সেটা কি সম্ভব?
প্র্যাকটিস করতে হয়। প্রথমটায় হতে চায় না। ধীরে ধীরে রেগুলার প্র্যাকটিস করতে করতে ইট বিকামস ইজি।
তাতে কী হয়?
ইট ইজ এ ফ্রেশনার। মনটা ঝরঝরে হয়ে যায়, টেনশন থাকে না।
আমাকে শেখাবে?
শেখার কিছু নেই। জটিল বা শক্ত কোনও প্রক্রিয়া তো নয়। জাস্ট কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা। মনকে কিছুক্ষণ রেস্ট দেওয়া। নাথিং এলস।
অমল এই ধ্যানে খুব আকর্ষণ বোধ করল না। তার সমস্যা অত সহজ নয়। তবু সে বলল, ও কে। আই উইল ট্রাই।
তোমার জপতপও হয়তো খানিকটা তাই। মনটাকে বাস্তব জগৎ থেকে অন্য ট্র্যাকে ঘুরিয়ে দেওয়া।
অমল আবার খুব সরলভাবে প্রশ্ন করল, তুমি কি নাস্তিক মোনা?
ভেবেই দেখিনি কখনও। তবে এখনও ভগবানকে আমার দরকার হয়নি। যখন দরকার হবে তখন নাস্তিক থাকব কি না জানি না। আই অ্যাম কিপিং মাই ফিঙ্গারস ক্রসড। কিন্তু আমি নাস্তিক হলেই বা তোমার আস্তিক হতে বাধা কোথায়?
অমল জুলজুল করে চেয়ে ছিল মোনার মুখের দিকে। এই মহিলাকে সে একদম চেনে না। বড়ই অচেনা লাগছে এখন। দুজনের মাঝখান দিয়ে এখন যেন এক নিঃশব্দ অদৃশ্য নদী বয়ে যাচ্ছে। সাঁকোহীন, কূল-কিনারাহীন, অনন্ত।
তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু।
নিস্তেজ হাতে কফির কাপটা তুলতেও যেন ভার লাগছিল অমলের। গরম কফি খানিকটা চলকে পড়ল তার কোলে। ছ্যাঁকা লাগল।
কফি খেয়ে একটু ঘুমোও, বুঝলে?
ঘুমোব মোনা। তুমি শোও। আই অ্যাম সরি আই ডিসটার্বড ইওর স্লিপ।
তোমারও তো ঘুম হয়নি।
মোনা গিয়ে শুয়ে পড়ল।
কফিরকাপ হাতে ভূতের মতো অভিভূত হয়ে বসে রইল অমল। জড়বৎ। কাপটা হাতে ধরা, কিন্তু চুমুক দিতেও মনে রইল না আর।
পিছনে বাগানের দিকে একটা কাশির শব্দ শোনা গেল। বাবা ফুল তুলছে।
কফির কাপটা নামিয়ে রেখে খুব সন্তর্পণে অমল এসে জানালার কাছে দাঁড়াল। বাইরে এখনও অন্ধকার। সাবধানে জানালার একটা পাল্লা খুলে সে বুক ভরে ঠান্ডা বাতাসে দম নিল। শুনতে পেল, খুব মৃদু শব্দে মোনার নাক ডাকছে। ইদানীং একটু মোটা হয়েছে মোনা, সেইজন্যই কি নাক ডাকছে? নাকি কোনও অসুখ!
হঠাৎ চমকে উঠল অমল। মনে পড়ল মোনা একদিন তাকে বলেছিল ওর কী একটা মেয়েলি অসুখ হয়েছে। অসুখের নামটা বলতে চায়নি। একজন বড় ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছিল অমলকে জানিয়েই। কী অসুখ হয়েছে মোনার? তাকে বলতে চায়নি কেন? সেও তো জানতেনা চায়নি কখনও। মোনা কি মরে যাবে নাকি?
হঠাৎ ভীষণ অস্থির বোধ করল অমল। ভীষণ।
.
৭০.
তার শরীর সংকেতময়। তার স্মৃতি নেই, বোধ নেই, মস্তিষ্ক নেই, কিন্তু শরীর আছে, আছে বিভিন্ন সংকেত। অতিশয় ক্ষীণ তার দৃষ্টিশক্তি, নিজের চারধারে কয়েক ফুট মাত্র দেখতে পায়, তার বাইরে সব আবছায়া। সে কখনও আকাশ দেখেনি, দিগন্ত দেখেনি, সে চেনে না সূর্যোদয়ের বর্ণ বা জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য। সম্পূর্ণ বধির সে, কোনও সংগীত বা শব্দই সে কখনও শোনেনি। কিন্তু গাছের একটি পাতা খসে পড়লেও তার সংকেত সে শরীরের মৃদু তরঙ্গে টের পায়। পাপ বা পুণ্য, ধর্ম বা অধর্ম কিছুই নেই তার। ভাল মন্দ নেই, অবসাদ নেই, আনন্দ বা বিষাদও নেই। আছে ক্ষুধা, এবং মেটানোর জন্য শ্রম ও ক্লেশ। আছে মরসুমি প্রজননও, যা আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি ব্যধ্যতামূলক। হ্যাঁ, তার ভয় আছে, জৈবিক ভয়, যাকে সে সঠিক চেনে না কিন্তু টের পায়।
মাটির গভীরে আঁকা-বাঁকা এক গুহাপথ পেরিয়ে অপরিসর, অন্ধকার, কবোঞ্চ এক সংকীর্ণতায় সে তার দীর্ঘ শরীর গুটিয়ে নিস্তেজ শুয়ে আছে গভীর ঘুমে। স্বপ্নহীন এক অসাড় ঘুম। বাইরে শীত। তার শীতল রক্তের শরীরে শীতের সংকেত ধরা পড়লেই তাকে গভীর গুহায় চলে যেতে হয়। মরণের মতো ঘুম জড়িয়ে ধরে তাকে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা লোপ পায়, ধীর হয়ে যায় রক্তের প্রবাহ, বিলম্বিত স্পন্দনে শরীর স্তিমিত হয়ে যায়। উপরে উত্তরের শীতল বাতাস বয়ে যায়, সে তার পাতালঘরে শরীরের অমোঘ সংকেতে শুয়ে থাকে। যখন শীত ঋতু শেষ হবে, উত্তপ্ত হয়ে উঠবে চরাচর তখন এই গহীন গভীর গহ্বরে ঠিক সংকেত আসবে শরীরে, ওঠো! জাগো! দীর্ঘ উপবাস ভঙ্গ করো, ছাড়ো খোলস, বয়ে যাও জলের ধারার মতো। গভীর ঘুমের ভিতর থেকে সে সংকেত পায়, জেগে উঠবার আর দেরি নেই।
তুমি হাত দেখতে পারো সুদর্শনদা?
আমার দোষ কী জানো দিদি? সব জিনিসই একটু একটু জানি। কোনওটাই পুরোপুরি জানি না। শেখার কি আর সময় পেলুম! একটা জিনিস হয়তো সবে মন দিয়ে শিখতে লেগেছি অমনি সেখান যে পাততাড়ি গোটাতে হল। আর শেখা হল না।
আহা, যা জানো তাতেই হবে। বলো না আমার হাত দেখে, পরীক্ষায় কেমন হবে।
ওসব কি বলতে পারি। পয়সাখখার জ্যোতিষীরা ওসব বলে থাকে। খানিক ফলে, খানিক ফলে না। আন্দাজে বলা তো। ও ব্যাটারা জানেও না কিছু। তবে তোমার হাতের রেখা-টেখা ভাল, খারাপ হওয়ার কথা নয় দিদি।
যাঃ, ওরকম বললে হবে না। বেশ ভাল করে দেখে বলো।
বললুম তো, পরীক্ষায় কী হবে তা বলার মতো এলেম আমার নেই। ভার্গব জ্যোতিষীর কাছে শিখছিলুম একটু-আধটু। চেঁটিয়া লোক, সহজে তার কাছ থেকে বিদ্যে বের করা যায় না। শেখানোর জন্য বিস্তর ঝোলাঝুলি করতে হয়। তাও মাল ছাড়তে চায় না কিছুতেই।
ভার্গবটা কে?
