একটু বাদে মোনা যখন কফি নিয়ে এল তখন টেবিলে মাথা রেখে অমল ঘুমিয়ে পড়েছে।
মোনা তার মাথায় আলতো হাত রেখে বলল, কফি এনেছি।
চটকা ভেঙে উঠে অমল একটু লজ্জার হাসি হাসল, বলল, হঠাৎ একটু তন্দ্রা এসে গিয়েছিল।
তা তো আসতেই পারে। কফিটা খেয়ে ঘুমোও।
মাথা নেড়ে অমল বলল, না, আর ঘুমোব না।
জপতপ করবে বুঝি?
অমল ফের একটু লাজুক হাসল, করে দেখছি যদি কিছু হয়।
মোনা একটুও বিদ্রূপ না করে বলল, করলে তো ভালই।
অমল হঠাৎ অবাক হয়ে ভাবল, তার বউ মোনা আস্তিক না নাস্তিক তা সে জানে না। এতকাল ঘনিষ্ঠ সাহচর্যের পরও ব্যাপারটা তার জানা হয়নি। কেন হয়নি তাও সে জানেনা। তবে তাদের বাড়িতে কোনও ঠাকুরের আসন-টাসন নেই, ঠাকুর-দেবতার ছবিও নেই। তারা কখনও কোনও ধর্মীয় আচরণ করে না। ওসব নিয়ে কথাও হয় না তাদের। ঈশ্বর প্রসঙ্গই তাদের কাছে বহুকাল যাবৎ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে আছে।
সে মোনার দিকে চেয়ে বলল, তুমি বোধহয় এসব মানো না, না?
মোনা করুণ চোখে তার দিকে চেয়ে ছিল। বলল, কী জানি, কখনও তো ভেবে দেখিনি।
তার মানে কি মোনা?
প্রয়োজন না হলে কেউ কি ভগবান নিয়ে ভাবে? আমার বাপের বাড়িতে সবাই খুব নাস্তিক ছিল। মা, বাবা, সবাই। কিন্তু তর্কবিতর্ক ছিল না।
কিন্তু আমাদের বিয়ের সময় তোমাদের বাড়িতে সবই তো মানা হয়েছিল।
হ্যাঁ, তাও হয়েছিল। ওই যে বললাম, কোনও বিতর্ক নেই। প্রয়োজন হলে সব প্রথাই মানা হয়, নইলে নয়। বিয়ের পর দেখলাম তুমিও কিছু মানো না, তাই আমিও কিছু মানিনি আর।
কিন্তু এই যে এখন আমি জপতপ করি, এতে তোমার হাসি পায় না তো!
না। বরং মনে হয়, এটা বোধহয় তোমার দরকার।
.
দরকার কথাটা ভাল বুঝল না অমল। দরকার মানে কী? বাচ্চাদের যেমন ভুলিয়ে রাখার জন্য খেলনার দরকার হয় এটা কি তেমন? না কি খিদের মুখে যেমন খাদ্যের দরকার তেমন? নাকি বৈজ্ঞানিকের যেমন সত্য বা বস্তুর মূলে যাওয়ার দরকার, তেমন? আসল কথা কী, বস্তুটা নেই, কিন্তু নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্য ওরকম একটা অলীক কিছু নিয়ে পড়ে থাকা?
এই সংশয় তাকে ছাড়ে না। তাই তো মধ্যরাতে লেপের ওম, ঘরের নিরাপদ আশ্রয় ছেড়ে ছাদে যাওয়া। সে ছাদ অবধিই মাত্র যেতে পেরেছিল। অনেকে আরও দূরে যায়। সন্ন্যাস নিয়ে, বিবাগী বা পাগল হয়ে, গলায় দড়ি দিয়ে। যায়, অনেকেই যায়, মনের ভূত যাদের তিষ্ঠোতে দেয় না।
তার সঙ্গে মোনার একটা লুকোচুরি আছে। বরাবর ছিল, এখন আরও বেশি আছে। তারা আর লড়াই করছে না বটে, কিন্তু সাবধানে পরস্পরকে নজরে রাখছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করছে না। বিদ্রূপও করছে না। আক্রমণ করছে না আর। বরং তারা পরস্পরের সঙ্গে শরীরের সম্পর্কে আসছে, এক বিছানায় শুচ্ছে, অত্যন্ত ভদ্রভাবে কথা কইছে। কিন্তু এসব সৌজন্যের ফলে দূরত্ব কি বেড়ে যাচ্ছে আরও? সেঁতো হাসি, দাঁত নখ লুকিয়ে পরস্পর গাঁ-ঘেষাঘষি, এ কি কাছে আসা, না দূরে যাওয়া?
এসব বুঝতে আজকাল খুব শক্ত লাগে অমলের। তার কাছে ক্রমে এই সম্পর্কের জটিলতা আরও বাড়ছে। সে বিজ্ঞানের ছাত্র, গণিত ভালই জানে। যত শক্ত অঙ্কই হোক, তার একটা সমাধান আছেই। আছে। কিন্তু সম্পর্কের গণিত মাঝে মধ্যেই আবছায়া হয়ে যায়, মাথা দিয়ে বোঝা যায় না, হৃদয় দিয়েও নয়। এ যেন পরস্পরের সামনে থেকেও, কাছাকাছি থেকেও কোনও দুরূহ কোণে বা আবডালে লুকিয়ে থাকা।
অসহায় মুখ তুলে অমল বলল, আমার যে জপতপ দরকার এটা তোমার কেন মনে হয় মোনা?
ইউ আর রেস্টলেস। তোমাকে আমি সবসময়ে একটা অস্থিরতায় ভুগতে দেখি। মেন্টাল প্রবলেম তোমার অনেকদিনের। আমি ভাবতাম পারুলের সঙ্গে তোমার লাভ অ্যাফেয়ারের জন্যই বোধহয় ওটা হয়।
এখনও কি তাই ভাবো?
কী ভাবব তা বুঝতে পারি না। তুমি তো কখনও আমাকে সব কথা খুলে বলো না। কিন্তু এটাও তো ঠিক যে, তুমি আর ইয়ংম্যান নও। মাঝবয়সি। এ বয়সে ওসব অতীতের তত প্রভাব থাকার কথা নয়। তবে কিছু বলাও যায় না। শুধু দেখতে পাচ্ছি, তুমি আরও রেস্টলেস হয়ে যাচ্ছ। তোমার বন্ধু হওয়ার চেষ্টা তো আমি করেছি, তাই না? আমি তোমাকে বুঝবার চেষ্টাও করেছি।
অমল বড্ড লজ্জায় পড়ল এ কথায়। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ-হ্যাঁ। অ্যান্ড থ্যাংক ইউ ফর দ্যাট। ফর এভরিথিং।
লক্ষ করছি তুমিও আমাকে মেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো ভালবাসারও চেষ্টা করছ। কিন্তু একটা ডিসকর্ডও আছে। বেসুরো কিছু। সেটাই বুঝতে পারছি না। সেটা কি পারুল? সে তো এখন তিনটে বাচ্চার মা। তাই না?
অমল সবেগে মাথা নেড়ে বলল, না মোনা, পারুল নয়।
তাহলে?
আমি ঠিক জানি না।
হয়তো জেনেও বলতে চাও না। তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলব না বলেই আমি কখনও তোমার কাছে জানতে চাইনি। এখনও চাই না। তবে আমি চাই ইউ কাম আউট অফ দি স্টুপর। তার জন্য মেডিটেশন করতে হলে করো। মেডিটেশন ইজ এ গুড মেডিসিন। আমিও তো করি।
তুমি মেডিটেশন করো, আমি জানি। সেটা কীরকম মেডিটেশন মোনা, গডলেস?
গড! মেডিটেশনের জন্য গডের কী দরকার?
দরকার নেই?
না তো!
তা হলে?
পৃথিবীসুদ্ধ লোক যে মেডিটেশন করছে তাতে কি ভগবানের দরকার হয় নাকি?
মেডিটেশনটা কেমন একটু বুঝিয়ে দেবে?
ইজি। মন থেকে সব চিন্তা, সব স্মৃতি, সব কথা তাড়িয়ে দিয়ে একদম শূন্য করে ফেলতে হয়। চিন্তাশূন্য, ভাবশূন্য, স্মৃতিশূন্য অবস্থায় সোজা হয়ে বসে থাকা। কমপ্লিট ব্ল্যাংক।
