না তো দিদিমা! ওসব আবার কী কথা!
আহা, ওই বলছিলাম আর কী। কাঁচা বয়সের ছেলে তো!
তুমিই তো পাঠালে!
আহা, আমি তো ভাল ভেবেই তোকে যেতে বললাম। তা বলে কি আর নজর রাখিনি! বলি, কী বলল-টলল? রসের কথাটথা কিছু বলেনি?
তুমি যেন কী দিদিমা! সুমনদা তো এমনি গল্প-টল্প করল।
আহা, ওর মধ্যেই কথা চাপা কথা থাকে। তা বিছানায় বসলি নাকি?
না, চেয়ারে।
মাথাটাথা টিপে দিতে বলেনি?
খুব রাগ হয়েছিল হিমির। বলেছিল, বললেই টিপব নাকি?
আহা, তাতে তো আর দোষের কিছু নেই। আবার যাস না হয় ফাঁক বুঝে।
কেন যেতে বলছ?
ওরে, তোর হিল্লের জন্যই বলছি।
পরদিন তাকে ডেকে বাসন্তীমাসি সব জিজ্ঞেস করেছিল। বলেছিল, খবর্দার মায়ের সঙ্গে কথা কইবি না। দেখলে অন্য দিকে চলে যাবি। মা যে কী সর্বনাশা মানুষ তা আমি জানি।
মেয়েরা কি সর্বনাশ চায় না? সর্বনাশকে ভয় পায়? মেয়েমানুষের যে সর্বনাশটা নিয়ে সমাজে এত চিন্তা-ভাবনা, এত সাবধানী হওয়া, এত শাসন আর আঁটবাঁধ তা কি লুকিয়ে রাখা আচারের শিশির মতোই লোভ দেখায় না মাঝে মাঝে? ভেসে যেতে ইচ্ছে করে না? হিমির মতো বয়সে পারে কি একটা মেয়ে নিজেকে অত সামলে-সুমলে রাখতে? শরীরেরও কত খবর সে জানে না। জানে না এখনও চুম্বনের সুস্বাদ, এখনও নিবিড়ভাবে পায়নি পুরুষের স্বেদগন্ধ। তাই ওই অত নিষেধ, অত ভয় সত্ত্বেও সে মাঝে মাঝে সুযোগ বুঝে সুমনের ঘরে গেছে।
গিয়ে দেখেছে, ছেলেটা হয় মোটা-সোটা বই পড়ে, নয় তো ঘুমোয়।
তবে হিমিকে একেবারে তাচ্ছিল্যও করেনি। বসে হেসে কথা বলেছে, চোখে চোখ রেখেছে। কিছু চোখের কথাও হয়েছে তাদের। প্রেম ব্যাপারটা হিমি এই চোদ্দো পনেরো বছর বয়সে ততটা বোঝে না। সে জানে, সব প্রেমেরই পরিণতি হয় বিয়ে, না হয় ছাড়াছাড়ি।
সুমন কেবল বন্ধুদের কথা বলত। ছেলের সঙ্গে মেয়ের বন্ধু-বন্ধু সম্পর্ক হয় বটে, কিন্তু শেষ অবধি বন্ধুত্বই তো ঝুল খেয়ে সেই প্রেমের কোলে গিয়েই পড়ে। আর প্রেম ঢলে পড়ে বিয়ের গায়ে। তাই না?
জিজিবুড়ি নজর রাখত ঠিকই। ধরল একদিন জামতলায়।
ওলো ও হিমি, বলি খবর-টবর কী রে?
কীসের খবর চাও?
বলি, কতদূর এগোলি?
কী বলছ বুঝতে পারছি না।
কচি খুকিটি তো নোস বাছা, সবই তো জানিস। বলি কী, বেশি সতীপনা থাকলে কিন্তু ফসকাবি।
তার মানে কী গো দিদিমা?
পুরুষমানুষকে একটু আসকারাও দিতে হয়। একটু হাত-টাত ধরলে, কি কাছে ঘেঁষলে চেঁচাসনি যেন বোকার মতো। ওতে তো আর মহাভারত অশুদ্ধ হচ্ছে না রে বাপু। ওভাবেই খেলিয়ে তুলতে হয়।
যাঃ, কী যে সব অসভ্য কথা বলো দিদিমা।
খারাপ কিছু বলিনি, তলিয়ে ভাবলে বুঝবি। তোর বাপের যা অবস্থা মেয়ে পার করতে কোমর বেঁকে যাবে। তিন তিনটে বোন তোর, সেদিকটাও তো ভাববি। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নে না কেন। মাখামাখি যদি করতে চায় তো ভালই তো। গেঁথে তুলতে সুবিধেই হবে। শহুরে ছেলে ওরা, খুব চালাক। পিছলে যাতে না যায় তার ব্যবস্থা করে রাখবি। বুদ্ধি খাটিয়ে চললে দেখিস, কাজ ফর্সা।
দিদিমা যে ভাল লোক নয় তা সবাই জানে, হিমিও জানে। আর কথাগুলোর মধ্যে ভারী অসভ্য ইঙ্গিত। তবু কিন্তু শরীরে একটু শিহরণ দিয়েছিল তার।
খুব ভালমানুষের মতো বুড়ি বলেছিল, তুই তো হাঁদা, তাই বলি, অত গা বাঁচিয়ে চললে কাজ হবে না। কাছ ঘেঁষে বসবি। মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দিবি, ওই সব যা করে আর কী। একটু হাতটা ধরলে ঝটকা মেরে সরে আসিস না যেন।
ইস, তুমি ভারী অসভ্য দিদিমা। বলে পালিয়ে এসেছিল হিমি।
কী করলে কী হয় তা কি অত জানে নাকি হিমি?
তবে সে তার সাধ্যমতো, যতদূর সাহসে কুলোয়, লজ্জার মাথা খেয়ে করেনি যে তা নয়।
একদিন দুপুরে নির্জন ঘরে সে বলেছিল, আপনার মাথা টিপে দেব?
খুব অবাক হয়ে সুমন বলল, কেন? আমার তো মাথা ব্যথা করছে না!
হিমি জব্দ হয়ে বসে রইল।
সুমন একটু হেসেছিল। সেটা যে করুণার হাসি তাও বুঝেছিল বোকা হিমি।
একদিন সুমন তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি পান্নাকে চেনো?
পান্না! রামহরি জ্যাঠার মেয়ে?
হ্যাঁ।
আপনি তাকে চেনেন?
না। তবে চিনতে চাই। তুমি চেনো?
চিনব না কেন? পান্নাদির কাছে আমি গান শিখতাম।
এখন শেখো না?
না। আমার গলা সাধতে ভাল লাগে না।
গান খুব ভাল জিনিস। শিখলে পারতে।
আমার গলা একটু চড়া।
তাতে কী? সাধতে সাধতে সুর এসে যায়।
পান্নাদির কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন?
মেয়েটা বেশ গায়।
হ্যাঁ, দেখতেও সুন্দর। পান্নাদিকে আপনার কথা বলব?
না না, আমার কথা বলতে হবে না।
বোকা হিমি কী করে যেন বুঝতে পেরেছিল, সুমন পান্নার প্রেমে পড়েছে। বুঝতে পেরে তার ভারী হিংসে হল পান্নার ওপর। হওয়ারই কথা। পান্নারা একে বড়লোক, তার ওপর সুন্দরী, তার ওপর গান জানে, তারও ওপর ওরা একটু অন্য জগতের মানুষ। অনেকটা পরি-টরির মতো। সবাই ওদের সঙ্গেই ভাব করতে চায়, প্রেম করতে চায়, বিয়ে করতে চায়। যদি তাই হয়, তাহলে পৃথিবীতে হিমিদের কী হবে? সুমন পান্নার সঙ্গে ভাব করার জন্য বসে আছে। আর হিমি যে রোজ তার সঙ্গে ভাব করতে আসে সেটা বুঝি কিছুই নয়?
চোখ ফেটে জল আসতে চাইছিল হিমির।
বিকেলেই সে পান্নাকে গিয়ে বলল, জানো তো পান্নাদি, রসিক বাঙালের আগের পক্ষের ছেলেটা ভীষণ অসভ্য।
কেন রে, কী করেছে?
