ভাবতে ভাবতে পাগলপারা মাথা। মাথার কোষে কোষে জমে ওঠে ধাঁধা, কে এর পিছনে? কী এর কারণ? কোথায় এর শুরু বা শেষ? ছোট ঘরের অবরোধে মধ্যরাতে লেপের মধ্যে ভেপে উঠল তার শরীর। তার চেয়েও বেশি বিকল অচল হল মন, বুদ্ধি, চেতনা। দমফোট অবস্থা।
তার বাবা মহিম রায় বিজ্ঞানের মানুষ নয়। কিন্তু এককালে ইংরিজিতে এম এ পাস করেছিল। গেঁয়ো গন্ধ আজও তার বাবার গা থেকে যায়নি। খুব চোখা চালাক বুদ্ধিমান লোক নয়। মহিম রায় তার মেধাবী ছেলের দিকে চেয়ে বলল, বিশ্বাস জিনিসটা সহজে আসতে চায় না তো। অনেক দ্বিধা আসে, অনেক প্রশ্ন আসে। ওটাই তো লড়াই।
তুমি কবে থেকে ভগবান মানো বাবা?
মহিম রায় ভারী অপ্রস্তুত হেসে বলেছিল, সে কি মনে আছে? ছেলেবেলা থেকেই বোধহয়।
কখনও ঈশ্বরকে অবিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয়নি?
হয়েছে। কতবার হয়েছে।
এই যে বিশ্বাস থেকে অবিশ্বাস, আর অবিশ্বাস থেকে বিশ্বাস, এই ট্রানজিটারি পিরিয়ডটার কথা আমাকে বলবে?
ছেলের দুর্মর অস্থিরতা টের পাচ্ছিল মহিম। কিন্তু বেশি কথা বলতেও বোধহয় সাহস হল না। সংক্ষেপে বলল, স্বামী বিবেকানন্দেরও তো হয়েছিল শুনেছি। সবারই হয়।
আমার একজন ভগবান দরকার। ভীষণ দরকার।
মহিম এটা হাসির কথা ভেবেই হেসেছিল। গুরুত্বটা বোধহয় বোঝেনি।
তবে কার কাছে যাবে অমল? কে ধরিয়ে দেবে তাকে?
আকাশের দিকে চেয়ে থেকে কোনও লাভ নেই। আকাশ তো কিছু বলে না। এক নিরপেক্ষ বিস্তার, মাত্র। যে যা খুশি ব্যাখ্যা করে নাও। এই নীরবতাই বড় অসহনীয় লাগে তার। ভগবান যদি আছ কোথাও, তবে সাড়া দাও না কেন? চোর-চোর খেলার লুকিয়ে থাকা খেলুড়িও তো টু দেয়। সেরকম কিছু? একটা টু শব্দও কি শোনা যাবে না কখনও? এই নির্জন মধ্যরাতে তিনি যদি থেকেই থাকেন- একবারও কি এই তাপিত হৃদয়ের ডাকে দৈবের বাণীর মতো বলে উঠবেন না, আমি আছি?
নাকি নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি নিজেও নিশ্চিত নন? তারও কি সংশয় হয়, আমি কি আছি, না নেই?
সিঁড়ি ভেঙে কে উঠে আসছে ওপরে?
বিরক্ত হল অমল। এই মধ্যরাতের নির্জনতায় সে তার অস্তিত্বকে খুঁজছে। বড় জরুরি তার প্রয়োজন। এই নিবিড় গভীর ধ্যানমগ্নতায় কেউ এসে হানা দিয়ে শতেক প্রশ্ন করলে সে খানখান হয়ে যাবে। বড় ভঙ্গুর সে, বড়ই পলকা। কোনও অজুহাত নেই তার। কোনও ব্যাখ্যাই নেই তার আচরণের যা লোকে গ্রহণ করবে।
একটা ঝংকার আশা করেছিল অমল। কিন্তু মোনা আজ সেরকমভাবে ঝংকার দিল না। উঠে এসে নিঃশব্দে তার পাশে দাঁড়িয়ে কে জানে কেন কাঁধে নরম করে হাত রাখল। তারপর কোনও প্রশ্ন না করে নরম গলায় বলল, ঠান্ডা লাগবে। ঘরে চলো।
খুব অবাক হল অমল। মোনাকে সে বাস্তবিক বাঘের মতো ভয় পায়। কিন্তু ইদানীং মোনার ব্যবহার– হোক কৃত্রিম খুব বন্ধুর মতো, বুঝদার সাথীর মতো। কোনও প্রশ্নই করল না, কৈফিয়ত চাইল না।
অনিচ্ছুক অমল এই বন্ধুত্বপূর্ণ আহ্বানকে অপমান করল না। ঘাড় নেড়ে বল, চলো।
ঘরে এসে একটু হাঁফ ধরছিল অমলের। খোলা ছাদে এতক্ষণ প্রচুর অক্সিজেন পেয়েছে সে। বদ্ধ ঘরে সেটা নেই।
মোনা দরজাটা বন্ধ করে তার দিকে ফিরে বলল, ঘুম না এলে শোওয়ার দরকার নেই। বসে বসে বরং লেখো।
বিস্মিত অমল বলল, লিখব?
আমি জানি, তুমি লিখতে ভালবাসো। আর যদি ঘুম পেয়ে থাকে তো শোও, আমি তোমার মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিই।
অমল মাথা নেড়ে বলল, না, আমি বরং অন্ধকারে একটু বসে থাকি। চুপচাপ।
তাই থাকো। আর দরকার হলে আমার সঙ্গে কথাও বলতে পার।
এত সহৃদয়তা আশাই করেনি অমল। ঠিক বটে, আজকাল তার সঙ্গে মোনার সমঝোতা চমৎকার। তবু এতটা বন্ধুত্বপূর্ণ হওয়ার কথা নয়। সে বড্ড অবাক হল। তারপর বলল, না, তুমি ঘুমাও। আমারই দোষ হয়েছে মাঝরাতে হঠাৎ ছাদে যাওয়ায়। তুমি হয়তো ভাবছিলে।
দোষ হবে কেন? ঘুম না এলে লোকে তো খোলা জায়গাতেই গিয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এখন বেশ শীত। এই ঠান্ডায় ছাদে যাওয়াটা বিপজ্জনক।
বুঝেছি। আচ্ছা আমি ঘরেই বসছি বরং।
কফি খাবে?
কফি? এত রাতে কোথায় পাবে?
কোনও অসুবিধে নেই। একটু আগেই বাবা উঠেছেন। ওঁর ঘরে গিয়ে পাঁচ মিনিটেই করে আনব।
অমল অবাক হয়ে বলে, বাবা উঠেছে? চারটে বেজে গেছে নাকি?
কখন। এখন চারটে কুড়ি।
ওঃ, তাহলে তো ভোরই হয়ে গেল।
কফি করে আনি?
আনবে?
বলে একটু দ্বিধা করল অমল। মোনাকে সে পারতপক্ষে কোনও কাজের কথা বলে না।
একটু বোসো। নিয়ে আসছি। বাবাও এ সময়ে কফি খান।
অমল বসে রইল ফাঁকা ঘরে। ছাদ থেকে এসে ঘরে ঢুকতেই সে ঘরের মধ্যে একটা বাসি গন্ধ পেয়েছিল। ভ্যাপসা, গা গোলানো গন্ধ। থাকলে পাওয়া যায় না, কিন্তু হঠাৎ বাইরে থেকে এসে বন্ধ ঘরে ঢুকলেই টের পাওয়া যায়, মানুষের শরীরও কিছু দূষণ ছড়ায়।
উঠে সে চোখেমুখে ঠান্ডা জল দিল।
হঠাৎ শুনতে পেল, নীচে মোনা তার শ্বশুরের সঙ্গে কথা কইছে। কী কথা তা বোঝা যাচ্ছে না বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে মোনার হাসির শব্দে বোঝা যাচ্ছে দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা সৌহার্দ্যপূর্ণ। এসব একটু আজগুবি লাগছে অমলের। কিছুদিন আগেও ছবিটা ঠিক এরকম ছিল না। তাদের বাড়ির লোকজন সম্পর্কে মোনার ধারণা ছিল, এরা একেবারেই আনকালচার্ড, ঝগড়ুটে, নিন্দুক এবং অন্যের ব্যাপারে বড় বেশি নাক গলায়। মহিম রায়কে সে একজন ব্যক্তিত্বহীন, অপদার্থ, নির্বোধ লোক বলেই জানত। কথা বলার প্রয়োজনটাও বোধ করত না। ধারণাটা কি পালটে গেল এত তাড়াতাড়ি? নাকি মোনা নিজের ভিতরকার সাপগুলোকে আঁপিতে বন্ধ করে রেখে প্রাণপণে কৃত্রিমভাবে সমঝোতার চেষ্টা করছে? কারণ মানসিকতা এমনিতে তো পালটায় না। তার একটা পদ্ধতি আছে। যাকে প্রসেস বলে। মোনা তেমন কোনও পদ্ধতির ভিতর দিয়ে যায়নি। কিন্তু সে তার বাইরের আচরণ অনেক বদলে ফেলেছে। সেটা কিছু কম কথা নয়। অভিনয় তো অমলও করে যাচ্ছে। সে জানে, এই বয়সে মোনা তাকে ছেড়ে চলে গেলে তার জীবনের ছকটা পালটে যাবে এবং সেটা মোটেই ভাল হবে না। সব সংসারেরই একটা প্যাটার্ন থাকে, প্রেম না থাকলেও। আর সেটাই আসল। সেই ছকটা হঠাৎ হাটকে মাটকে গেলে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয় সেটা সহজে ভরে তোলা যায় না। বন্য, বিশৃঙ্খল জীবন থেকে মানুষ যে সংসার বা পরিবার গড়ে তুলেছিল তা তো এমনি নয়। পরিবারই তাদের রক্ষাকবচ, অনেক মারের হাত থেকে ওই পরিবারই তো রক্ষা করে। প্রেম-প্রেম করে পাগল হওয়ার চেয়ে পরিবারের অবরোধটিকে দৃঢ় করে ভোলাই বরং বুদ্ধিমানের কাজ।
