এলোচুলে আধখানা ঢাকা মুখখানা যখন তার দিকে ফিরে তাকাল তখন বাসন্তী দেখতে পেল, বড়বউয়ের মুখখানা কী সুন্দর। যেন লক্ষ্মীপ্রতিমা। কেমন পানপাতার মতো ডৌল, কী সুন্দর নাক, মুখ চোখ। কিন্তু চোখ দুখানা যেন জ্বলছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে। অত বড় বড় চোখ যেন বাসন্তীকে ভস্ম করে দেবে।
বড়বউ একটু হেসে কঠিন হিমশীতল গলায় বলল, এসেছিস! তোর জন্যই বসে আছি। আয়, কাছে আয়… আয়…
আর কাঁদতে কাঁদতে বাসন্তী হামাগুড়ি দিয়ে এগোবার চেষ্টা করছে। বড়বউ, তার কথা মান্যি না করলে উপায় আছে? বাসন্তী কি পারে মান্যি না করে ছুটে পালাতে? সে সাধ্যি তার নেই। কিন্তু সে কাঁদছে, ভীষণ কাঁদছে, আর এগোচ্ছে। কী হবে তা কে জানে। কোন সর্বনাশ!
ও দিদি, মাপ করে দাও, পায়ে পড়ি তোমার… ও দিদি…
নিজের চিৎকারেই ঘুম ভেঙে গেল বাসন্তীর। নিশুত রাতে, ধড়াস ধড়াস করছে বুক, গলা শুকিয়ে কাঠ, গাল বেয়ে চোখের জলের ভাসাভাসি। ঘুমের মধ্যেও কাঁদছিল সে। ভয়ে সে জবুথুবু হয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। তলপেটে হাত রাখল সাবধানে, বাচ্চাটার কোনও ক্ষতি হবে না তো ঠাকুর? রক্ষা করো। বাথরুমে অবধি যেতে পারছিল না ভয়ে।
শেষে মুক্তাকে ডেকে তুলল সে। মরণের বাবা না থাকলে মুক্তা এ-ঘরের মেঝেতে শোয়।
স্বপ্ন দেখেছ নাকি বউদিদি?
হ্যাঁ। ভীষণ খারাপ স্বপ্ন।
কাল শনিবারে একটু বারের পূজো দিও। এ অবস্থায় খারাপ স্বপ্ন দেখা ভাল নয়।
আর ভয় দেখাসনি বাপু, এমনিতেই ভয়ে মরে আছি।
ভয়, ভয় আর ভয়। এই বাচ্চাটা পেটে আসার পর থেকেই যেন কীসব হচ্ছে। এই নিয়ে তিন চারটে খারাপ স্বপ্ন দেখল গত এক মাসে। কী হবে কে জানে! ঠাকুর-দেবতাকে ডাকা ছাড়া সে আর কীই বা করতে পারে।
বড়বউকে এত ভয় কেন তার কে জানে!
ভয় যা আছে তা তার মনের মধ্যে আছে। ঝাঁপি না খুললে তো সাপ বেরোয় না। রসিকের বড় ছেলে এল, সে এসে থেকে গেল। ভয়-ভয় ভাব ছিল বটে বাসন্তীর। কিন্তু কেটেও গেল ভয়। ভারী ভাল ছেলেমেয়ে দুটো। সুমন তো তাকে শেষ অবধি মা ডেকে গেছে। দুজনের জন্য আজকাল মায়াও হয়েছে বাসন্তীর বুকের মধ্যে। কিন্তু বড়বউ তো আর ছেলেমেয়ে নয়। তাকেই তাই সবচেয়ে বেশি ভয়। বাসন্তী তো তার ভাগীদার, সতীন, চির-শস্তুর। তার সঙ্গে তো সহজে মিলমিশ হওয়ার নয়।
তবু বাসন্তী ভালমানুষের মতো মাঝে মাঝে মরণের বাপকে বলে, একবার দিদিকেও আনো না।
সুখে থাকতে কি তোমারে ভূতে কিলায় নাকি?
আহা, কী কথা! দিদিকে আমি ঠিক জল করে দেবো।
আর আহ্লাদের কাম নাই। তারে দেখলে তো ভয়ের চোটে সিটকাইয়া থাকবা, কাপড়ে-চোপড়ে হইয়া যাইব। তোমারে তো চিনি, এক নম্বরের ডরফোক।
আহা, দিদি তো আর ভয়ের জিনিস নয়। হ্যা
য় যদি বাঘিনী, তবে তুমি হইলা মেচি বিলাই।
কথার কী ছিরি বাবা। আমার কিন্তু দেখতে ইচ্ছে করে।
চাও তো লইয়া আমু, শ্যাষে কপাল চাপড়াইবা।
তার চেয়ে একবার আমাকেই কলকাতায় নিয়ে চলো না। গিয়ে একটিবার প্রণাম করে আসি।
ইঃ, প্রণাম করনের লিগ্যা দেখি হাত খাউজ্যাইতাছে!
মরণের বাপ ওরকমধারাই মানুষ। মুখের আগল নেই। মনের কথা সব মুখে বলে ফেলে, জলের মতো। কিন্তু মনে একটু খটকা তো আছেই বাসন্তীর।
সে বলে, দিদির তো আমার ওপর রাগ থাকারই কথা। তার জিনিসে ভাগ বসিয়েছি না!
কার যে জিনিস হেইরে কেডা কইব? আমি হইলাম ফাটা বাঁশের মধ্যখানে। মাইনকা চিপি আর কারে কয়। শুন তো ভালমাইনষের মাইয়া, তুমি একখানে, তাইন আর একখানে, মইধ্যখানে মেলা ফাঁক। ওই ফাঁকটুক ফাল দিয়া পার হওনের কাম নাই। বোঝলা বলদা মাইয়ালোক?
বাসন্তী যা বলে তা তার মনের কথা নয়। বড়বউয়ের সঙ্গে দেখা করার কৌতূহল থাকলেও আগ্রহ তার নেই। ভীষণ ভয় পায় সে। আর ভয়ই তার ঘুমের মধ্যে নানা দুঃস্বপ্ন হয়ে ফিরে আসে। তবু মুখে ওসবও সে বলে, তার ভালমানুষিই তাকে দিয়ে বলায়। ভাবে, না বললে খারাপ দেখাবে। তার বর হয়তো ভাববে, সে বড়বউকে হিংসে করে।
ভালমানুষ হয়ে থাকার একটা নেশা আছে। বাসন্তী অনেক সময়ে তার বরের কাছে ইচ্ছের বিরুদ্ধেও ভালমানুষ সাজে। ওই একজনের চোখে সে মন্দ হতে চায় না কখনও। সে মানুষটার মাত্র অর্ধেক পেয়েছে, সেটুকুই আগলে রাখতে হবে তো। সম্পর্কটা তো অধিকারের নয়। মাকড়সা যেমন নাভির সুতোয় ঝুলে থাকে, এও যেন খানিকটা তাই। বাসন্তীর ভয় কি একটা! তার হাজারো ভয়। একটা ভয় থেকে আর একটা ভয় জন্মায়। তারপর ভয় যেন বিরাট বড় হাঁ করে গিলতে আসে।
ঠিক বটে, রসিক তাকে সুখে মুড়ে রেখেছে। ভালওবাসে খুব। তবু কেবলই মনে হয়, তারা কি আসল স্বামী-স্ত্রী? নাকি নকল? সাজা? যাত্রাপালার মতো মিথ্যে জিনিস? বাসন্তীর বুকে ডুগডুগি কি এমনি বাজে?
তার গর্ভে ওই লোকটার ছেলে হল, মেয়ে হল, আর একটাও আসছে, তবু কি আপন হল না লোকটা? তাহলে আর কীসে আপন হবে? মাঝে মাঝে আজকাল এই এক চিন্তা হয় তার। ওই যে এক না-দেখা বড়বউ আধখানা দখল করে আছে, ওই কাঁটাই মনের মধ্যে খচ খচ করে। আধখানা নয়, হয়তো আরও বেশিই দখল করে আছে বড়বউ। হয়তো সবটুকুই। তার মায়ের মুখে বিষ আছে বটে, কিন্তু হয়তো যখন বলে তখন মিথ্যে বলে না, তুই কি আর সত্যিকারের বউ! রাখা মেয়েমানুষের বেশি নোস, এই বলে রাখলুম, পরে বুঝবি।
