স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সোজা পথে যায় না কখনও। মাঝে মাঝেই পাশ ফেরে, বাঁক নেয়। ঠিক নদীর মতোই। শুকিয়ে চর পড়ে যায়, বার ভেসে যায় প্লাবনে। কিন্তু এ তো ঠিক দুজনের সম্পর্ক নয়। তাদের হল তিন জনের সম্পর্ক। বড়বউ যে ঠিক কেমন ধারা তা জানেই না বাসন্তী। ওই অজানের সঙ্গে সে বৃথাই লড়াই করছে হয়তো।
মাঝে মাঝে একা একা খুব কাঁদে বাসন্তী। আজও দুপুরে একা ঘরে উপুড় হয়ে শুয়ে কাঁদছিল খুব। পাশেই হাম্মি ঘুমিয়ে আছে। আজকাল তার খুব গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছে করে। ছেলেমেয়ে দুটোর জন্য পারে না। নইলে আজকাল কেবলই মনে হয়, তার জীবনটা একটা ফক্কিকারি মাত্র। কিছু নেই তার, এই ইটকাঠের ইমারত, ক বিঘে জমি এর কি কোনও দাম আছে? মানুষটাকেই তো সে পায়নি।
হ্যাঁ লা বাসন্তী, সে কি তোকে কখনও অনাদর করে? দূর ছাই?
না না, তা করে না মানছি।
রাগী মানুষ সে, তবু কখনও তোর সঙ্গে উঁচু গলায় কথা কয়?
না, কখনও নয়।
তোকে কি অবিশ্বাস করে? তোর হাতে ছেড়ে দেয় না সব কিছু?
দেয় তো।
আর সোহাগ করে না? মন চেয়ে কথা কয় না?
সেও কয়, মানছি।
তবে তোর আর চাই কী?
তা কি আর আমি এই বোকা-বুদ্ধি দিয়ে বুঝতে পারি?
মেয়েমানুষের কি বেশি চাইতে আছে? তারা তো নিজেদের বিলিয়ে দিতেই আসে। কত লাথিঝাঁটা খায়, কত উপোস-কাপাসে দিন কাটায়, কত গঞ্জনা, কত গর্ভযন্ত্রণা সয়, কদিন সুখের মুখ দেখে বল তো একজন মেয়েমানুষ?
তা বইকী! জানি না বুঝি!
তাহলেই দেখ, অন্য সকলের মাপে তুই কি কিছু খারাপ আছিস?
অন্যদের যে ভাগীদার নেই!
কে বলল নেই? পুরুষমানুষ জাতটাই তো ঠুকঠুকে। তারা কি একটি নিয়ে থাকে? আর কেউ না জুটল তো বেশ্যাপাড়ায় যেতেও ছাড়ে নাকি?
উম্মা গো! কিন্তু আমার যে অন্য যন্ত্রণা।
যন্ত্রণা কীসের? বড়বউ?
সে নয় তো কে?
তোকে তো লুকোয়নি। দেখে-বুঝেই তো গলায় মালা দিলি।
বুঝলাম? বুঝলাম কোথায়! আমার বুঝি বুদ্ধি আছে?
বুদ্ধি ভাল জিনিস। তা বলে এটাই তো সব নয়। অত যে ভালবাসিস তার দাম নেই বুঝি?
ভালবাসার কী দাম বলো!
হা লা, তবে কি নিষ্কন্টক হতে চাস?
চাইলে?
সর্বনাশী! তুই নিষ্কন্টক হতে চাইলে যে বড়বউকে মরতে হয়! তাই চাস? তবে মা কালীর কাছে তার মরণ চেয়ে জোড়া পাঁটা মানত কর।
বাবা গো! ও কী কথা! আমি তাই বললাম বুঝি?
তুই চাইলে সে মরবে বোধহয়, কিন্তু তারপর আর সারা জীবন তোর বরের মুখের দিকে নিষ্পাপ চোখে তাকাতে পারবি কখনও?
চাইনি গো, চাইনি।
তাহলে কী চাস পষ্ট করে বল তো!
আচ্ছা, এমন বুঝি হয় না যে, সে আমাকে ভালই বেসে ফেলল।
বড়বউ?
হ্যাঁ।
তাই কি বাসে পাগল? দুনিয়াটা কি তোর হাতের মোয়া? যা চাইবি তাই বুঝি পাওয়া যায়।
আমি তো তার পায়ে পড়তেও রাজি।
পায়ে পড়লেই যদি সব হত, ওলো, দুনিয়াটা তোর মনের মতো হবে বলেই ধরে নিয়েছিস বুঝি? অত সোজা নয়। দুনিয়া তার নিয়মে চলবে, যতই তুই চোখের জল ফেলিস আর বুক থাবড়ে হা-হুঁতোশ করিস। বরং দুনিয়ার নিয়ম মেনে চল দেখি।
দুনিয়ার নিয়ম যদি বুঝতুম।
কিছু পাবি, কিছু ছাড়বি– এই হল নিয়ম। সবারই তো ভাগ আছে রে, সেইটে আগে বুঝে নে। যার– যার হক্কের জিনিস তার তারটা তো ছাড়তেই হবে তোকে।
ওইটেই তো সইতে পারিনা। এই একটা জিনিসই তো নিজের মতো করে চেয়েছি। আমার বর।
শোন বোকা, খুব যে বর বর করিস, হ্যাঁ লা সে যদি আজ মরে তবে তো তোর পাখিই উড়ে গেল!
ওম্মা গো! ও কী সর্বনেশে কথা! ওরকম বলতে আছে?
কেন, সে কি মরবে না একদিন, যেমন সবাই মরে? ভেবে দেখতে বলছি, তাকে যে খানিক পেয়েছিস বলিস, কেউ কি বরকে পুরো পায়? পুরো কেউ পেয়েছে আজ অবধি? সব ওই সিকি বা আধুলি, ষোলো আনা নয়।
কিন্তু সে তো আমাকে সবটুকুই পেয়েছে। দিইনি আমি নিজের সব কিছু তাকে? জান বেটে দিইনি?
ছাই দিয়েছিস। সে তোকে রাজরানি করে রেখেছে, গায়ে আঁচটি লাগতে দেয়নি, তাই তোর অত ভালবাসার দেখনাই। তার যদি চালচুলো না থাকত, এমন ভালবাসা না থাকত তখন দেখতুম কেমন তোর একবগ্না পিরিত।
তোমার মুখে আগুন।
তাই দে, কিন্তু ওঠ, চুল বাঁধ, সাজুগুজু কর। ওসব করলে মন ভাল হয়ে যায়।
কান্নার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল বাসন্তী।
ঘুম ভাঙল চেঁচানিতে।
বলি, আঁচলের আড়ালে ও কী নিয়ে যাচ্ছ গো ঠাকরোন?
তা দিয়ে তোর দরকার কী রে মাগী?
অ্যাই খবর্দার, ওসব খারাপ কথা বলবে না বলছি।
আহা, কী এমন বললুম! মাগীকে মাগী বলবে না তো কি মেসোমশাই বলতে হবে নাকি লা? বড়লোকের চাকরানি বলে কি পাখা গজিয়েছে?
কথা চাপা দিও না। আঁচলের তলায় কী দেখাও আগে।
তোর বাপের মাথা।
ঘুম ভেঙে ঝুম হয়ে বসে রইল বাসন্তী।
মুক্তার সঙ্গে মায়ের লেগেছে। দুজনে প্রায়ই লাগে। ছেলেরা আর ছেলেদের বউরা মিলে মাকে তাড়িয়েছে বটে, কিন্তু মা হল দু কান কাটা। এখনও ওই বাড়ির জন্যই তার যত টান। এ-সংসার থেকে যা পারে কুড়িয়ে বাড়িয়ে বা চুরি করে এখনও ও-বাড়িতে পাচার করা চাই। আড়ালে-আবডালে নাতি নাতনিরা এসে দাঁড়ায়। কখনও কচুবনের আড়ালে, কখনও ঘাটে। ইশারায় কথা হয়ে যায়। মশলাপাতি, আনাজ, গম কি চাল, এক শিশি তেল, কাটা মূলোটা যা পারে চুপি চুপি দিয়ে আসে।
মাঝে মাঝে বাসন্তী বলে, হ্যাঁ মা, শুধু তাদের ভালটা দেখলে, তোমার জামাইয়ের ভালটা দেখলে না? তারা যখন মারধর করে হিঁচড়ে পথে বের করে দিয়েছিল তখন তোমার জামাই-ই তো তোমাকে তুলে এনে রেখেছে। তবু এ-সংসারের দিকে তোমার টান নেই কেন? এত অবিচার কি ধর্মে সইবে?
