নারায়ণগড়ের নাম শুনেছ?
না তো! সেটা আবার কোথায়?
খড়্গপুর থেকে কাঁথির রাস্তায়। বর্ধিষ্ণু গাঁ।
তুমি সেখানেও ছিলে নাকি?
বছরটাক থাকতে হয়েছিল। সেখানকার ইস্কুলে আমার এক মামাতো ভাই ছিল মাস্টারমশাই। কোথাও সুবিধে হচ্ছিল না বলে তার কাছে গিয়ে জুটেছিলাম। সে তখনও বিয়ে-টিয়ে করেনি, দিব্যি ছিলাম দু ভাইয়ে। ইস্কুলেরই অফিসঘরে রাতে বিছানা করে শুতুম। আমার কাজও জুটে গিয়েছিল। হোস্টেলে রান্না করতুম দু বেলা।
তোমার বেশ কালারফুল লাইফ, না সুদর্শনদা?
সুদর্শন লাজুক হেসে বলে, তা বটে দিদি। পেটের দায়ে ঘুরেছি বটে, কিন্তু তাতে ঠকিনি। মেলা মানুষ দেখেছি, মেলা দৃশ্য, কত কাণ্ডকারখানা। মাঝে মাঝে একা একা বসে সেসব খুব ভাবি।
নারায়ণগড়ে কী হয়েছিল বললে না?
হ্যাঁ, সে কথাই বলি। ইতিহাসের মাস্টার ছিলেন কামাক্ষাবাবু। বিষয়ী লোক। জমিজিরেত ছিল। সুদ আর বন্ধকীর কারবার করে বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন। কঁথিতে একটা সোনার দোকান করে বড় ছেলেকে বসিয়ে দিলেন। ওসব লোকেরই আবার জ্যোতিষীর দিকে টান থাকে খুব। সব রক্ষে হয় কিনা, কারবার আরও বাড়ে কিনা, বিপদ-আপদ হয় কিনা, নানা দুশ্চিন্তায় ভোগে তো। তা তার বাড়িতেই এসে থানা গাড়ল ওই ভার্গব জ্যোতিষী। সবাই বলত মস্ত সিদ্ধাই। তা বলব কী দিদি, দু-চারটে মোক্ষম কথা বলেও ফেলত। নিমাই জানার গোপন রোগ ছিল, কেউ জানত না, ফস করে পাঁচজনের সামনে ভার্গব ফাঁস করে দিলে। গুণধরবাবু তার বউকে নিয়ে গিয়ে সবে পেন্নাম করে বসেছেন, ভার্গব বলল, উটি কে গো তোমার সঙ্গে গুণধর? গুণধর বলল, আজ্ঞে আমার বউ। ঘন ঘন মাথা নাড়া দিয়ে ভার্গব বলল, ও তোমার বউ হতে যাবে কেন, ও তো অন্যের বউ। কী লজ্জার কথা বলো পাঁচজনের সামনে! কিন্তু বউটা তখন হাউরেমাউরে করে কেঁদে গিয়ে ভার্গবের পায়ে পড়ল। তখন জানা গেল, সে সত্যিই বালেশ্বরে স্বামী সন্তান ছেড়ে গুণধরের সঙ্গে দশ বছর আগে পালিয়ে এসেছিল।
এরকম একজন জ্যোতিষীই তো আমার এখন দরকার।
জ্যোতিষী বললে ভুল হবে। এ হল সিদ্ধাই, বুঝলে?
সিদ্ধাই আবার কী?
সে আছে। তুমি অত বুঝবে না। নিচুতলার সাধক আর কী। ওই যেসব মারণ-উচাটন, বশীকরণ করে ওরাই হচ্ছে সিদ্ধাই। পয়সার লোভে, মেয়েমানুষের লোভে শেষ অবধি স্বখাত সলিলে ডুবে যায়।
ভার্গবেরও কি তাই হয়েছিল?
তা জানি না দিদি। তবে ওরকমই হয় বলে শুনেছি। ওদের পাল্লায় যারা পড়ে তাদেরও ভাল হয় না। আমিও একটু পড়েছিলাম কিনা।
তুমি কীভাবে পড়লে?
আমিও গিয়ে জুটেছিলাম তার কাছে। বেশি কিছু আদায় করতে পারিনি ঠিকই, তবে লোকটা আমাকে হাত দেখতে শিখিয়েছিল। বেশ শিখেওছিলাম খানিকটা। একদিন আমাকে বলল, দ্যাখ, এসব কিন্তু ফক্কিকারি। খানিক মিলবে, খানিক মিলবে না। এ বিদ্যে কেউ পুরোটা জানে না। খানিকটা খানিকটা জেনে ওপরটা ওপরটা বলে। তোকে যেটুকু শিখিয়েছি তাই দিয়ে করেকন্মে খেতে পারবি। যা, লেগে যা।
তুমি কি জ্যোতিষীগিরিও করেছ নাকি?
না দিদি। সেসব করিনি। অন্তত পয়সা রোজগারের জন্য করিনি। নারায়ণগড় থেকে আমাকে পালাতে হল।
ওমা! কেন?
সে তোমাকে বলা যাবে না।
কেন বলা যাবে না?
ওসব কথা তোমার শোনার মতো নয়।
বুঝেছি।
কী বুঝলে দিদি?
বোধহয় কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছিলে, তাই না?
খুব লজ্জা পেয়ে সুদর্শন বলল, ওরকমই ধরে নাও।
আহা, যখন ধরেই ফেলেছি তখন বলেই দাও না।
তুমি তো ছোট মেয়ে, তোমার কাছে কি ওসব বলতে আছে?
খুব খারাপ কথা নাকি?
না দিদি, খুব খারাপ কিছু নয়। আমি বরাবর ধর্মভীরু মানুষ। তবে বুদ্ধিটা কাঁচা। নানারকম ফেরে পড়ে নাকাল হতে হয় বুদ্ধির দোষে।
তাহলে বলতে দোষ কী?
আমি তো আহাম্মক, সবাই জানে। আর সেজন্যই ভবঘুরেমিও কাটল না আমার। তা এ সেই আহাম্মকিরই গল্প, বুঝলে?
আর ভূমিকা করতে হবে না। বলো তো!
নারায়ণগড়ে যে ইস্কুলে আমি কাজ করতাম সেটাতে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়ত। গাঁয়ের মেয়ে তো, সব বেশি বয়সে ছোট ক্লাসে পড়ত। একটা মেয়ে ছিল বেবি। ক্লাস নাইনে পড়ত। দেখতেও বেশ ছিল। স্কুলের দফতরির যক্ষ্মা হওয়ায় সে তখন দেশে গেছে। আমিই তার কাজ চালিয়ে নিচ্ছি তখন। ক্লাসে রোল খাতা বা নোটিশ নিয়ে যাওয়া, ঘন্টা মারা থেকে বাগানে ঢুকে-পড়া গোরু-ছাগল তাড়ানো অবধি। তখন উঠতি বয়স, চেহারাখানা খারাপ ছিল না। তা ওই মেয়েটা একটু ঘুরঘুর করতে লাগল। ইস্কুল ছুটির পর একটা ভাইঝিকে কোলে নিয়ে চলে আসত ইস্কুলের মাঠে বেড়াতে। কথাটথা হত।
বাঃ, বেশ রোমান্টিক ব্যাপার তো।
ভারী লজ্জা পেয়ে সুদর্শন বলল, কাঁচা বয়সের ব্যাপার তো, তাই বলতে চাইছিলাম না।
আরে দুর, এসব আজকাল জলভাত।
হ্যাঁ, তা ওই একটু ভাবসাব মতো হয়ে গিয়েছিল। তারাও বড্ড গরিব।
ব্রাহ্মণ ছিল কি মেয়েটি?
না না, তন্তুবায়।
কিন্তু তুমি যে আবার সাংঘাতিক শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ।
ওই তো বললাম, কঁচা বয়সে কি আর হিসেব থাকে?
তারপর কী হল?
গাঁ-দেশ তো, গাছের পাতা পড়লেও পাঁচকান হয়ে যায়। সুতরাং মেয়ের মা বাপ এসে ধরল আমায় বিয়ে করতে হবে।
রাজি হলে বুঝি?
গাঁইগুঁই করেছিলাম। বংশে কেউ অন্য জাতে বিয়ে করেনি, ঘরে কথা হবে। কিন্তু সবাই এমন ধরে পড়ল যে না বলতে পারিনি। এমনকী হেডমাস্টার বলল বিয়ে করলে চাকরি পাকা করে দেবে। তাই লোভে পড়ে নিমরাজি হতে হল। এরকম যখন অবস্থা তখন ভার্গব গোঁসাই গাঁয়ে জমিয়ে বসেছে। সেই সময়কারই ঘটনা। তুমি কি মানো দিদি, যে, ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সব ঘটে?
