তোমার ওপর নজর আছে।
পান্না হাসল, কী করে বুঝলি?
তোমার কথা বলছিল খুব। খুব হ্যাংলা কিন্তু।
পান্না রাগ করল না। করবেই বা কেন, ওর সঙ্গে তো কত ছেলেই ভাব করতে চায়। সেটা অহংকারেরই ব্যাপার তো৷ হিমির সঙ্গে যদি রাজ্যের ছেলে ভাব করতে চাইত তাহলে কি হিমির রাগ হত? বরং বুক ফুলে উঠত অহংকারে।
পান্না বলল, শুনেছি, ছেলেটা গান গায়। তাই নাকি রে?
হ্যাঁ তো। হেমন্তের মতো গলা।
তুই কত গান বুঝিস!
না বুঝলে কী! শুনি তো। সবাই বলে।
একদিন নিয়ে আসিস তো! শুনবো!
শুনবে?
হ্যাঁ। দোষ কী?
বেশি লাই দিও না। ওরা কিন্তু বামুন নয়।
ওমা! বামুন নয় তো তাতে কী?
তোমরা তো বামুন, তাই বলছিলাম আর কী।
পান্না খুব হেসেছিল, বামুন হলে কী হত রে হিমি?
বোকা হিমি খুব লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু সে করবেই বা কী? ওই যে পান্না সুমনের গান শুনতে চাইল ওতেই তার ভিতরে একটা পাগলাঘণ্টি বেজে গিয়েছিল। যদি গান শুনে পান্নাও ঢলে পড়ে সুমনের দিকে!
আসলে ওই পান্না, ওই সুমন ওরা যেন মেঘের ওপরে থাকে। অত দূর নাগাল পৌঁছোয় না হিমির। হিমির মতো মেয়ের কাছে ওরা স্বপ্নের ঘোরের মতো। ওদের জগতে হিমির কোনও জায়গা নেই।
আজকাল আবছাভাবে হিমি বুঝতে পারে, ইচ্ছে মতো কিছু পেতে হলে মেয়েদের নিজস্ব কিছু গুণ থাকা দরকার। অনেক টাকা, না হয় রূপ, গানের গলা, বুদ্ধি এইসব। তার যে কিছুই নেই। তার যে বিয়ে হবে না তা নয়। কালো, মোটা বিচ্ছিরি চেহারার একজন মিস্ত্রি-টিস্ত্রি গোছের বা পানওয়ালা, মাছওয়ালা, মুদি যা তোক একজন জুটবে। সে তাকে ধামসাবে, চিবিয়ে খাবে, বাচ্চা পয়দা করবে, তারপর খুব নির্বিকার হয়ে যাবে। যেমন তার নিজের বাপ মা। ওরকমই তো হয়।
হ্যাঁ রে হিমি, বললি না ছেলেটা বামুন হলে কী হত!
হিমি হেসেছিল একটু। বলল, তোমাকে সাবধান করে দিলাম আর কী। বেশি প্রশ্রয় দিও না।
আচ্ছা, তা না হয় দেব না। ছেলেটাকে বলিস তো আমার সঙ্গে একদিন দেখা করতে।
ইস্। বলবে বই কী! কেন বলবে হিমি? হিমি কি পান্নার ক্রীতদাসী না দূতী? কক্ষনও বলবে না হিমি। তোমরা দুজনে উড়ে বেড়াবে আর আমি বুড়ো আঙুল চুষব বুঝি?
পান্নাদিকে আপনার কথা বলেছিলাম।
অবাক হয়ে বলল, কী বলেছ?
আপনি যে ভাব করতে চাইলেন।
এ মাঃ, তোমাকে বারণ করলাম যে! ইস, প্রেস্টিজ তো একদম ঢিলে করে দিলে দেখছি।
আহা, দোষের তো কিছু নয়।
দুর! তুমি খুব বোকা মেয়ে। কী বলেছ শুনি।
এই আপনি দেখতে খুব সুন্দর, খুব ভাল গান করেন।
কেন বলতে গেলে?
ভাবলাম পান্নাদি হয়তো ভাব করতে চাইবে।
কী বলল শুনে?
পাত্তাই দিল না।
তুমি আর এরকম কোরো না।
খুব অন্যায় হয়েছে?
তা হয়েছে। কথা চালাচালি হলে খুব মুশকিল হয়। এখানে সবাই খুব অন্যের ব্যাপারে নাক গলায়
পান্নাদিরা কিন্তু বামুন। চাটুজ্জে।
জানি ত! বামুন কায়েতের কথাও তুলল নাকি?
না, আমিই বলছি।
ও, তাই বলো। বামুন কায়েতের কথা মনে হল কেন তোমার?
বাঃ, মনে হবে না?
কেন হবে?
তাই তো! কেন হবে? হিমি যে সবসময়ে ছেলেতে মেয়েতে বিয়ের কথাই ভাবে ওরা হয়তো সেরকম ভাবে না। এরা তো মেঘলোকের মানুষ, হিমির মতো তো নয়। হিমির একটাই সুবিধে, সে সুমনদের স্বজাত। তারাও বৈশ্য। কিন্তু তাতে যে খুব একটা সুবিধে করা যায় না তাও সে বোঝে।
সুমনের কাছাকাছি আর এক কদমও এগোতে পারেনি হিমি। শুধু চলে যাওয়ার দুদিন আগে তাকে ডাকিয়ে এনে সুমন খুব নরম গলায় বলেছিল, তুমি রেশ ভাল মেয়ে। ভাল করে লেখাপড়া করো, গান শেখো। নিজেকে ছোটো করে রাখতে নেই। আমি আবার যখন আসব তখন যেন তোমাকে অন্যরকম দেখি।
এটা প্রেমের কথা কিনা তা অনেক ভেবেও পরিষ্কার হয়নি হিমির কাছে। সুমন কি বলতে চাইছিল যে, এরকম হিমিকে নয়, হিমি যদি আরও একটু তার মনের মতো হয় তাহলে সে হিমিকে ভালবাসতেও পারে? তাই বলতে চেয়েছিল সুমন?
তার পর থেকে হিমি একটু অন্যরকম হিমি হওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছে। হারমোনিয়াম নিয়ে ভোরবেলা বসে গলা সাধে। পান্নার কাছে গান শিখতে যায়। পড়াশুনোয় খুব মন দিয়েছে সে, যদিও ফল ফলতে শুরু করেনি। মুখে দই মাখলে নাকি ভাল, তাই সে আজকাল মুখে মাঝে মাঝে টক দই মাখে। তাদের ব্যায়ামের দিদিমনি তাদের মাঝে মাঝে বলে, ফিটনেসই হচ্ছে আসল সৌন্দর্য। যারা কসমেটিক মেখে সুন্দর হতে চায় তারা বোকা। ভাল, ছিপছিপে শরীর, সতেজ চামড়া, চলায় ফেরায় ছমছমে ভাব, চটপটে হাত পা, ভাল দাঁত, ভাল চুল এসবই হল আসল সৌন্দর্য। আর সঙ্গে চাই ব্যক্তিত্ব।
অত শক্ত শক্ত কথা তার মাথায় থাকে না। তবে সে আজকাল স্কিপিং করে, নাচের ক্লাসে যায়। এসব করে সে খানিকটা খানিকটা এগিয়েছে কিনা তা অবশ্য বুঝতে পারে না।
একদিন সে ব্যায়ামের দিদিমনিকে জিজ্ঞেস করল, ব্যক্তিত্বটা কী জিনিস দিদিমনি?
নিজের মতামতকে শ্রদ্ধা করাই হল ব্যক্তিত্ব। অন্যের কথায় বা পরামর্শে ঢলে পড়তে নেই। সব সময়ে হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ করতে নেই, বিপদে পড়লে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। এইসব আর কী।
নিজের মতো করে হিমি এসবও যে প্র্যাকটিস করছে না তা নয়। কিন্তু কতটা কী ফল হচ্ছে তা বুঝতে পারছে না। এখনও কেউ মুগ্ধ চোখে তাকায়নি তার দিকে। কেউ বাহবা দিয়ে বলেনি, বাঃ রে, তোকে তো বেশ দেখাচ্ছে! সে যে একটু হলেও বদলে গেছে সেটাও কেউ লক্ষ করেনি আজও।
