ওসব কী কথা মা! এতকাল বলে এসেছ, শুনেছি। কিন্তু এখন একটু মুখটা সামলাবে তো। ছেলেপুলেরা বড় হচ্ছে না? ভক্তিছেদ্দা শিখবে কিছু ওসব শুনলে?
ও মা! বাঙাল লোকদের আবার ভক্তিছেদ্দা কীসের রে? ওসব ডাকাত লুঠেরা লোক। দেখলি না গাঁয়ে এসেই কেমন রসালো জমিগুলো গাপ করে নিল। যারা দুটো-চারটে করে বিয়ে বসে তারা আবার ভাল লোক! রাঁঢ় পুষলেও না হয় কথা ছিল, বিয়ে বসে কোন আক্কেলে রে?
তুমি দোক্তা কুড়িয়ে নিয়ে বিদেয় হও তো! বেশি কথা কয়ো না। আমার বাঙাল বরই ভাল। জন্মে জন্মে যেন আমার অমন বাঙাল বরই হয়।
বলিস কী লো মুখপুড়ি? এ যে নিজে কুড়িয়ে অভিসম্পাত নিলি! মাথাটা তোর খেয়েছে দেখছি।
যখন দশটি হাজার টাকা নিয়ে নিজের মেয়েকে ওই বাঙালের কাছে বেচে দিয়েছিলে তখন এত শাস্ত্রজ্ঞান কোথায় ছিল? তখন তো বাঙাল বলে ঠোঁট বাঁকাওনি, হাতও গুটিয়ে নাওনি!
ও মা! তখন কি বুঝেছিলুম রে বাপু! এমন সোনাহারা মুখ করে এসে দাঁড়িয়েছিল যেন ভাজা মাছটি উলটে খেতে জানে না। ওরা সব কামিখ্যের ডাকিনী বিদ্যে জানে, এক এক সময়ে এক এক রূপ ধরে। বুঝতে পারলে কি আর গুখেকোর মতো কাজ করি! একটা বাঙাল মরলে দুটো গোখরো সাপ জন্মায়।
খুব হয়েছে মা, তোমার আর বেশি বুঝে কাজ নেই। এতই যদি সে খারাপ তবে তার বাড়িতে এসে রাজ থানা গেড়ে বসে থাকো কেন, তার চাল ডাল টাকা হাত পেতে নিয়ে যাও কোন লজ্জায়?
বাঙালের জিনিস হলে নিতুম নাকি রে পোড়ারমুখি? তোর জিনিস বলে নিই। না দিস তো না-ই দিবি, অত কথা কীসের? তবে এও বলি বাপু, বাঙাল তোকে ওষুধ করে রেখেছে। ঘোর কাটলে টের পাবি।
এ যেন একটা টেপ রেকর্ডারে একই ক্যাসেট ঘুরে ফিরে বাজছে। জ্ঞান হয়ে অবধি মা আর জিজিবুড়ির এইসব চাপানউতোর শুনে আসছে মরণ। দুজনে লাগলেই মরণ মনে মনে নারদ মুনিকে ডাকতে লাগে। মা যত রাগবে সেদিন ততই মায়ের হাতের রান্না খোলতাই হবে। এর কখনও নড়চড় হয়নি। রেগে গেলে মায়ের হাত যেন অন্নপূর্ণার হাত। আজ আবার বাঙাল এসেছে, দু-চারটে ভালমন্দ হবে।
তোমরা কত ভাল তা জানা আছে। মানুষটাকে খুন অবধি করতে চেয়েছিল তোমার হিরের টুকরো ছেলেরা। আজও লোকটার কাঁধে আর পিঠে ভোজালির দাগ দগদগে হয়ে আছে।
ওসব বাজে কথা। বাঙাল রটাল আর তুইও বিশ্বাস করলি। কার সঙ্গে কোথায় গণ্ডগোল করে রেখেছিল তারা খুনোখুনি করতে লোক লাগায়। সত্যিই যদি হবে তাহলে বাঙাল মামলা করল না কেন শুনি!
সে আমি হাতেপায়ে ধরেছিলুম বলে। সবাই জানে মা, আর গুণধর ছেলেদের সারতে চেয়ো না। খুব তো ছেলেদের হয়ে টানছ, তা সেই গুণধর ছেলেরা এখন দেখছে তোমায়? লাথি ঝাঁটা মুখনাড়া খেয়ে তো পড়ে আছ, আর রোজ এসে এ বাড়িতে একখানা ঘর দেওয়ার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করছ।
ছেলেদের দোষ কী? বউগুলো খচ্চড়।
তোমার হাতের পাতের টাকাকড়িগুলো তো আর বউরা কেড়ে নেয়নি, গয়নাগুলোও তারা গাপ করেনি। করেছে তোমার অকালকুষ্মাণ্ড ছেলেরা। আর কত মিছে কথা কইবে মা!
জিজিবুড়ি একটু দম ধরে বসে রইল উঠোনে। তারপর হঠাৎ গলাটা মিহিন করে বলল, তা বাঙালের মেজাজটা ঠান্ডা হলে একবার কথাটা তুলিস। বেশি কিছু তো নয়, ওই পশ্চিমের দালানের নীচেরতলায় কোণের ঘরটা যদি দেয়। আর দুবেলা দুমুটো ভাত। এটুকু কি আর তার গায়ে লাগবে? দোহাত্তা তো কামাচ্ছে বাবা।
ওসব মতলব ছাড়ো মা। সে রাজি থাকলেও আমি রাজি নই। কিছুতেই সেরকম বন্দোবস্ত হবে না।
পেটের শত্তুরের মতো শত্রুর নেই, বুঝলি?
গজর গজর করতে করতে জিজিবুড়ি পাছদুয়ার দিয়ে বিদেয় হল।
মা কিছুক্ষণ বারান্দার সিঁড়িতে চুপ করে বসে রইল ঝুম হয়ে। দুটো চোখ ধীরে ধীরে টস টস করতে লাগল জলে। চোখে আঁচল চাপা দিয়ে নীরবে কাঁদছে মা। কেন কাঁদে মরণ তা বুঝতে পারে। এখন সে বড় হয়েছে। মা বাঙালের কথা ভেবে কাঁদে। মা বাঙালকে বড্ড ভালবাসে। বাঙালকে কেন যে মরণ অত ভালবাসতে পারল না কে জানে।
সে কাছে গিয়ে ডাকল, মা!
হাত বাড়িয়ে মা তাকে ধরে পাশে বসিয়ে ধরা গলায় বলল, চুপটি করে বসে থাক। কথা বলিস না। আমার মনটা ভাল নেই।
একটু উশখুশ লাগছিল বটে, তবু মরণ চুপ করেই বসে রইল। মা আঁচল সরিয়ে কিছুক্ষণ উদাস চোখে সামনের দিকে চেয়ে রইল। সামনে ফর্সা উঠোন, চাটাইয়ে সর্ষে শুকোচ্ছে আর পুরনো তেঁতুল। একটা দুটো কাক ঘুরে ঘুরে উঠোনে নেমে আসছে। মা কাকগুলোকে হুড়ো অবধি দিল না। মায়ের মন আজ সত্যিই খারাপ।
বেশ কিছুক্ষণ বাদে মা হঠাৎ বলল, বড় ভয় করছে বাবা, শুনছি নাকি সুমন আসবে।
সুমন! সে কে মা?
বড়গিন্নির ছেলে।
ধম করে উঠল মরণের বুক। উত্তেজিত গলায় বলল, দাদা?
হ্যাঁ বাবা। তোর বাবা আজ খেতে বসে বলছিল, ছেলের নাকি খুব ইচ্ছে হয়েছে গাঁয়ের বাড়ি দেখে যেতে।
তাতে ভয় কী মা?
ভয় বলে ভয়। কী মনে করে আসছে তা তো জানি না। আমি তো তাদের শত্তুর।
কেন মা?
সংসার ভাঙিনি আমি? একটা সংসার দু টুকরো হল তো আমার জন্যই। ছেলে কি ভাল মন নিয়ে আসবে?
কথাটা ভাববার মতো। মরণেরও ভয় হচ্ছে একটু, আনন্দ হচ্ছে খুব। শহরের দাদা বা দিদির কথা সে কত ভাবে কত স্বপ্ন দেখে তাদের নিয়ে। বড়মার কথাও খুব ভাববার চেষ্টা করে সে।
সত্যিই আসবে মা?
তোর বাবা তো বলল।
