পান্না চোরচোখে একবার খুঁজে দেখল, বিজুদা কোথায় দাঁড়িয়ে। বেশি খুঁজতে হল না। দেখা গেল, গোল চক্করটার একটু বাইরে বিজুদা বসে আছে, মুখে স্মিত হাসি।
কেটারারের লোকেরাও গানের আসরে চলে আসায় মধ্যাহ্নের ভোজ স্থগিত রইল। প্রায় ঘণ্টাদুয়েক চলল গানের আসর।
খাওয়ার পর ঘণ্টাখানেক অন্তাক্ষরী হল। রোদ মরে আসছিল ক্রমে। ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল খুব।
ফেরার সময় পান্না চাপা গলায় বলল, ইস তুমি কী ভাল গাও!
দুর! ওটা শিক্ষিত গলার গান নয়। তবে এসব অকেশনে কাজে লাগে।
আমি গলা চিনি সোহাগ। তোমার গলায় ভীষণ সুর আছে।
আমি কিন্তু গান-টান শিখিনি। স্কুলে-টুলে যা শিখিয়েছে তাই।
তা হলে এখন শেখো। প্র্যাকটিস করলে দারুণ হবে।
কী হবে শিখে? গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড পাব, না কি গানকে কেরিয়ার করব বল তো! আমার ওরকম হতে ভাল লাগে না। গান গাইতে হলে মনের আনন্দে গাওয়াই ভাল। ব্যায়াম বা শরীরচর্চার মতো রেগুলার গলা সাধা ওসব আমার একটুও ভাল লাগে না।
তোমাকে নিয়ে আর পারি না। কী যে তোমার ভাল লাগে!
সোহাগ হাসল, তোমার বন্ধুরা আর আমাকে অপছন্দ করছে না তো!
না না, তারা তো তোমার ফ্যান হয়ে গেছে।
আচ্ছা, আমরা সকলের সঙ্গে বাসে না ফিরে একটা মারুতি গাড়িতে ফিরছি কেন বলো তো পান্না। এটা খারাপ দেখাচ্ছে না?
কী জানি। শুনছি তো এ-গাড়িটা বিজুদা কিনবে। তার কোন মক্কেলের গাড়ি। ট্রায়াল দিচ্ছে। বোধহয় তোমাকে ইমপ্রেস করার জন্যই এই অ্যারেঞ্জমেন্ট। কিন্তু তুমি তো ইমপ্রেসড হচ্ছ না।
না। মানুষটার বদলে গাড়ি কি বেশি ইমপ্রেস করতে পারে? বরং ব্যাপারটা খারাপ দেখাল। কেউ হয়তো কিছু ভাববে।
তা ভাবুক না। মানুষের স্বভাবই হল নিজেদের ইচ্ছেমতো কিছু একটা ভেবে নেওয়া।
তোমার বিজুদা কিন্তু এ-গাড়িতে ওঠেনি।
উঠলে খুশি হতে?
দুঃখিতও হতাম না। হি ইজ এ গুড কম্পানি।
সেটা আরও খারাপ দেখাত। সবাইকে ছেড়ে উনি কি আলাদা গাড়িতে ফিরতে পারেন? আফটার অল বিজুদাই তো আজকের হোস্ট।
গাড়ি তাকে বাড়ির দোরগোড়া অবধি পৌঁছে দিয়ে গেল।
সোহাগ ঘরে ফিরে আগে দাদুর ঘরে উঁকি দিল।
কফি খেয়েছ দাদু?
এই খেলাম। কেমন হল তোর পিকনিক?
যে রকম হয়।
যা ঘরে গিয়ে বিশ্রাম কর। সারাদিন ধকল গেছে।
না, সারাদিনের ধকল কিছু টের পাচ্ছে না সোহাগ। তার বেশ ভাল লাগছে। বেশ ভাল।
আজকাল মা বাবা একসঙ্গে ও-ঘরে থাকে। নতুন নিয়ম। বুডঢা এবার আসেনি, তার পরীক্ষা। এ ঘরে সোহাগ একা।
ফিরে এসে সোহাগ চুপ করে চেয়ারে কিছুক্ষণ বসে রইল। আলো জ্বালল না। খুব চুপচাপ কিছুক্ষণ বসে সে একটু ধ্যান করল। মেডিটেশন তার প্রিয় এক প্রক্রিয়া। ধ্যানে সে নিজের মনটাকে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে দেখতে চায়। তার মনের মধ্যে আজ অনেক ধাঁধা। অনেক প্রশ্ন।
৬৬-৭০. স্ট্রোক জিনিসটা
৬৬.
আচ্ছা এই স্ট্রোক জিনিসটা ঠিক কেমন হয় বলতে পারেন? লোকের মুখে শুনি কিন্তু ঠিক আন্দাজে আসে না।
হঠাৎ স্ট্রোক নিয়ে ভাবতে লেগেছিস কেন?
না এই কদিন ধরেই ভাবছি। বয়সও তো হচ্ছে। এক সময়ে তো চৌকাঠ ডিঙোতেই হবে। তাই ভাবছিলাম একটু আন্দাজ যদি করা যায়। মরার সময় কীসে মরছি, শরীরে কেমনধারা হচ্ছে সেটা বেশ বুঝতে বুঝতে মরা যাবে।
তোর যেমন বুদ্ধি। মরার সময় কি অত শরীরবোধ, অত টনটনে জ্ঞান থাকবে রে? আর আগাম ভেবেই বা কী হবে? থাকবি তো চিৎপাত হয়ে শুয়ে। যা ইচ্ছে হোক না। আগে থেকে ভেবে মরবি কেন?
তা অবিশ্যি ঠিক। তবে কী জানেন দাদা, মরতে তেমন ভয়-টয় নেই আমার। ভাবি কী জানেন, বাঁচাটার মতো মরাটাও বেশ উপভোগ করারই জিনিস। মনে হয়, শরীরের মধ্যে ঠিক যেন ইস্টিশন, গার্ডবাবু হুইসল দিল, ঝান্ডা নাড়ল, ড্রাইভারসাহেব ভেঁপু বাজাল, তারপর প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে কু ঝিকঝিক করে ট্রেন চলে গেল। ফাঁকা ইস্টিশন এই দেহখানা রইল পড়ে। পুরো ব্যাপারটাই বেশ একটা ঘটনা।
ঘটনা তো বটেই রে, তবে যে মরে সে কি আর অত বুঝতে পারে? গৌরদাকে তো দেখলি, দুদিন তো জ্ঞানই ছিল না।
সেও তো স্ট্রোক!
সেরিব্রাল। যাওয়া নিয়ে কথা, উপলক্ষ যা-ই হোক।
আগে কিন্তু মরাটা ভারী সোজাসরল ছিল। ডাক্তারবদ্যি ছিল না, এত রক্ত পরীক্ষা, ইসিজি, এক্স রে, স্ক্যানেরও বালাই ছিল না। যমে আর মানুষে টানাহ্যাঁচড়া হত কম। কলেরা হল কি সান্নিপাতিক, জ্বরবিকার বা সন্ন্যাস পটাপট মরে যেত লোকে। এমনকী আমাশয়ে ভুগেও কি কম মরেছে? আজকাল কিন্তু ডাক্তারবদ্যি এসে নতুন নতুন ওষুধ দিয়ে মরণটাকে খুব আটকেছে।
হ্যাঁ। আজকাল মরছে কম। তা আজ বেহানবেলাটায় কু-ডাক ডাকছিস কেন?
কী যে বলেন দাদা, কু-ডাক ডাকব কেন? এসব তত জ্ঞানেরই কথা কিনা। আগে থেকে ভেবে রাখা ভাল। দেহখানা যাবে সে তো জানাই আছে। কিন্তু কোন কায়দায় যাবে সেইটেই ভাবি। আপনার কি যোগেন রায়ের কথা মনে আছে? শিবশূলের যোগেন রায়!
তা মনে থাকবে না কেন? সাহেবের সঙ্গে মারপিট করে জেল খেটেছিল বলে তাকে নিয়ে বর্ধমানে সভা হয়।
হ্যাঁ সে-ই। সুভাষ বোস ডেকে পাঠিয়েছিল কলকাতার কংগ্রেস অফিসে। পিঠ চাপড়ে দিয়েছিল। মনে আছে দাদা?
খুব। যোগেন তো মহেন্দ্র জমিদারের বাড়িতে নিয়ম করে ব্রিজ খেলতে আসত। খেলতও ভাল।
হ্যাঁ। তা সেই যোগেন রায় মরল, আমার চোখের সামনে। তখন প্রায়ই গিয়ে বসে থাকতুম তো। আমাদের যৌবনের হিরো বলে কথা। একদিন বিকেলে গিয়ে বসেছি। যোগেন রায় বাগানে ইজিচেয়ার পেতে বসা। ক্ষিতীশ ঘোষ, নবেন্দু চৌধুরী, গণেশ হালদার সব বসে আছে। যোগেন রায় চা খেতে খেতে কী একটা হাসির কথা বলছিল। বলতে বলতে সামনের বেতের টেবিলটায় চায়ের কাপটা রেখে হঠাৎ একটু পিছনে হেলে গেল। মাথাটা চেয়ারের কানায় রেখে ঊর্ধ্বমুখে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। চেয়ে রইল তো চেয়েই রইল। চোখের পাতা আর পড়ে না। ঝাড়া আধঘণ্টা সামনে বসে থেকেও আমরা বুঝতে পারিনি যে মারা গেছে। মুখে তখনও হাসিটা লেগে আছে।
