তাই হবে বোধ হয়।
যাই হোক, এক বর্ষাকালে ভোরবেলা উঠে শুনলাম বেবিকে রাতে সাপে কেটেছে।
ইস! মরে গেল নাকি?
না দিদি। মরেনি। রাত দশটা না এগারোটায় সাপকাটি হওয়ায় তারা গিয়ে ভার্গব গোঁসাইকে ধরে আনে। আর ভার্গব গোঁসাই নাকি সাধনপ্রক্রিয়া করে বিষ টেনে নিয়েছে নিজের শরীরে। গাঁয়ে হইচই, বেবিদের বাড়িতে লোক ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সাপকাটি আমি খুব ভাল চিনি। আদাড়ে-পাদাড়ে ঘুরে এসব জ্ঞানগম্যি ভালই হয়েছে। সাপুড়েদের সঙ্গেও তো কম টো-টো করিনি। সাপ ধরতেও পারি।
অবাক হয়ে পান্না বলে, পারো?
সোজা ব্যাপার দিদি, সাহস করলেই শেখা যায়।
ধরেছ কখনও?
অনেকবার।
মন্ত্রতন্ত্র আছে, না?
আছে, তবে সেগুলো কোনও কাজের নয়। আসল কথা হল, কায়দা কৌশল রপ্ত করা। নইলে মন্তর জানলে কিছু হবে না।
বেবির বাড়িতে গিয়ে কী দেখলে?
সে খুব সাংঘাতিক ব্যাপার। বেবিকে কলাপাতায় শোয়ানো হয়েছে। চোখ বোজা। মুখ টুখ কেমন যেন ফোলা আর লাল। পায়ে বাঁধন। কাটির জায়গাটা কী একটা পাতা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। প্রথমে একটু থতমত খেলেও আমার একটু সন্দেহ হল। ওর মাকে বললাম, কাটার জায়গাটা দেখাতে। তা তিনি বললেন, ভার্গব গোঁসাই নাকি নিষেধ করে গেছে। হাওয়া লাগলে খারাপ হবে। কিন্তু সাপকাটির কেস আমি অনেক দেখেছি। বিষধর কামড়ালে অন্য চেহারা হওয়ার কথা। তারপর শুনলাম গভীর রাত অবধি নাকি ঘর বন্ধ করে ভার্গব গোঁসাই কীসব প্রক্রিয়া করেছে। শুনে মাথাটা একটু গরমই হয়ে গিয়ে থাকবে। নিষেধ না শুনে আমি এক ঝটকায় পাতাটা সরিয়ে দেখলাম চারটে দাঁতের দাগ। বিষধর নয়, জলঢোঁড়া বা হেলে কিছু একটা কামড়েছে। কিন্তু সেকথা বলবই বা কাকে বলে! বাড়িসুষ্ঠু লোক ভার্গব গোঁসাইয়ের কেরানি দেখে একেবারে ভাবে ভোর হয়ে আছে। এত বড় গুণীন যে আর হয় না তা গাঁয়েও বলাবলি হচ্ছে। তা সে না হয় তোক। সব বজ্জাত গুণিন আর ওঝা তো এভাবেই হাতযশ বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু আসল কাণ্ড হয়ে বসেছে অন্য জায়গায়। আর সেটাই তোমাকে বলা যাবে না।
পান্না একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, তুমি না বললেও বুঝেছি।
বুঝেছ? ও বাবা, তোমার খুব বুদ্ধি।
এ আর না বুঝবার কী আছে। বেবিকে ভার্গব গোঁসাই রেপ করেছিল তো!
বড় লজ্জার কথা দিদি। পাষণ্ডটা নাকি বুঝিয়েছিল ওটাও একটা প্রক্রিয়া।
বেবি কথাটা বিশ্বাস করেছিল বুঝি?
গাঁয়ের মেয়ে, মাথায় তো বুদ্ধির ব-ও নেই। তার ওপর সাপের কামড়ে মাথাটারও ঠিক ছিল না। বুদ্ধিনাশ হলেই তো মানুষের সর্বনাশ কিনা। আমি রোজ সকালে জপতপের পর ঠাকুরের কাছে একটা জিনিসই চাই। বুঝলে! শুধু বলি, বাবা, আপৎকালে যেন বুদ্ধিনাশ না হয়, দেখো। বুদ্ধিনাশাং প্রণশ্যতি।
তুমি লোকটাকে কিছু বললে না?
না দিদি। আমি মাথা-পাগলা লোক বটে, কিন্তু মাথা-গরম মানুষ নই। আমি যেন দেখতে পেলাম এই ঘটনার ভিতরে আমার মুক্তির পথ খুলে গেছে। যা কিছু সব ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই তো ঘটে।
মেয়েটাকে ফেলে পালালে বুঝি! ছিঃ সুদর্শনদা, তাহলে কিন্তু তোমাকে ভাল লোক বলা যায় না। তোমার উচিত ছিল মেয়েটাকে উদ্ধার করা।
ভাল লোক আর হতে পারলাম কই বলো! আর এ কথাও ঠিক যে পালানোর ইচ্ছেও ছিল। সেটা বুঝতে পেরেই বোধহয় পাঁচজনে আমাকে চেপে ধরল, শুভস্য শীঘ্রম, তাড়াতাড়ি বিয়ে সেরে ফেলতে হবে। ভার্গব গোঁসাইও খুব চাপাচাপি শুরু করল। বেবিও খুব গোঁ ধরল। শেষে আমি পালাতে পারি ভেবে আমাকে ইস্কুলের এক ঘরে শেকল তুলে রাখা হতে লাগল। দিনরাত চোখে চোখে রাখা হত।
ও বাবা! তুমি কী করলে?
কী আর করব দিদি? ওই অবস্থায় তো করার কিছু ছিল না। শুধু ভগবানকে ডাকতে লাগলাম। বললাম, ঠাকুর, বুদ্ধিনাশ যেন না হয়। চারদিন বাদেই বিয়ে। একদিন ভার্গব গোঁসাই এসে চোখ পাকিয়ে বলে গেল, পালিয়েও বাঁচবি না, আমার অভিসম্পাত তোকে ধাওয়া করবে। রক্তবমি হয়ে মরবি। আমি বললুম, কিন্তু আমার দোষটা কী? সে বলল, দোষ নয়? বাগদত্তাকে বিয়ে না করলে সে মহাপাতক হয়। তখন আমি বলেই ফেললাম, গোঁসাই, মেয়েটাকে তো বিষধর কামড়ায়নি, কামড়েছিল ঢোঁড়া, বিষধর কামড়ালে কী করতে ওস্তাদ? পারতে বিষ নামাতে? লোকটা কী বলল জানো? এক গাল হেসে বলল, পারতাম না। কিন্তু তাতে কী? লোকে তো জানে আমি পারি। ওতেই হবে। তারপরও আমি বললাম, মেয়েটাকে নষ্ট করলে কেন? তার জবাবে বলল, ওরে, শিবের এঁটোকে এঁটো ধরতে হয় না।
কী বদমাশ।
হ্যাঁ দিদি। বদমাশ বটে, তুখোড় বুদ্ধিমানও বটে।
তুমি কী করলে?
ওই যে বললাম, ভগবানকে ডাকতে লাগলাম। সেই রাতে সৃষ্টিছাড়া বৃষ্টি নামল। বুঝলে দিদি, ভগবানের ওপর নির্ভর করে দেখো, কেমন সব অশৈলী কাণ্ড হয়।
আহা, তোমার কী হল তাই বল না।
বৃষ্টির তোড়ে চারদিক ডুবে গেল। আশপাশের লোক বাড়িঘর ছেড়ে এসে উঁচু স্কুলবাড়িতে উঠল। আমার ঘরের দরজায় শেকল তুলে পলকা একটা তালা দিয়ে রেখেছিল। তারাই সব শেকল-টেকল উপড়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। মেলা লোক। সেই রাতে আর পালানো হল না ঠিকই। কিন্তু ডামাডোলে খুব সুবিধে হয়ে গেল। দু দিন বাদে জল নামতেই খঙ্গাপুরের বাস ধরে একরাতে পালিয়ে এলাম। আর ওমুখো হইনি।
কিন্তু মেয়েটার কী দোষ বলো!
দোষঘাটের কথা নয় দিদি। আমিই কি আর ভাল? তবে সব ঘটনা থেকেই একটু একটু শিক্ষা নিতে হয়।
