হ্যাঁ সুদর্শনদা, হাত দেখার কথাই তো হচ্ছিল। দেখই না বাপু হাতখানা আমার। থাক দিদি, দিনের বেলা দেখে দেবখন। চালসে ধরার পর সন্ধে লাগলেই চোখটা একটু ধোঁয়াটে মেরে যায়। তবে আগেই বলে রাখছি, ও বিদ্যে আমার পুরো জানা নেই।
বলে সুদর্শন উঠতে যাচ্ছিল, এক গাল হেসে বলল, ওই দেখ কে এসেছে! এসো দিদিমনি এসো! সেদিনকার মতো বেগুনি খাবে নাকি?
সোহাগ হেসে বলল, আমি বেশ পেটুক হয়ে গেছি আজকাল, না? সেদিন বড়মাও বলছিল, আমার নাকি আজকাল খুব রুচি হয়েছে। আসলে সোজাসুজি পেটুক বলছে না, মিন করছে।
পান্না গায়ের কাঁথাটা সরিয়ে উঠে বসল, তোমার জন্যই অপেক্ষা করে ছিলাম। কখন এসেছ?
কাল রাতে।
ওমা! আজ সারাদিন কেটে গেল, খবর দাওনি তো!
আজ সকাল থেকে পিসির সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। পিসি খুব লোনলি তো। সারা সপ্তাহ আমার জন্য অপেক্ষা করে। আজ দুজনে মিলে অনেক কিছু করলাম।
কী করলে?
তিন চার রকমের আচার, মশলা পাঁপড়, হজমিগুলি। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
তোমার সঙ্গে এখন সন্ধ্যাপিসির খুব ভাব, না?
হ্যাঁ। খুব। শি ইজ ভেরি লাভিং। আমাকে অনেক কিছু দিতে চায়।
কী?
ঘড়ি, গলার হার, নিজের সব গয়না। আমি বলি, ওসব এখন থাক। তুমি বুড়ো হলে নেব।
বোসো সোহাগ।
বসাই যাক। না বসে উপায় আছে?
ই-মেল পেয়েছ বুঝি?
হ্যাঁ তো। বলে মুখ টিপে হাসল সোহাগ।
এবারও ই-মেল কি সাংকেতিক?
তা ছাড়া কী? ওনলি ডেট অ্যান্ড টাইম।
তোমরা যেন কী! কেউ এক পা এগোবে না, একটুও আবেগ বা উচ্ছ্বাস নেই, কথাও তো বলো না। তোমাদের মধ্যে কী হচ্ছে বলো তো!
কী আবার হবে! কিছু হচ্ছে না। কোনও বোকা-বোকা ব্যাপার তো আমার সহ্য হয় না।
সে না হয় বাড়াবাড়ি না করলে, কিন্তু একটু মনের কথা জানাবে তো! নির্জনে গিয়ে দুজনে একটু বসতেও ইচ্ছে হয় না?
সোহাগ ফের সেইরকম মিষ্টি হেসে বলল, তাতে কী হবে? শুধু কতগুলো সিনেমাটিক ডায়ালগ। ও আমার অসহ্য।
বিজুদাটাও ঠিক তোমার মতো। এক জন্ম দেখে আসছি, কোনও মেয়েকে দেখেই কখনও হেলদোল নেই। একদম আনরোমান্টিক। এই প্রথম অনেক সাধ্যসাধনার পর দেখলাম তোমাকে অপছন্দ করছে না। কিন্তু রোমান্সের কী ছিরি বাবা। যেমন দেবা তেমনি দেবী।
রোমান্সের কথা আসছে কেন? উই আর নট ইন লাভ।
উঃ, এমনভাবে বোলো না তো! আমার বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ির ঘা এসে পড়ে।
তুমি ভীষণ রোমান্টিক, না পান্না?
ওঃ, আমি যদি প্রেমে পড়ি তাহলে কথা বলে বলে তাকে পাগল করে দেব।
আর কী করবে?
নির্জনে গিয়ে বসব দুজনে, গল্প হবে, কথা হবে, কবিতা হবে, কোনও অসভ্যতা হবে না অবশ্য।
অসভ্যতা বলতে?
শরীর ছোঁয়া, চুমু এইসব।
ওসব অসভ্যতা বুঝি?
না হলেও স্থূল রুচির ব্যাপার। আবেগ ভাল, কিন্তু শরীর নিয়ে নয় বাবা।
তুমি একটু পিউরিটানও আছ।
হ্যাঁ। আমার আবার দুমদাম শরীরের লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে আপত্তি আছে। কিন্তু তুমি তো আরও পিউরিটান।
না, পিউরিটান নই, আসলে ভসভসে আবেগ আমার একদম ভাল লাগে না। দেখবে দুজনে প্রেম করার সময় কত ভসভসে কথা বলে, বিয়ের পর তিন মাসও টিকতে পারে না। কেন জানো?
ওদের কোনও ইন্টিগ্রিটি নেই।
তার মানে কী আমাকে বুঝিয়ে দেবে?
মানে বুঝতে হলে তোমাকে সমাজবিজ্ঞান জানতে হবে। জানতে হবে মানুষের ইতিহাস। মানুষ কেন একস্ট্রিম ফ্রিডম থেকে জংলি জীবনে পরিবার, বিয়ে আর সমাজের দিকে ঝুঁকল তা জানো?
বলো না শুনি?
সেটা নরনারীর প্রেম থেকে নয়। প্রয়োজনে। তখন এরকম প্রেম-ট্রেম হত না তো। তার দরকারও ছিল না। দরকার ছিল বিশ্বস্ততা, দায়বদ্ধতা আর পারস্পরিক নির্ভরতার। একটা পরিবারের ভিতে প্রেমের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন এই তিনটে জিনিসের। মানো?
সে না হয় মানছি। কিন্তু একটু আবেগও থাকবে না, তা কি হয়?
ওই তিনটে না থাকলে আবেগটা বড্ড জোলো হয়ে যায়।
৭১-৭৫. তন্ত্রমন্ত্র
৭১.
বড়বউ যে তন্ত্রমন্ত্র জানে তা তো জানত না বাসন্তী। মন্দিরের ভিতরে যে কালীমূর্তি রয়েছে তেমনটা জন্মেও দেখেনি সে। চৌকোমতো বিশাল মুখ, অ্যাই বড় বড় চোখে কী ভীষণ দৃষ্টি, আর সবচেয়ে আশ্চর্যের হচ্ছে জিবখানা। লাল টকটকে রক্ত মাখা জিবখানা তিন হাত নেমে পেটের নীচ অবধি চলে এসেছে। সেই মূর্তির মুখোমুখি লালপাড় গেরুয়া রঙের ছালের শাড়ি পরা বড়বউ বাসন্তীর দিকে পিছন ফিরে বসা। মাথার চুল পিঠ কেঁপে নেমে এসেছে বন্যার মতো। কীসব মন্তর যেন বলছে বড়বউ, বাসন্তী কি আর মন্তর-তন্তর বোঝে! সে শুধু হাঁ করে চেয়ে দেখছে কাণ্ডখানা। আজ কী একটা সর্বনাশ যেন হবে। কী হবে তা জানে না বাসন্তী, শুধু তার বুকটা দৌড়চ্ছে খুব। ডুগডুগির মতো আওয়াজ হচ্ছে বুকের ভিতরে। বড়বউয়ের মুখখানা দেখা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু ভয়ে ভয়েও দেখতে বড় সাধ হচ্ছে বাসন্তীর। দেখলে হয়তো মূছাই যাবে। তবু না দেখেই বা থাকে কী করে সে? ভয়ে, দুশ্চিন্তায় তার চোখ ভর্তি জল, হেঁচকি তুলে তুলে ফেঁপাচ্ছে সে। ঠাকুর আমার কী হবে গো?
ঠিক এই সময়ে বড়বউ খুব ধীরে ধীরে মুখখানা ফেরাতে শুরু করল, মন্ত্রমুগ্ধের মতো চেয়ে আছে বাসন্তী। কী দেখবে, কাকে দেখবে কে জানে, কিন্তু চোখ যে ফিরিয়ে নেওয়ারও সাধ্য নেই তার। ঘাড় শক্ত হয়ে আছে। হার্টফেল হবে নাকি তার?
