তোমাকেও বলি দাদা, ওই জরাজীর্ণ শরীর, হেঁপো রুগি হয়ে অমন ডবকা মেয়েছেলেকে বিয়ে করা তোমার ঠিক হয়নি। মেয়েমানুষ তো আর ঝাপির সাপ নয় যে বন্ধ করে রাখবে।
আমি তোর গুরুর সমান। আমার বউ তোর মায়ের মতো। ঠিক কিনা!
ওসব সেকেলে সম্পর্কের কথা ছাড়ো। ওসব কি আর কেউ মানে! আর গুরু বললেই তো হবে না। হাতের কাজ শিখতে তোমার কাছে ঘুরঘুর করতুম। চাকরের অধিক খাটিয়ে মারতে, মনে আছে?
তোর যদি লজ্জা থাকত তাহলে গলায় দড়ি দিতি।
মরতে বলছ! তা বেঁচেই বা আছি কোথায়? গলায় ফাঁস দিলে তো অনেক জ্বালা জুড়িয়ে যেত গো! বেঁচে থাকার মানে কী বলো তোশুধু দেহখানার বেঁচে থাকাটাই কি সব? বেঁচে থাকার মানে হল উপভোগ। দিনরাত কেঁদে ককিয়ে, উঞ্ছবৃত্তি করে, লাথিটা খেয়ে এই যে থাকা, এ বেঁচে থাকা হয় কী করে? মরেই আছি বলে ধরে নাও না কেন!
বিড়বিড় করতে করতে জায়গাটা পেরিয়ে এল ধীরেন। সামনে পান্নাদের বাড়ির আলো দেখা যাচ্ছে। আর একটু এগোলে গৌরদাদার বাড়ি। চেনা ছক, চেনা রাস্তা। তবু ভারী অচিন লাগে ধীরেনের। একটা স্পষ্ট চোখ, আর একটা আবছা চোখে কত বিভ্রম তৈরি হয়। পাপে জর্জরিত মন কত ভূতপ্রেত সৃষ্টি করে যায়। অনাবিল সত্য বলে তো কিছু নেই।
.
তিন দিন বাদে এক দুপুরে কাঙালি ভোজন করাচ্ছিল রসিক বাঙাল। বাসন্তীর পঞ্চামৃত আছে আজ। উপলক্ষ্য সেটাই৷ মহাবীর তেওয়ারিকে বর্ধমান থেকে ভাড়া করে এনেছে রসিক। খিচুড়ি, লাবড়ার তরকারি, বোঁদে আর পায়েস। ভোজের খবর পেয়ে লোক জুটেছে মেলাই। হিসেব করলে শ দুই তো হবেই। উঠোনের রোদে সারি সারি শালপাতার থালা নিয়ে বসে গেছে। চিল্লামিল্লি হচ্ছে খুব। এখনও পাতে খিচুড়ি পড়েনি, পড়বে পড়বে ভাব।
বারান্দায় দুখানা চেয়ারে বাঙালের পাশাপাশি ধীরেন।
রসিক বলল, ঠাইরেন আইজকাইল এই বাড়িতেই বহাল হইছে, বুঝলেননি খুড়া?
ধীরেন জানে, এ গাঁয়ে কোনও গাছের পাতা খসলেও তা রটে যেতে দেরি হয় না। নিষ্কর্মার তো অভাব নেই।
একটু হেসে ধীরেন বলল, ভালই তো। বাসন্তীর দেখাশোনা হবে।
কচু হইব। ঠাইরেনরে তো বিলাই পার করছে। আইয়া অখন খাদিমা হইয়া তো বইছে আর গজরাইতাছে।
গজরাচ্ছে কেন?
গজরাইব না! এই যে খরচাপাতি হইতাছে, অপোগণ্ডোরা আমার পয়সায় খাইয়া যাইতাছে, ঠাইরেনের তাতে গায়ে বড় জ্বালা। বোঝালেন? ঠাইরেন চায় সব পোটলা কইরা রাখতে। এই যে গরিবগুলা প্যাট ভইরা খাইব, কালা কালা শুকনা মুখগুলায় একটু ঝিলিক দেখা যাইব ঠাইরেনের বড় অপছন্দ।
খিচুড়ির গন্ধটা ছেড়েছে খুবই ভাল। বাতাস শুঁকেই ধীরেন বলে দিতে পারে খিচুড়িতে ভালরকম গাওয়া ঘি, ফুলকপি, মায় গরমমশলা অবধি পড়েছে। কাঙালিভোজনের খিচুড়িতে এত তরিবত থাকার কথা নয়। তবে বাঙালের ব্যাপারই আলাদা। সে যা করে মোক্ষম করে। গরিব বলে যারা খেতে এসেছে তারা যে সবাই একেবারে কাঙাল-ফকির তা নয়। বাদামগাছের নীচে একটু ছায়ায় ময়লা হলদে রঙের শাড়িতে ঘোমটা টেনে যে বউটা বসে আছে সে কার্তিকের বউ। বছরটাক আগেও তাদের অবস্থা খারাপ ছিল না। কার্তিক শয্যাশায়ী হল ওই স্ট্রোকে না কী যেন বলে তাইতে। অবস্থা একেবারে তরতর করে পড়তে লাগল। এখন হাঁড়ির হাল। দুটো বাচ্চা নিয়ে লজ্জার মাথা খেয়ে ওই এসে বসেছে গাছতলায়। ঘোমটায় কি আর সব ঢাকা যায়? শীতল ভট্টাচার্য যেমন, তারও কি কাঙালিভোজনে আসবার কথা! বছর ত্রিশেক আগে এই শীতল ভট্টচার্যই তো নেমন্তন্ন বাড়িতে গিয়ে ছাঁদা নিয়ে কত তড়পেছে। এখন ছেলের বউরা নোড়া দিয়ে বিষদাত ভেঙেছে ভালরকম। বামনাই এখন খিদের আগুনে ঝলসে গেছে। ওই সেও এসে একটু ফঁক রেখে বসে গেছে পঙক্তিভোজনে। দেখলে কষ্টও হয়, ঘেন্নাও হয়।
ধীরেন বলল, বাঙাল, ওই বাদামতলার বউটা আর শীতল ভট্টচার্য ওদের একটু ভাল করে দিতে বলে দিও। অবস্থা বিপাকে এই দশা বইতো নয়।
নিশ্চিন্ত থাকেন খুড়া, আমার বাড়িতে কারও আধাপেটা হইবো না। ঠাইস্যা খাইব সকলে। যা আয়োজন আমারই বসে যেতে ইচ্ছে করছে।
রসিক বাঙাল দুঃখ করে বলল, আরও কিছু করার ইচ্ছা আছিল, বুঝলেন! ভাবছিলাম খাসির মাংস খাওয়ামু। কিন্তু ঠাইরেনের যা চক্ষুটাটানি তাতে আর আউগাইলাম না। বাসন্তী কইল, বেশি আয়োজন কইরো না, মায়ের অভিসম্পাত লাগব। এমনিতেই নাকি জ্বইলা পুইড়া মরতাছে।
ও মানুষ এরকম ছিল না হে বাঙাল। বড় রসের মানুষ ছিল। একসময়ে ওবাড়িতে কত গুলতানি করেছি। বাসন্তীর বাবা ছিল বৈঠকী মানুষ, দরাজ দিল। বউঠানও ছিল ভারী মিঠে স্বভাবের। পয়সার অভাবই মানুষকে বড্ড শুষে নেয়, বুঝেছ?
মানতে পারলাম না খুড়া। লোকে কয় বটে অভাবে স্বভাব নষ্ট, কিন্তু আমি কই নষ্টের বীজ ভিতরে না থাকলে অভাব তারে টলাইতে পারে না।
খিচুড়ির কড়াই চলে এল। একটা জয়ধ্বনির মতো কোলাহল উঠল চারধারে। খিদের মুখে খাবারের চেয়ে মোক্ষম জিনিস আর কীই বা হতে পারে? পাতে ঘপাত ঘপাত খিচুড়ি পড়ছে, খিচুড়ির পাশেই বড় হাতায় এক খাবলা লাবড়া। দেওয়ার হাতটা লক্ষ করল ধীরেন। নাঃ, বড় মাপেই দিচ্ছে। বাচ্চাগুলো কি খেতে পারবে অত? নষ্ট হবে পাতে।
মোহময় গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। মহাবীরের রান্না এ-তল্লাটে বিখ্যাত। পাঁচ-সাতশো টাকার নীচে কাজ করে না। লাবড়ার গন্ধটাও এবার পাচ্ছে ধীরেন। মনে হচ্ছে ডালের বড়ি আর ধনেপাতাও দেওয়া হয়েছে।
