বাহবা না পেলে সেই কাজটা করে যেতে উৎসাহ থাকে কারও?
এখন সে সুমনের অপেক্ষায় আছে। যার জন্য এত করা সে যদি একটু নরম চোখে তাকে খুঁটিয়ে দেখে একটুখানিও খুশি হয় তাহলেই ঢের।
কিন্তু সে যে কবে আসবে, কখনও আসবে কিনা তা জানবে কী করে হিমি? কাউকে জিজ্ঞেস করতে তার ভয় হয়, বুক ঢিবঢিব করে। লজ্জার মাথা খেয়ে মরণকে জিজ্ঞেস করলে মরণ শুধু বলে, আমার দাদার কত কাজ! কী করে আসবে?
.
৬৮.
দুঃখী দীননাথ বউয়ের সঙ্গে ঝগড়া করে গলায় দড়ি দেবে বলে ভরসন্ধেবেলা মাধবপুরের জঙ্গলে এসে একটা বেশ মজবুত গাছে উঠে বসে আছে। যে দড়িটা গলায় দেবে সেটা সদ্য গোরুর গলা থেকে খুলে আনা, গোরু-গোরু গন্ধ ছাড়ছে। দড়িটা কোমরে পেঁচানো। দীননাথের গায়ে একটা ময়লা গেঞ্জি, কাঁধে গামছা। পরনে ময়লা ধুতি। গাছের ডালে বসে দীননাথ এখন বিড়ি খাচ্ছে। ঝুলে পড়ার আগে এই যে একটু সময় আরাম করে কাটাচ্ছে সে, এ সময়টা বড়ই মূল্যবান। সময় জিনিসটা যে কী ভীষণ দামি তা জীবনে এই প্রথম টের পাচ্ছে দীননাথ। চারদিক ভারি সুনসান, ধারেকাছে জনমনিষ্যি নেই, গাছের তলায় তার তাপ্পি দেওয়া পুরনো হাওয়াই চটিজোড়া পড়ে আছে। অনেক দিনের সঙ্গী, টেনে-মেনে দু-আড়াই বছর চটিজোড়া দিয়ে কাজ চালিয়েছে সে। আজ থেকে চটিজোড়ার বিশ্রাম। বেঁচে থাকতে কত কী লাগে। বড়লোকেদের বায়নাক্কা বেশি বটে, কিন্তু গরিব কাঙালদেরও বেঁচে থাকার হ্যাপা তো কম নয়। খিদেতেষ্টা, লজ্জা নিবারণ, শীত-বর্ষার আচ্ছাদন, বিড়িটা-আশটা, একটা মেয়েমানুষ বা একটু ঘরদোর, হিসেব করলে কম নয় ব্যাপারটা। আর ভেবে দেখলে এই দেহখানার জন্যই যা ঝাট। এটি না থাকলে আর কোনও ঝামেলা থাকে না। তার বউ ফুলি বড্ড গেছে মেয়েছেলে, একটা দিন শান্তিতে তিষ্ঠোতে দেয়নি তাকে। মেয়েছেলের শরীরের ক্ষ্যামতা না থাক, গলার জোরেই পুরুষ কাত। আর সেই জোরটা দীননাথের মোটেই নেই। কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে পাল্লা দেয় বটে, তারপর বাক্যে না পেরে কিলোয়। কিন্তু তাতেও লাভ হয়েছে লবডঙ্কা। কিল-চড় খেয়ে যেন ফুলির গলার জোর দুনো হয়। বাক্যে বড্ড ঝাঁঝরা হয়েছে দীনু। কতবার ভেবেছে বাক্যে তো আর শরীরে ছ্যাঁকা লাগে না, কানে না তুললেই হল। তা সে চেষ্টাও কম করেনি সে। বাক্যেরও কিছু কেরানি আছে বইকী, বাক্য দিয়ে বোধহয় মানুষও মারা যায়।
দীনু, অর্থাৎ দীননাথ বিড়িটা ফেলে আর একটা ধরাল। বেশ ধকওলা ঝাঁঝালো বিড়ি। কালিপদর দোকানের বিড়ির স্বাদই আলাদা। কালো সুতোর মুগুর ব্র্যান্ড এই বিড়ির দাম দেড়া। আজ জীবনের শেষ দিন বলে কিনেছে দীনু। পুরো এক বান্ডিল। সঙ্গে নতুন দেশলাই।
মাধবপুরের জঙ্গলে আগে বাঘ ছিল। আরও নানা জানোয়ার দেখা যেত মাঝে মাঝে। কয়েকটা হরিণও দেখেছে সে ছেলেবেলায়। এখন শেয়ালও নেই বড় একটা। জঙ্গলটাই উঠে যাবে কিছুদিন পর। পুব ধার, পশ্চিম ধার সব দিক দিয়েই ধীরে ধীরে জঙ্গল হাসিল হচ্ছে। ঘন জঙ্গল ছিল এক সময়ে, এখন ভিতরটা অনেক ফাঁকা ফঁকা। গাছপালা কাটা হচ্ছে রোজই। কাঠের দাম এখন আগুন।
অন্ধকার নেমে আসছে ক্ৰমে। তবে খুব একটা ভয় নেই। আজ পূর্ণিমা। একটু বাদেই মস্ত চাঁদ উঠবে পুব ধারে। উঠেও গেছে বোধহয় খানিকটা। গাছপালার জন্য দেখা যাচ্ছে না। বিড়ি খেতে খেতে একটু কাশল দীনু। গুন গুন করে একটু গানও গাইল। মরার আগে একটু ফুর্তি করে নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু সে ভেবেই পেল না, ফুর্তিটা কীভাবে করবে। অভাবি মানুষ সে, ফুর্তি কীভাবে করতে হয় তা জানেই না। মাংস দিয়ে ভাত খেলে কি ফুর্তি হয়? কেত্তন শুনলে? যাত্রা দেখলে? অনেক ভেবেও সে ফুর্তির পথটা খুঁজে পায়নি। বিড়ি খেতে খেতে সে একটু ফুলির কথাও ভাবল। কতবার ফুলি তাকে গলায় দড়ি দিতে বলেছে, কিন্তু যখন সে সত্যিই গলায় দড়ি দেবে তখন মাগীর তেজ থাকবে কোথায়? হুঁ হুঁ বাবা, তখন তো গড়াগড়ি দিয়ে কেঁদে ভাসাবে। ভাসাক, তাই তো চায় দীনু। তবে তার কচি মেয়েটার জন্য বুক একটু টনটন করে। মাত্র বছর চারেক বয়েস। খুব বাপন্যাওটা। তবে মায়া বাড়িয়ে লাভ নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনে দীননাথ চমকে উঠে ডানধারে তাকাল। অবাক হয়ে দেখল, কখন নিঃশব্দে আরও একটা লোক তার কাছ ঘেঁষেই এসে বসেছে। কখন গাছে উঠল, কখন এসে বসল তা দীনু মোটেই টের পায়নি। তারই মতো বয়স হবে। গরিব-দুঃখী মানুষ বলেই আবছা অন্ধকারে মনে হল।
দীনুও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আজকাল নিরিবিলি জায়গা খুঁজে পাওয়াই ভার। মাধবপুরের জঙ্গলে নিশ্চিন্তে মরতে এসেছে সে, এখানেও উটকো একটা লোক এসে জুটে গেল। কী মতলব কে জানে। সন্ধেরাতে গাছ-টাছে উঠতে নেই, সবাই জানে। তবু যদি উঠতেই হয় তবে অন্য গাছে গিয়ে ওঠো না বাপু, দীনুর গাছটাতেই উঠতে হবে এমন তো কথা নয়।
উত্তেজিত হলেও দীনু ফস করে কিছু বলল না। বিড়ি খেতে খেতে আড়ে আড়ে চেয়ে লোকটাকে ঠাহর করতে লাগল। লোকটার হাবভাব কিছু অন্ধকারে বোঝা গেল না। এও কি গলায় দড়ি দেবে বলেই গাছে উঠেছে? কে জানে বাবা। তবে ফাঁসি দেওয়ার জন্য গাছেরও তো অভাব নেই। আর ফাঁসিই বা কেন, মরার কত উপায় আছে। আড়াই মাইল হেঁটে গেলেই রেলরাস্তা। গামছা পেতে লাইনে মাথা দিয়ে শুয়ে ঘুম লাগাও। এক সময়ে ট্রেন এসে কাজ ফর্সা করে দিয়ে চলে যাবে। টেরটিও পাবে না। কিংবা এক বোতল অ্যাসিড বা পোকা মারার বিষ কিনে ঢক ঢক করে মেরে দাও, লক্ষ মেরে আকাশে উঠে পড়বে।
