কীসের গোলমাল?
ঠিক বুঝতে পারছি না। আরও ভাবতে হবে। আজ আর মরা হবে না। বরং বাড়ি যাই। ভেবে ব্যাপারটা বুঝে কাল বা পরশু এসে ফাঁসি যাব।
তা প্রস্তাবটা মন্দ নয়। এসো গিয়ে।
গাছটা হাই তুলে আপনমনে বলল, বাঁচা গেল। সারা রাত হাতে লাশ ঝুলিয়ে কি ঘুমোনো যায়!
একটা হাওয়াই চটি আর একটাকে ডেকে বলল, ওরে ঘুমোলি নাকি? ওরে ওঠ, কর্তা আজ মরছে না, ওই নামছে গাছ থেকে।
যাঃ বাবা, লম্বা ছুটি ভেবে জিবরাচ্ছিলুম, ছুটি কাটা গেল যে!
.
মোনা ঘরে ঢুকে বলল, শোনো, গ্রীষ্মকালে বোধহয় এখানে উইক এন্ডে আসা যাবে না।
লেখার কাগজ থেকে গভীর অন্যমনস্ক চোখ তুলে অমল বলল, কেন বলো তো!
এখানে যা গরম পড়ে, আর লোডশেডিং।
তা বটে। তারপর একটু চুপ করে থেকে অমল স্নিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ মোনা, তোমার এখানে আসতে এমনিতে খারাপ লাগে না তো!
মোনা তার দিকে চেয়ে একটু ভাবল। তারপর বলল, আগে লাগত। এখন লাগে না।
আমার বাড়ির লোকেরা তত কিছু ভাল নয়। কালচার-টালচার নেই তেমন।
একটা কথা শুনে রাখো। মেয়েদের অ্যাডজাস্ট করতে একটু সময় লাগে, কিন্তু যদি সে তার স্বামীর সাহায্য আর সহানুভূতি পায় তাহলে সে রাক্ষসের সঙ্গেও অ্যাডজাস্ট করে নেয়। বুঝেছ?
অমল মলিন মুখে বলল, হ্যাঁ, তাই বোধহয়।
বোধহয় বললে কেন?
আমার মাথা আজকাল তেমন কাজ করে না মোনা। আমি তো তোমাকে তেমন সহানুভূতি দেখাইনি, সাহায্যও করিনি। তাই ভাবছি …
মোনা এগিয়ে এসে তার মুখখানা দু হাতে তুলে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে একটা চুমু খেল। বলল, অত বুঝতে হবে না।
.
৬৯.
কথা বলল, আমার সঙ্গে কথা বলো তুমি। কেউ কি আছ কোথাও? ওই আকাশে, কিংবা শূন্যে, কিংবা পঞ্চভূতে? কেউ যদি কোথাও থেকে থাকো, ঈশ্বর বা সর্বময় কেউ, সর্বশক্তিমান কেউ, একটু চকিত আভাস অন্তত দাও তোমার। তুমি যে আছ, তা বুঝতে দাও। একবার একটিবার মাত্র আমার এই ঘোর আদিগন্ত একাকিত্ব, এই নিঃস্ব মন, এই ক্ষয়িষ্ণু শরীরের, এই অনস্তিত্বময় অস্তিত্বের উৎসকে একবার চিনে নিতে দাও। এতটুকু আভাস যদি পাই তোমার তা হলেই হৃদয় জুড়োবে। বাদবাকি জীবন নিজেকে বহন করা সহজতর হবে।
শীতের গভীর রাত্রি। চারদিকে ঘুমন্ত চরাচর। কুয়াশায় মাখা এক রহস্যময় জ্যোৎস্নার সামান্য ভুতুড়ে আলোয় ছাদে উধ্বমুখ হয়ে অমল দাঁড়িয়ে। মাথা গরম। বুকে হাতুড়ির মতো তার হৃৎপিণ্ড আছড়ে পড়ছে ভঙ্গুর পাঁজরে। দাতে দাতে ঠকঠক শব্দ হচ্ছে। শীত হয়তো আছে, কিন্তু অমলের ভিতরে আজ যেন সব উত্তাপ নিবে গেছে। রক্ত আজ সাপের রক্তের মতো ঠান্ডা। সর্বাঙ্গে বয়ে যাচ্ছে শীতের প্রহারের কম্পন। পৃথিবীতে এত শীতও আছে এতকাল বুঝতেই পারেনি সে। ঘরে লেপের তলায় নিশ্চিন্তে গভীর ঘুমে ঢলে আছে সবাই। তার বউ, ছেলে, মেয়ে। এই শীতের রাতে হঠাৎ এত অনিকেত কেন লাগল নিজেকে কে জানে। লেপের খোলস ছেড়ে সে নিঃশব্দে উঠে এসেছে ছাদে। কেন তাও সে জানে না। শুধু জানে, এই অর্থহীন জগৎ তাকে পাগল করে দিচ্ছে ক্ৰমে। কেন এই জগৎ? কেন এই চৈতন্য? এর কোনও স্রষ্টা নেই? শেষ নেই? ব্যাখ্যা নেই? অর্থ নেই? কেন এই আশ্চর্য ধাঁধা তার চারদিকে? এ কি অর্থহীন জড়বস্তুর সমাহার? কেন এসব? কী এসব?
না, মোনার সঙ্গে তার কোনও ঝগড়া হয় না আজকাল। বিচ্ছেদ হতে হতেও তারা খাদের কিনারা থেকে কিছুটা সরে এসেছে। খুবই সতর্কতার সঙ্গে নিজের কথা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করছে অমল। তার ফলে সমঝোতা চমৎকার দুজনের মধ্যে। দৈহিক সম্পর্কটাও প্রায় নিয়মিত। কিন্তু মানসিক? শুধু অমল জানে, কী শূন্য হৃদয় তার। সেখানে কোনও তরঙ্গই ওঠে না আর। ভাগ্য ভাল মনের ভিতরটাকে আর কেউ দেখতে পায় না।
আজ রাতে এক অলৌকিককে অনুভব করতে চাইছে অমল। তার তো বিশ্বাসের কোনও স্থণ্ডিল নেই। তাকে পৈতে পরিয়েছে বউদি, গায়ত্রী জপ করার পরামর্শ দিয়েছে। তাও কি করেনি অমল? কিন্তু আধখানা মন নিয়ে কি ওসব হয়?
একদিন সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, গায়ত্রী জপ করলে কী হয় বাবা? কিছু কি হয়?
প্রশ্ন শুনে মহিম রায় বিস্মিত এবং একটু বিব্রতও। একটু হেসে বলল, কেন রে?
সেই কবে তুমি আমার পৈতে দিয়েছিলে! কিন্তু দণ্ডিঘর ছেড়ে বছরখানেক কিছু করেছিলাম। তারপর সবই ছেড়ে দিয়েছি।
মহিম তার বিদ্বান ছেলেকে কী বলবে তা ভেবে পেল না প্রথমে। অনেকক্ষণ বাদে বলল, মন্ত্র তো মনকে ত্রাণই করে। করার কথা।
আমি তো আজকাল গায়ত্রী জপ করি। কিছু হয় বলে টের পাই না তো!
মহিম ফের একটু বিব্রত। ছেলে সাহেব এবং নাস্তিক হয়ে গেছে বলেই সে জানে। ছেলের সঙ্গে শাস্ত্রালোচনা করতে বোধহয় ভয়ও পায়। তাই খুবই নরম গলায় বলল, সব মন্ত্রেরই একটা সাক্ষাৎকার আছে।
অবাক হয়ে অমল বলে, সেটা কী বাবা?
কথাটা বলেই মহিম আরও বিব্রত এবং অপ্রতিভ। আবার একটু ভেবে বলল, আসলে ওসব একটু ভক্তি-বিশ্বাস নিয়ে করলে ভাল। পরীক্ষা করার মন নিয়ে করতে গেলে তেমন কিছু হয় না।
আমি তো বিশ্বাস করতেই চাই বাবা। কিন্তু জপ করেও তো বিশ্বাস আসছে না। কেন আসছে না বল তো!
বাবার মুখ দেখেই অমল বুঝতে পারছিল, এসব সংগত প্রশ্নের সামনে তার বাবা অসহায় বোধ করছে, থই পাচ্ছে না, কূল-কিনারা পাচ্ছে না। বাবা বিশ্বাস করেই বড় হয়েছে, বিশ্বাস নিয়েই বুড়ো হয়েছে। কখনও তো প্রশ্ন করেনি ব্যাপারটাকে। তার কাছে দুনিয়াটা স্বাভাবিকভাবেই ঈশ্বরসৃষ্ট, এবং তার ঈশ্বর কোথাও আছেন, ঠিকানা না জানা থাকলেও আছেন নিশ্চয়ই। এই বিশ্বাস আমৃত্যু তাকে বন্ধুর মতো সাহচর্য দেবে। এই বিশ্বাস আছে বলেই কোনও লজিক্যাল প্রশ্ন বিষধর সাপের মতো ফণা তুলবে না তার সামনে। কিন্তু অমলের তো তা নয়। তার কাছে এই চারদিকের জগৎসংসার স্বাভাবিক নয়। এ এক ধাঁধা। অর্থহীনভাবে ফলিত হয়ে আছে। এর না আছে উদ্দেশ্য, না আছে অর্থ, না ব্যাখ্যা। ঈশ্বর এক ঠিকানাবিহীন, নামগোত্রহীন নন-এন্টিটি। যদি সে না-ই থাকে তাহলে এই সৃষ্ট জগতের ধাঁধা আরও জটিল ও কঠিন হল। আশ্রয়হীন, সংহতিহীন এক বিশৃঙ্খলা মাত্র। এটা ওটা এখানে সেখানে পড়ে আছে। মাত্র, কারও সঙ্গে কারও কোনও প্রয়োজন বা সম্পর্ক নেই। সারা জগৎত্ময় ওইসব জড়বস্তুর আয়োজন, যার সমাবেশ থেকে কিছুই বুঝবার উপায় নেই। এসব কেন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে? কী কাজ করছে এরা? কেন করছে? আর এই জড় জগতে সব কিছু জড়িভুত থাকার কথা, হঠাৎ তার মধ্যেই কেন চৈতন্যের উন্মেষ? আর তা হলই বা কেন?
