মহিম রায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ভাগ্যবান লোক, বুঝলি? অমন মরা মরতে পারলে আর চাই কী?
তা যা বলেছেন। তবে কিনা সাহেব পেটানোয় কত দূর পুণ্যি হয় তা আমি জানি না, কিন্তু সেটা বাদ দিলে যোগেন রায়ের আর পুণ্যিটা কোথায় বলুন তো! চেহারাখানা ছিল বটে দেখনসই, লোকে বলত শিবশূলের নেতাজি। কিন্তু কোনও দেখনসই মেয়ে চোখে পড়লে পার পেত না। বউ হোক ঝি হোক যোগেন রায়ের এঁটো হয়নি এমন মেয়ে পাবেন না। তার ওপর বন্ধকী কারবার ছিল। লোকে বলে বন্ধকী কারবার করলে নরকের পথে আর খানাখন্দও থাকে না। তা এত সব করেও অমন ইচ্ছামৃত্যুর মতো ব্যাপার হয় কী করে? প্রাণটা যেন গুতুলের মতো বেরিয়ে গেল। তাই বলছিলুম, ওসব কর্মফল টল সব বাজে কথা, পাপপুণ্যির ব্যাপার-ট্যাপারগুলোতেও গোলমাল আছে, আর ভগবান বলেও কিছু তো ঠাহর হচ্ছে না। কী বলেন?
মহিম একটু হেসে বলল, তা ওরকম হিসেব করলে তাই দাঁড়ায় বটে। কিন্তু তুই কি শেষে বুড়ো বয়সে নাস্তিক হলি?
আস্তিকই বা কবে ছিলুম বলুন! সাধনভজন তো আর করিনি কিছু। ওই বাড়িতে ষষ্ঠী বা বারের পুজো হলে বউ নড়া ধরে টেনে নিয়ে গিয়ে গড় করায়। তা সেও বলে, তুমি হলে পাষণ্ড, মুষল। পচেগলে মরবে। ঠাকুর-দেবতায় যার অত অচ্ছেদ্দা তার রাক্ষসের ঔরসে জন্ম।
এসব বলে?
খুব বলে। জিবে তার ভীষণ ধার। তবে মিছে কথাও তো বলছে না। বিচার করে দেখেছি, ঠাকুর দেবতা মানামানির ইচ্ছেটাই হয়নি কখনও আমার। ভাবি যা সব অকাজকুকাজ করেছি তার জন্য নাকিকান্না কেঁদে লাভ নেই। ভগবান বলে যদি কেউ থেকেও থাকেন তিনি নাকিকান্নায় ভোলার লোক নন।
অনেক এগিয়ে বুঝেছিস রে ধীরেন।
না দাদা, বুঝেছি বলা যায় না। বুঝতে হলে পেটে বিদ্যে চাই। তা সে বস্তু তো আর নেই। আমার বুঝ হল চাষাভুষোর মতো।
দুর বোকা! চাষাভুষোরা নাস্তিক হয়, দেখেছিস? ভয়ভীতি নিয়ে যাদের বেঁচে থাকতে হয় তাদের মধ্যে নাস্তিক খুঁজে পাওয়া ভার। যে যেমন জীবন যাপন করে তার ভগবানের বোধ তেমনতর। এই তো শুনলাম, সেদিন কে যেন বলছিল, কোরিয়া না কোথায় যেন লোকে ভগবানের ভাবটাই লোপাট করে দিয়েছে। মঠ মসজিদ গির্জার বালাই নেই, থাকলেও সেখানে কেউ তেমন যায় না। তারা খাটেপেটে, দেশ গড়ে, ভাল-মন্দ নিয়ে বেঁচে থাকে, খামোখা ভগবান আমদানি করে জীবনে জটিলতা বাড়ায় না, ও তাদের দরকারও হয় না। ভগবান ছাড়াই যখন চলে যাচ্ছে তখন খামোখা ডাকবে কেন বল!
আমারও তো সেই কথা। ডেকে হবেটা কী? আমার উদ্ধার নেই তা আমি জানি। মিদ্দারের পো এখনও আড়ে আড়ে ঘুরে বেড়ায়, ঘাড় মটকায় না বটে, কিন্তু ভুলতেও দেয় না।
ভগবান মানিস না, ভাল কথা। তবে ভূতই বা মানবি কেন রে?
ভূতের কথা বললুম নাকি? না দাদা, সে ভূত নয়।
তবে কী? এই যে বললি মিদ্দারের পো আড়ে আড়ে ঘুরে বেড়ায়।
তা ঘোরে। তবে সে ভূত নয়। মানুষ মরলেও তার ব্যথা বেদনা জ্বালা কি আর সহজে মরে! সেগুলোই যেন ঘুরে ঘুরে খুঁজে বেড়ায়।
তোর মাথা। কবে কী একটা ঘটনা ঘটেছিল তাই নিয়ে ঘষটে মরছিস। মানুষ কত কী ভুলে থাকে।
নিষ্কর্মারা ভুলতে পারে না। কাজকর্ম নিয়ে মেতে থাকলে হয়তো হত। ভেবে দেখতে গেলে মিদ্দারের পো কিন্তু খারাপ মরেনি। হেঁপো রুগি, শরীরে তো কিছু ছিল না। শুধু রোখের বশে বউটাকে তারের ফাঁস দিয়ে মেরেছিল। ওই রোখের জোরেই আমাকেও পেড়ে ফেলেছিল প্রায়। আমি তখন সা জোয়ান। শেষরক্ষা হয়নি অবশ্য। জলে চেপে ধরেছিলাম, মিনিটখানেক ভুড়ভুড়ি কেটে মরে গেল। এই দেখুন, এখনও রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায় ভাবলে।
তোর শ্রীমন্তকে মনে আছে?
তা থাকবে না? দিনেদুপুরে পাঁচকড়িকে রামদা দিয়ে কাটল বটতলায়, এক হাট লোকের সামনে। সে কী হুড়োহুড়ি করে লোকে পালিয়েছিল বাপ।
তুই তো একটা দেখিছিস। শ্ৰীমন্ত কত খুন করেছিল তার হিসেব নিজেও রাখত না। বুড়ো হয়ে যখন বয়সের কাছে জব্দ হল তখন মাঝে মাঝে খাল পেরিয়ে ওর ঘরে গিয়ে বসতাম। খুব খাতির করত। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করতাম, খুন করতে কেমন লাগে? কী বলত জানিস?
কী বলত?
বলত, কেমন যেন একটা ঝাঁকুনি লাগে। কেমনতরো ঝাঁকুনি, কীসের ঝাঁকুনি তা অত ব্যাখ্যা করে বলতে পারত না। আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করতাম, খুনের পর অনুতাপ হয় কিনা। কেমন ভ্যাবলার মতো চেয়ে থাকত। অনেক ভেবেচিন্তে বলত, না, তবে পরে কেমন কঁকা ফাঁকা লাগে। মায়াদয়া তো ছিল না। বুকখানা পাথর হয়ে গিয়েছিল। ওই যে ফাঁকা ফাঁকা লাগত ওইটেই ওর অনুতাপ বলে ধরে নিতে হবে। তা অত খুন করেও তো বুড়ো বয়স অবধি বেশ বেঁচেবর্তেই ছিল। ডাকাতির পয়সা দিয়ে পাকা বাড়ি, ধানী জমি সবই করেছিল। কিছু তো আটকায়নি। তুই তবে দগ্ধে মরছিস কেন? ওটা মোটে খুনই নয়। প্রাণ বাঁচাতে যা করিছিস তাতে আইনেও তো আটকায় না।
আইনে তো অনেক কথাই আছে দাদা। তা দিয়ে কি আর মনের আগুন নেভে? আজকাল কেবল ভাবি, বরং নিজে মরলেই ভাল হত। এই এতদিন বেঁচে থেকে দুনিয়ার কী উপকারটা করলুম বলুন। আর বেঁচে থাকাটাও কি মানুষের মতো হচ্ছে? গোরুছাগলের অধিক নিজেকে ভাবতেই পারি না। বড় গ্লানি হয়।
তা আর কী করবি! লাখো লাখো লোক তো ওরকমভাবেই বেঁচে আছে। কটা লোক আর মানুষের মতো বেঁচে আছে বল।
