ওই জন্যই তো ভগবানে বিশ্বাস হতে চায় না। ভগবান বলে কিছু থাকলে কি এরকম ধারা হতে পারত, বলুন?
আজ তোকে ফিলজফিতে পেয়েছে দেখছি। কফি খাবি?
এক গাল হাসল ধীরেন কাষ্ঠ। খুশিয়াল গলায় বলল, এই একটা জব্বর কথা বলেছেন। জিনিসখানাও একেবারে মনের মতো। আগেও দু-চারবার খেয়েছি বটে, কেমন পোড়া-পোড়া গন্ধ লাগত। আপনার এখানে খেয়েই প্রথম বুঝলাম, এর সঙ্গে কেউ লাগে না।
আমারও বুড়ো বয়সের নেশা। এই শীতে শরীরটা বেশ গরম হয়।
মহিম কফি করে নিয়ে এল।
বিস্কুট খাবি সঙ্গে? দাঁড়া, দিই।
তা বিস্কুটও হল। দিব্যি মুড়মুড়ে ফুরফুরে দুখানা বিস্কুট।
এই বিস্কুটও নাতনি কলকাতা থেকে এনে দিয়েছে। ওতে নাকি চিজ আছে। তা সে বস্তু বিশেষ চেখে দেখা হয়নি। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাচ্ছি।
চিজের কথা খুব জানি। শুনেছি, দুধ পচিয়ে নাকি হয়। আজকাল বাঙালিরাও খুব খাচ্ছে। বাসস্ট্যান্ডের মহেশ বলছিল দোকানে নাকি পিজ্জা বানাবে। তাতে মেলা চিজ দিতে হয়।
গাঁ তো শহর হয়ে উঠল রে।
তা তো হওয়ারই কথা।
পিজ্জা খাবি নাকি? সোহাগ বলে গেছে আসছে শনিবার সব নিয়ে এসে এখানে বানিয়ে আমাকে খাওয়াবে। রোববার চলে আসিস এক ফাঁকে। তোর জন্য খানিকটা রেখে দেবোখন। নতুন খাবার, সহ্য হবে কিনা জানি না। চেখে দেখিস একটু।
আমার তো সবই ভাল লাগে। আমার বউ বলে, তোমার জিব হল লম্পট।
তা তোর একটু নোলা আছে বটে। এই সেদিন দেখলাম, হরিপদর মেয়ের বিয়েতে চারখানা রাধাবল্লভি বসান দিলি, তারপর এক কাড়ি পোলোয়া, খাসির মাংস, সাত টুকরো মাছ, দই-মিষ্টি, ওরে বাবা, এই বয়সে অত খেতে আছে গবগব করে? এখন একটু বেছে গুছে বুঝে খাবি তো!
তাই বলে বটে সবাই। কিন্তু আমার তো সবই তল হয়ে যায়। খেয়েই যদি মরি তাহলেই বা কী বলুন। স্ট্রোক হয়ে মরলেও যা পেট ফেটে মরলেও তাই। চৌকাঠ ডিঙোনো নিয়ে কথা, তা খেয়েই মরা ভাল।
মরার জন্য বড় ব্যস্ত দেখছি যে আজকাল। বলি তোর হলটা কী? এতকাল তো এসব বলতিস না।
আজকাল মরা নিয়ে একটু ভাবছি। মরতে যে ইচ্ছে যায় তা নয়। কত কী দেখার রয়ে গেল, বোঝার রয়ে গেল, আয়ুর অর্থটাই ঠাহর হল না, মনে একটা খিচ তো আছেই। তবে লজ্জার মাথা খেয়ে আর কতকালই বা বাঁচব বলুন। এই তো সেদিন ছোট নাতিটাও বলছিল, ও দাদু, বিশুর দাদু মরে গেল তো, তুমি মরছ না কেন?
বলল?
তা বলবে নাই বা কেন। ঠাকুমার কাছে শুনে শুনেই শিখেছে।
নাতি বলল বলেই মরার কথা ভাবছিস?
না দাদা, তা নয়। ওই ভাবছি আর কী। কত কী ভাবি।
তোর চেয়ে আমিই তো বোধহয় বছর তিনেকের বড়।
তা হবে।
কফি শেষ করে উঠে পড়ল ধীরেন কাষ্ঠ। ফেরার সময় টের পেল, রাত হয়েছে। আন্দাজ নটা সোয়া নটা হবে। একে গাঁ, তায় শীতকাল। সন্ধ্যারাতেই ভারী নিঃঝুম হয়ে যায় চারদিক। রাস্তায় ভুতুড়ে কুয়াশা আর নির্জনতা। তবু বাসস্ট্যান্ডের দিকটায় এখনও লোকজন দেখা যায়, দোকানপাটও খোলা থাকে। কিন্তু গাঁয়ের ভিতরটা বড্ড সুনসান।
একটা ভাল চোখ আর একটা আবছা চোখে ঝুঝকো অন্ধকারে কুয়াশামাখা এক অলৌকিককে প্রত্যক্ষ করে ধীরেন। দিনের বেলাটা যেমন দগদগে বাস্তবতা এখন সেটাই যেন সাঁঝের পর সেজেগুজে মোহিনীবেশে চোখ ভোলাতে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। কুয়াশায় একটা বাড়ির ছাদটুকু শুধু ভেসে আছে, বাকিটা লোপাট, মনে হচ্ছে যেন, ভেসে থাকা বাড়ি। কালিপড়া লণ্ঠনের মতো ভাঙা একটু চাঁদ আছে আকাশে, তাকে ঠিক ঠাহর হচ্ছে না বটে, কিন্তু এই আলোটুকুই কুহক ছড়িয়ে রেখেছে চারধারে।
ধীরেন হ-হ-হ করে আপনমনে একটু হাসল। বিড়বিড় করে বলল, খুব ম্যাজিক দেখাচ্ছ বাবা! অশৈলী কাণ্ড সব।
কথাটা ঠিক যে, আজকাল সে মরা নিয়ে ভাবছে। মরার পর আত্মা বেরিয়ে আর এক দফা বেঁচে থাকে বলে কারও কারও বিশ্বাস। যদি মরার পর ফের বেঁচে থাকাই বরাতে থাকে তাহলে সেটাই বা কেমন হবে! দেহ মরলে একরকম শান্তি। কিন্তু ফের যদি আত্মা হয়ে বেঁচে থাকতে হয় তাহলে তো আবার ভজঘট্ট পাকাল। তখন আবার কেমন সব বিলিব্যবস্থা হবে, তাও ভাববার কথা। ধীরেনের সেটা খুব পছন্দ হচ্ছে না। সর্বক্ষণ সঙ্গে সঙ্গে লেগে থাকলে তো মুশকিল।
ভাবতে ভাবতে বটতলায় এসে পড়ল ধীরেন। এ ভারী অপয়া জায়গা। খুব নির্জন। বটগাছটা বোধহয় দেড়শো বছরের পুরনো। চারদিকে ঝুরি নেমেছে মেলা। তলাটা বাঁধানো, শিবের থানও আছে। কিন্তু বড় ছমছমে জায়গা। অনেকেই এখানে ভয়টয় পায়।
চারপাশটা তাকিয়ে দেখল ধীরেন। জায়গাটা যেন একেবারে জমাট বেঁধে নিথর হয়ে আছে। গাছের পাতাটাও নড়ছে না। আর কী ঝিঁঝির ডাক বাবা।
ধীরেন! বলে কেউ ডাকল নাকি? গা শিউরে উঠল হঠাৎ। হ্যাঁ, মিদ্দার ডাকে বটে। কাছাকাছি চলেও আসে। না, ভূত-টুত নয়। ধীরেন কাষ্ঠ জানে, এ হল তার নিজেরই ভিতরকার অনুতাপ। সে-ই মিদ্দার হয়ে কথা কয়। তবু গা ছমছম করে খুব।
ও ধীরেন, মনে পড়ে?
পড়বে না! খুব মনে পড়ে।
বিশ্বাসঘাতক, নিমকহারাম, কত বড় সর্বনাশ করেছিলি আমার! তবু দিব্যি বেঁচেবর্তে আছিস!
আমার দোষটা কোথায় বল। তোমার বউ যদি ওরকমধারা করে আমার কী দোষ? আমার তখন কঁচা বয়স, বুদ্ধি পাকেনি, সেও এসে হামলে পড়ল। আমার কী করা উচিত ছিল বলো!
সাধু সাজছিস হারামজাদা!
