লাবড়ায় বড়ি পড়েছে নাকি হে বাঙাল?
তবে? বড়ি না দিলে জমবো কেমনে?
.
৬৭.
হুট বলতেই রাজ্যের ইষ্টিগুষ্টি খাওয়ানোর ধুম পড়ে যায়, কী কাণ্ড বাবা! শুনেছিস কখনও পঞ্চামৃত না কোন গুষ্টির পিণ্ডি বলেও আবার কাণ্ড আছে! যত বাঙাল দেশের নিয়মকানুন বাবা, সাতজন্মে শুনিনি। তা সে না হয় হল। কিন্তু এই রাজ্যের বউ ঝি, ভিখিরি কাঙালিদের গাভেপিণ্ডে গেলানোর মতো কী মচ্ছব পড়ল বল তো!
হিমি পালানোর ফাঁক পাচ্ছে না। বাইরে কত কী হয়ে যাচ্ছে। উলু শোনা যাচ্ছে, শাঁখ বাজছে, আরও সব কী কী হয়ে যাচ্ছে, কে জানে। সে অত শত না জেনে একটা পিড়ি খুঁজতে এ-ঘরে ঢুকে পড়েছিল। কদিন হল ছেলে আর বউদের তাড়া খেয়ে বুড়িটা এবাড়িতে এসে জুটেছে। উত্তরের দালানে মরণের পড়ার ঘরের পাশে এই একটেরে ঘরখানায় রাজ্যের জিনিসপত্র ঠাসা থাকে। হেন জিনিষ নেই পাবে না। কোদাল, কুড়ুল, দা, দড়িদড়া, উঁই করা মাদুরি, পিড়ি, তক্তা থেকে যা চাও। ছুঁচো, ইঁদুর, আরশোলা আর মাকড়সার আঁতুড়ঘর। এ-ঘরেই মরণদের দুটো বেড়াল বছর বছর বাচ্চা বিয়োয়। এই গুদোমের মধ্যেই কবেকার একটা তক্তপোশ পড়ে ছিল। সেটাই এখন বুড়ির ঠেক। পিড়ি খুঁজতে এসে ঘরে ঢুকতেই বুড়ি খপ করে ধরে বসিয়েছে। আর ছাড়া পাচ্ছে না হিমি। সে বলল, তা কেন দিদিমা, পঞ্চামৃত এদেশেও হয়। এই তো সুবলদের বাড়িতেও হল সেদিন, ওর কাকীমার পঞ্চামৃত। এত ঘটা হয়নি অবশ্য।
ওরে সেই কথাই তো বলছি। কত টাকা গচ্চা গেল জানিস? বলি নতুন তো মা হচ্ছে না। আরও তিনবার তো বিইয়েছে। নতুন পোয়াতি হলেও না হয় কথা ছিল।
এখন ছাড়ো তো দিদিমা, মনা জেঠিমা কাজে পাঠিয়েছে।
আহা, বোস না একটু। কাজের বাড়ি সে না হয় বুঝলুম, কিন্তু সকাল থেকে একটা কাজেও ডেকেছে কেউ আমায়? আমার পেটের শব্দুরটা অবধি নয়। এত আস্পদ্দা কি ভাল বল? এই জন্যই মেয়ে জামাইয়ের কাছে থাকতে নেই।
তাহলে কি ও বাড়ি যাবে?
কী বলব ভাই, এ বাড়িতে আজ মচ্ছব, তা ভাই দুটোকেও তো একটু ডাকতে পারত! বড্ড গুমোর হয়েছে মেয়েটার। জামাইয়ের কথা বলছি না, সে হল মগ দেশের লোক। ওরা অদ্রতা-ভদ্রতা জানে না, শেখেওনি। বনজঙ্গলের লোক তো, জাতজন্মেরও ঠিক নেই। কিন্তু মেয়েটা তো মানুষের মতো হবে। জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে সেও এমন গোল্লায় যাবে কে জানত বল!
কেন দিদিমা, বাঙাল মেসো তো খুব ভাল। সবাই বলে অমন দরাজ বুকের লোক হয় না। কত লোককে খাওয়ায়, আপদেবিপদে দেখে।
ওটা তো ভড়ং। লোককে ভুলিয়ে ভালিয়ে মন্তর করে ফেলে, তারপর রক্ত শুষে খায়। তা এত লোকের জন্য করে, নিজের শালা দুটোর জন্য করেছে কিছু আজ অবধি? দুটো জোয়ান ছেলে হাত পা গুটিয়ে বসে আছে, ঘরে হাঁড়ির হাল, আর এ বাড়িতে নিত্যি ভূতভুজ্যি হচ্ছে। এত অবিচার কি ভগবান সইবে রে?
ও দিদিমা, বলাই মামাকে তো কালও দেখলুম কাটাপুকুরের ধারে মাতাল হয়ে পড়ে আছে সকালবেলা।
তা কী করবে বল! মনের দুঃখেই খায়। ছেলে তো খারাপ ছিল না। অভাবে স্বভাব নষ্ট।
তোমাকে নাকি তাড়িয়ে দিয়েছে?
বউ দুটো তো দুটো ডাইনি। ছেলেদের দুষলে তো হবে না। তারা সাতেপাঁচে থাকে না। খোঁড়ে তো ওই দুটো পাজি মাগী। কোন আঘাটা থেকে ধরে এনেছে কে জানে বাবা। মুখ নয় তো আস্তাকুঁড়।
এখন আমি যাই দিদিমা? দেরি হলে জেঠিমা বকবে। পিড়ি দিয়ে যেন কী কাজ আছে।
আর একটু বসে যা। কী হালে রেখেছে আমাকে দেখছিস তো। এই ঘরে মানুষ থাকতে পারে বল দেখি! আমাকে ওদের ঘরদোরে অবধি ঢুকতে দেয় না। কেন রে বাপু, আমি কি সোনা-দানা চুরি করব? বাড়ির ঝি মুক্তা অবধি কী মুখনাড়া দেয় না শুনলে বিশ্বাস করবি না। পাঁচজনকে যদি ডেকে বলি তাহলে ওদের মুখে থুথু দেবে না লোকে?
হিমি করুণ গলায় বলল, এসব কথা আমায় বলছ কেন দিদিমা? আমি কি এত সব জানি? তুমি বাড়ি ফিরে যাও না কেন?
তাই যাবো বাছা। ভাঙা ঘরদোর হোক, সংসারে অশান্তি থাক, তবু সে আমার জোরের জায়গা। এখানে অপমানের ভাত কে খায় বল!
তাই যাও না কেন? এবার আমার হাতটা ছাড়ো, বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আ মোলো, অত ছটফট করছিস কেন? বলি, যা বুঝলি তা পাঁচজনকে গিয়ে বলিস। সবাই এসে আমার হেনেস্তাটা দেখে যাক। বেড়ালের মুতের গন্ধে নাক জ্বলে যায়। তার ওপর পোকামাকড়। কী জ্বালায় যে জ্বলছি।
বলবখন সবাইকে। বলে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল হিমি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
বুড়িটাকে তার মোটে ভাল লোক বলে মনে হয় না। মরণের সুন্দর দাদাটা যখন ছিল তখন হিমিকে ওই বুড়িই তুতিয়ে-পাতিয়ে ওর ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল একদিন দুপুরবেলা। বলেছিল, যা না, ওরা শহুরে ছেলে, ওদের কাছে বসলেও কত শিক্ষে হয়।
তা হিমিরও একটু দুর্বলতা ছিল। সুমন একে দেখতে সুন্দর, তার ওপর কী ভাল যে গান গায়। বুড়িটা রোজই তাকে উসকে দিত। গুরুজন মানুষ, খারাপ কথা তো আর বলবে না, এই বিশ্বাসে গিয়েছিল হিমি। বাড়িতে কেউ ছিল না সেদিন। সুমন খারাপ ছেলে হলে সেদিন তার সর্বনাশ হয়ে যেতে পারত। হয়নি। সুমন তাকে মোটেই পছন্দ করেনি তা ওর চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল হিমি।
কিন্তু পরে বুড়ি তাকে অনেক জেরা করেছিল। ভারী অসভ্য সব ইঙ্গিত, হ্যাঁ রে, ও ঘরে যে গেলি, গায়ে হাত-টাত দেয়নি তো।
