছে একটু কেতরে। কুকুরে যেমন পিছনের ঠ্যাং তুলে পেচ্ছাপ করে ঠিক তেমনই। যত দেখে তত মুগ্ধ হয় সে। মুগ্ধ হয়, আর ভাবে। ভেবে ভেবে কূলকিনারা পায় না। বুদ্ধি খাটিয়ে খাটিয়ে মানুষ কত কী বানিয়েছে! রেলগাড়ি, হাওড়ার পোল, মনুমেন্ট। এইসব বসে বসে ভাবে সে। আর খুশি হয়। আর ফিচিক ফিচিক হাসে আপনমনে। তার মেজো ছেলের বউ কুসুম সেদিন তার শাশুড়িকে বলছিল বটে, বাবার একটু মাথার দোষ হয়েছে মনে হয়, একলা একলা বসে কেমন বিড়বিড় করে কথা কইছে আর হাসছে গো। দরমার বেড়ার ওপাশ থেকে কথাটা কানে এসেছিল। মাথার দোষ একটু হয়েও থাকতে পারে তার। ভুলভুম্বুল ভাবটা যেন একটু বেড়েই পড়েছে। গোটাগুটি সব ভুলে মেরে দিলে মন্দ হবে না তখন।
