এখন মুশকিল হল, লোকটা কেমন এবং কী মতলব তা না বুঝে দীনু গলায় দড়ি দিতে পারছে না। লোকটার হয়তো দয়া উথলে উঠবে, দীনুকে বাঁচানোর চেষ্টা করবে। নয়তো উপদেশ-টুপদেশ দেবে। ওসব ভ্যাজর ভ্যাজর এখন আর তার সহ্য হবে না।
দীনু অগত্যা বিড়িটা ফেলে গলাখাঁকারি দিয়ে বলল, বলি কোথা থেকে আসা হচ্ছে?
লোকটার মুখ ভাল দেখা যাচ্ছে না। তবে গলার স্বর শুনে মনে হল, কথা কওয়ার তেমন জো নেই। বলল, কাছে-পিঠেই থাকি।
বিড়ি-টিড়ি চলে?
তা চলে।
খাবে নাকি একটা?
লোকটা হাত বাড়াল। দীনু একটা বিড়ি আর দেশলাই এগিয়ে দিল হাতে। লোকটা বিড়ি ধরিয়ে উদাসভাবে টানতে লাগল।
ভাবসাব করতে হলে বিড়ির মতো জিনিস নেই। চট করে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। দীনু ফের একটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, তা মতলবটা কী? সাঁঝেরবেলায় গাছে এসে উঠেছ যে বড়!
কেন, উঠতে বাধা কীসের? ইচ্ছে হল তাই উঠে পড়লাম।
হাসালে বাপু। গাছে উঠতে ইচ্ছেটাই বা হবে কেন? পাগল নাকি হে তুমি?
তা পাগলও একটু আছি বোধহয়। মাথায় একটু গণ্ডগোল আছে যেন।
তা তোমার হাবভাব দেখেই বুঝেছি। তা বাপু, এ-গাছটাই তোমার পছন্দ হল যে! জঙ্গলে কি আর গাছ নেই?
তা আছে।
তবে?
অন্য গাছে তো আর তুমি নেই!
যাঃ বাবা, তুমি কি আমাকে দেখেই এ-গাছে উঠলে নাকি? এ তো বড় মজা মন্দ নয়। কেন হে বাপু, আমি যা করব তোমাকেও কি তাই করতে হবে?
লোকটা তেমন নির্বিকার গলায় বলল, না, ঠিক তা নয় বটে।
তাহলে?
মনে হল তোমার সঙ্গে এ সময়টায় থাকলে ভাল হবে।
এ সময়টা বলতে কী বোঝাতে চাইছ?
তুমি তো মরতে এসেছ?
কী করে বুঝলে?
না, তা অবশ্য বোঝা যায় না বটে, কেমন যেন সন্দেহ হল।
দুর দুর, মরা-টরা নয় রে বাপু, গাছে উঠেছি চন্দনা পাখি ধরতে। সন্ধের পর হলে ধরতে সুবিধে।
ও। তা হবে।
বিশ্বাস হল না বুঝি?
তা হবে না কেন? দুনিয়া জুড়ে কত মানুষ কত অদ্ভুত মতলব নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
তাহলে তো বুঝতেই পারছ তোমার সন্দেহটা ঠিক নয়।
তাই হবে হয়তো। চিরটা কাল তো কত ভুলই বুঝলাম। তোমার ওই ঘেঁড়া হাওয়াই চপ্পলজোড়া দেখেই পুরনো কথা সব মনে পড়ছিল কি না। তাই গাছে ওঠার আগে বসে বসে তোমার চপ্পলজোড়ার সঙ্গে কথা কইলাম।
চপ্পলজোড়ার সঙ্গে! পাগল আর কাকে বলে। তা চপ্পল তোমাকে কী বলল?
জিজ্ঞেস করলাম, ওরে বাপু, তোরা এখানে এমন একাবোকা পড়ে আছিস কেন? তো তারা বলল, জানো না বুঝি! আমাদের কর্তা গলায় দড়ি দিতে গাছে উঠেছেন। আজ থেকে আমাদের ছুটি।
বলল?
হ্যাঁ গো, পষ্ট বলল, তা আমি জিজ্ঞেস করলাম, কর্তা মরতে চায় কেন। চপ্পলজোড়া ভারী কাচুমাচু হয়ে বলল, কর্তার মনে বড় অশান্তি। পরিবারের সঙ্গে খুব ঝগড়া হয় কিনা।
দীননাথের একটু প্রেস্টিজে লাগল। একটু ঝঝের গলায় বলল, ঝগড়া হয় তো হয়, তাতে ওদের কী? বড় আম্পদ্দা তো তুচ্ছ হাওয়াই চপ্পলের!
আহা, শুধু চপ্পলই বা কেন, এই যে গাছটায় উঠে বসে আছ, এও তো সাক্ষী আছে।
বটে!
তবে আর বলছি কী, গাছে ওঠার সময় জিজ্ঞেস করলাম, ওহে বাপু, লোকটা কি ঝুলে পড়েছে। গাছ হাই তুলে বলল, আর বোলো না ভায়া, সাঁঝবেলাতেই আমার রাজ্যের ঘুম পায়। কিন্তু ঘুমুবার কি জো আছে! চোখটি লেগে আসছিল সবে এমন সময় হাড়হাভাতেটা এসে হাজির। কী না গলায় দড়ি দেবে। সেই যে ঘুমটা চটকে গেল আর চোখের পাতা এক করতে পারিনি। নবাবপুর গাছে উঠেছেন ঝুলবেন বলে, আর আমাকে ফাঁসিকাঠ হতে হবে।
বলল?
তবে আর বলছি কী! আমি বললুম, ঝুলে পড়েছে নাকি? গাছ তখন ভারী তেতো গলায় বলল, তাহলে তো বাঁচতুম। ঝুলবার বায়নাক্কা কি কম! বাবু এখন আরাম করে বসে বিড়ি ফুঁকছেন আর জ্বলন্ত বিড়ি আমার গায়েই টিপে টিপে নেবাচ্ছেন। ছ্যাঁকার চোটে প্রাণ অতিষ্ট হয়ে গেল। কী বিড়ি-খেকো লোক রে বাবা। সবাই মরার আগে কেন যে এত বিড়ি ফোঁকে কে জানে বাবা। আমার তো এটা নিয়ে ছয় নম্বর। তার মধ্যে একটা বউমানুষও ছিল, তা সে বিড়ি খায়নি বটে, কিন্তু গলায় দড়ি দেওয়ার আগে দু কলসি চোখের জল ফেলেছিল। বড্ড ঝামেলা হে। তা যাও বাপু, গিয়ে লোকটাকে বলল যা করবে তা ঝটপট করে ফেলতে। আমি আর কতক্ষণ রাত জেগে থাকব বলতে পারো?
এবার বিড়িটা আর গাছের গায়ে টিপে নেবাল না দীননাথ। একটু ধরে রইল। বিড়ির আগুন ক্ষণস্থায়ী, সহজেই নিবে যায়।
দীনু বলল, বানিয়ে বানিয়ে বলছ না তো!
লোকটা উদাস গলায় বলল, কী লাভ?
পাগলের মাথায় নানা রকম নতুন কথা আসে জানো তো!
তা জানব না? পাগল কি কম দেখেছি জীবনে?
আর একটা বিড়ি খাবে নাকি?
আছে?
মেলা আছে। এক বান্ডিল কিনেছিলাম, সব কটা কি আর মরার আগে খেতে পারব? এই নাও, ধরাও।
লোকটা বিড়ি ধরিয়ে বলল, তুমি যা ভাবছ তা কিন্তু নয়।
দীনু অবাক হয়ে বলে, কী আবার ভাবলাম।
ভাবছিলে দিব্যি চুপি চুপি মরতে পারবে, কেউ টেরও পাবে না। তা কিন্তু নয়। সবাই টের পাচ্ছে, তুমি মরতে এসেছ।
আ মোলো যা, আবার কে টের পেল?
পোকামাকড়, কাকপক্ষী, হাওয়াবাতাস, গাছপালা সবাই।
তারাও সব তোমার কাছে আমার কুচ্ছো গাইছে নাকি?
ঠিক তা নয় তবে দেখছ না চারদিকটা কেমন ঝিম মেরে আছে!
তা আছে। তাতে কী?
ওই ঝিম মেরে থাকা মানেই সবাই অপেক্ষা করছে সর্বনাশটার জন্য। দুঃখও পাচ্ছে।
বাজে কথা।
