কান থাকলে ঠিক শুনতে পেতে, বাতাসে একটা হায় হায় শব্দ ছড়িয়ে যাচ্ছে।
তুমি নির্যস পাগলই বটে হে। তবে স্বীকার করি, তুমি বেশ কথা কইতে পারো। আগডুম বাগড়ম বলছ বটে তবে বেশ গুছিয়ে বলছ।
কথা আমি মোটেই কইতে পারি না। আমাকে কথা কওয়ায় পরিস্থিতি। যখন যেমন কথার জোগান পাই তখন তেমন বলি। বললে প্রত্যয় যাবে না, আমাকে কথা কওয়াচ্ছে তোমারই চারদিকটা।
বেড়ে বলেছ ভায়া। কথাটা বোধহয় খানিকটা ঠিকই। মানুষ কি আর সাধে আজেবাজে কথা কয়। আমার বউমাগী ফুলি যদি অমনধারা কুরুক্ষেত্তর না করত তাহলে কি আমিই অমন সব মুখোরাপ। করতাম!
আহা, তোমার শোনার কানই নেই কিনা।
তার মানে?
ফুলি মুখে যা কয় তাই কি কথা? তার মনেও তো কিছু কথা ভুড়ভুড়ি কাটে, না কি?
তা কাটতে পারে।
সেইটে কি তুমি শুনতে পাও?
না বাপু, আমার অত শোনার প্রবিত্তি নেই।
সেইজন্যই তো বলি, তোমার শোনার কান নেই। ফুলি তোমাকে যখন মরতে বলে তখন কি আর সত্যিই মরতে বলে? তুমি মরলে তার লাভটা কী বলো তো!
ওই বজ্জাত মাগীকে তো চেনো না, তাই বলছ। হাড়মাস চিবিয়ে খাচ্ছে হে।
আচ্ছা বাপু, সে না হয় বুঝলুম। কিন্তু তোমাদের তো কখনও-সখনও আদর সোহাগও হয় নাকি?
সে কালেভদ্রে।
তখন ফুলি কী বলে? ভাল ভাল কথা কয় না তখন?
তা কইবে না কেন? খুব আঁঠালো কথাই কয়। তবে সেগুলো ওর মনের কথা নয়।
তাহলে বাপু যখন রেগেমেগে গালাগাল দেয় সেও তার মনের কথা নয়। বুঝলে?
তুমি আমাকে প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করছ বুঝি? সুবিধে হবে না। আমার পরিবারকে আমি খুব চিনি। গলায় দড়ি দিয়ে মাগীকে কঁদিয়ে ছাড়ব, তবে আমার নাম দীনু দাস।
বেশ কথা। ফুলি কাঁদলে খুশি হও বুঝি?
তা নয় তো কী?
কিন্তু ফুলি কাঁদলে খুশি হবে কেন তা ভেবে দেখেছ কী?
ও আর ভাবার কী আছে। মাগী আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে কাঁদছে এটা ভাবতেই সুখ।
বলি ভেবে দেখেছ কী, ফুলিই বা কাঁদবে কেন? তোমার তাকে দিয়ে সুখ, আর ফুলির তোমার জন্য কেঁদে সুখ। ব্যাপারটা কী দাঁড়ায়?
কী আর দাঁড়াবে? এবার বুঝবে দীনু দাস ছাড়া কেমন চলে।
ওই তো বললাম, কান নেই বলে শুনতে পেলে না।
কী শুনলুম না বলো তো!
এই যে গাছ কথা কইছে, হাওয়াই চপ্পল কথা কইছে, ঝিঁঝি কথা কইছে, বাতাস কথা কইছে, গাছের কোটরে ব্যাঙ্গমাব্যাঙ্গমী কথা কইছে, বিবেক কথা কইছে সব কি শুনতে পাচ্ছ?
দুর! ওসব তোমার মনগড়া কথা। কেউ কিছু কইছে না।
কইছে হে কইছে। ফুলির মনেও ভুড়ভুড়ি ওঠে হে, তুমি শুনতে পাও না।
চুলোয় যাক ভুড়ভুড়ি। ভুড়ভুড়ি ধুয়ে কি জল খাব! খান্ডার মাগীর মনটাও তো আস্তাকুঁড়।
না হে, কথাটা ঠিক হল না। এ হল মাথাগরমের কথা। ঠান্ডা মাথায় ভাবলে অন্যরকম মনে হবে।
তুমি ঠিক কে বলো তো! পাগল যে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু নামটা কী?
আমার নাম আমি।
যাঃ, ও আবার একটা নাম হল নাকি?
ওইটেই যে আমার নাম। আমি, ইচ্ছে হলে আমি দাসও বলতে পারো।
ও আবার কেমনধারা নাম! আমি দাস।
কেন, নামটা কি খারাপ? তুমি দীননাথ হলে আমার নাম আমি হতে বাধা কী?
তা বটে। তবে কিনা কাউকে আমি বলে ডাকলে পাঁচজন না আবার আমাকেই পাগল ভাবে।
কিন্তু আসল কথাটাও যে তাই।
তার মানে?
তুমি যে আসলে আমিই।
দুর পাগল! আমি আবার তুমি হব কী করে?
হতে হবে না, হয়েই আছ।
দেখ বাপু, পাগুলে কথা কয়ে আমার মাথাটা আর গুলিয়ে দিও না। একটু বাদেই আমি পটল তুলব, মেলা কাজ রয়েছে হাতে। দড়িখানা ভাল করে গাছের ডালে বাঁধতে হবে। ফঁসটা ভাল করে দিয়ে তুলতে হবে। তারপর ধরো ঠাকুর-দেবতাকেও একটু ডাকতে হবে। এ সময়ে মাথা গুলিয়ে গেলে চলবে না। তুমি এবার বরং এসো গিয়ে।
ব্যস্ত হয়ো না। মরাটা এমন হাতিঘোড়া ব্যাপার নয়। নিত্যি দুনিয়া জুড়ে হাজারে হাজারে মরছে। দু দণ্ড দেরি হলেও ক্ষতি নেই। সারা রাত তো পড়ে আছে সামনে।
না হে বাপু, শুভস্য শীঘ্রম। দেরি হলে আবার মন ঘুরে যেতে পারে। তাই দেরি করাটা ঠিক হবে না।
আহা, তার আগে যে দুটো কথা ছিল।
কী কথা?
তুমি তো কানেই তুলতে চাইছ না। এই যে বললুম আমার নাম আমি, তাও তুমি ব্যাপারটা ধরতে পারলে না।
ভেঙে বলবে তো!
তাই বলছি। এই যে আমাকে দেখছ এই আমি আসলে তুমিই। তবে পটল তোলার পর।
ফের প্যাঁচ মারছ?
মাইরি না। তুমি পটল তোলার পর তোমার যে অবস্থাটা দাঁড়াচ্ছে সেটাই হচ্ছে আমি।
ইয়ার্কি মারার আর জায়গা পাওনি। আমি তো এখনও পটলই তুলিনি। তুলতে যাচ্ছি মাত্র। ঝুলব, ছটফট করব, মরব, সে এখনও ঢের দেরি।
ওরে বাপু, মরা তোমার হয়েই গেছে। তোমার ভিতর থেকে আমি বেরিয়ে পড়েছি যে। এখন ও শরীর ঝোলাও, না ঝোলাও একই কথা। মোট কথা, তুমি মরেই গেছ।
অ্যাঁ!
তাই তো বলছি। তুমি মরেই তো আমি হলুম। না মরলে আমার দেখা পেতে নাকি?
বটে! তাহলে তুমি হচ্ছ মরা আমি?
এইবার ধরেছ ঠিক।
তা মরে কেমন লাগছে তোমার?
দুর, নতুন কিছু তো বুঝছি না। একই রকম। বরং ফুলির জন্য বড্ড মনটা আনচান করছে, মেয়েটার কথা ভেবে কান্না আসছে।
অ্যাই! ফুলির কথা তোলার তুমি কে? ফুলি তো আমার বউ!
সে আমারও বউ।
বললেই হল! ফুলি তোমার বউ হতে যাবে কেন?
আহা, হতে বাধা কী?
বাধা আছে বইকী!
ভাল করে ভেবে বলল। বরং ফের একটা বিড়ি ধরাও।
দীনু বিড়ি ধরাল, আমি দাসকেও একটা দিল। তারপর কষে ভাবতে লাগল। তারপর বলল, না হে একটা গোলমাল হচ্ছে।
