ওরা বোধহয় আমাকে খুব একটা পছন্দ করে না পান্না।
মিশলেই করবে। না মিশলে নানারকম ভেবে নেয়। ওরা কেউ কিন্তু খারাপ মেয়ে নয়।
মিশলে ওরা আমাকে পছন্দ করবে বলছ?
খুব করবে, ভাব হলে অনেক ভুল ধারণা কেটে যায়।
আসলে আমি ওদের মতো অত হাসতে-টাসতে পারি না তো।
তোমাকে জোর করে হাসতে হবে কেন? চলো তো, আগে থেকেই ওদের নিয়ে অত চিন্তা করার কিছু নেই। গাঁয়ের মেয়ে তো সব, একটু বোকা হয়তো, আমিও তো তাই। আমার সঙ্গে ভাব হল কী করে তোমার?
সোহাগ একটু হাসল, তারপর উঠে পড়ল।
আমি কী ভেবেছিলাম জানো সোহাগ?
কী?
ভেবেছিলাম তুমি হয়তো বিজুদার সঙ্গে একটু কেটে পড়েছ।
বিজুবাবু! তার সঙ্গে কেন?
এমনি ভেবেছিলাম। বিজুদার তো তোমাকে খুব পছন্দ।
তাই বুঝি?
টের পাও না?
না তো!
বিজুদাকে তোমার কেমন লাগে সোহাগ?
বড্ড ভাল।
তার মানে?
গুডবয় বলতে যা বোঝায় তাই।
তার মানেটা কী দাঁড়াল? অপছন্দ?
তাই বললাম বুঝি?
আমি তো হাঁদা নই। মেয়েরা মোটেই গুডবয়দের বিশেষ পছন্দ করে না।
এ মাঃ। পান্না, চটি খুলেছ, কিন্তু মোজা খোলোনি!
পান্না জিভ কেটে দেখল সত্যিই সে মোজা সমেত জলে পা ডুবিয়েছে।
এখন কী হবে?
সোহাগ বলল, কী আর হবে! খুলে রোদে মেলে দাও। সিন্থেটিক মোজা, কয়েক মিনিটে শুকিয়ে যাবে।
জল হিলহিল করছে ঠান্ডা। পা থেকে শরীর বেয়ে উঠে আসছে ওপরে। গোড়ালি ছাড়িয়ে প্রায় হাঁটু অবধি জল, একেবারে মাঝখানটায় খপাৎ গভীরতা।
এ মাঃ! শাড়ি ভিজে গেল!
সোহাগ তার ঘাগরার মত পোশাকের ঘেরাটোপটা অনেকটা ওপরে তুলে নিয়েছে। হেসে বলল, অত ভয় পাচ্ছ কেন, শীতের টান বাতাস আর এত রোদে শুকিয়ে যাবে। শাড়ি পরে এসে ভুল করেছ।
হ্যাঁ, কী যে হল, শাড়ি পরে ফেললাম।
এখন আর কী করবে!
দুজনে ফের বালি জমিতে উঠে চটি পরে নিল। চটির মধ্যে বালি কিরকির করছে।
হ্যাঁ সোহাগ, বললে না তো!
কী বলব?
গুডবয়কে নিয়ে ওই কথাটা।
গুডবয়দের নিয়ে আবার কথা কীসের? গুডবয়রা গুডবয় থেকে যায়।
তার মানে বিজুদাকে তোমার পছন্দ নয়।
আমার মুখে কথা বসাচ্ছ পান্না, বিজুবাবু বেশ লোক।
যাঃ, আমার মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ওমা, কেন?
কত আশা করেছিলাম।
কীসের আশা?
বলতে এখন একটু লজ্জা করছে, আশাটা হয়তো একটু বেশিই করেছিলাম।
আগে আশার কথাটা বলো তো।
আসলে বিজুদা আমাদের কাছে হিরো হলেও তোমার কাছে তো কিছুই নয়। কেরিয়ার বলতে ওকালতি, সেটাও এমন কিছু গ্ল্যামারাস কেরিয়ার নয় আজকাল তার ওপর গাঁয়ে থাকে, শহুরে পালিশ নেই।
কিন্তু বিজুদাকে নিয়ে এত কথা হচ্ছে কেন? প্রবলেমটা কী?
আমি যে ভেবেছিলাম তোমার সঙ্গে বিজুদার প্রেম-ট্রেম কিছু একটা হবে।
সোহাগ হেসে ফেলল, তাই বলো। ছেলেতে মেয়েতে ওই একটা ছাড়া আর বুঝি কিছু হতে নেই?
তুমি যে কেন বিজুদাকে পাত্তা দিলে না, অবশ্য দেবেই বা কেন। তুমি কত বড়লোকের মেয়ে, কত স্মার্ট, কত আধুনিক।
তোমার আজ কী হল বলো তো পান্না! আজ একদম উলটোপালটা কথা বলছ।
না সোহাগ, সত্যিই আমার খুব আশা ছিল। বিজুদার সঙ্গে তোমাকে ভীষণ মানায়।
সোহাগ মৃদু হেসে বলল, পুয়োর গার্ল!
পান্না একটু লজ্জা পেয়ে বলল, কথা উইড্র করছি।
আমি কিছু মনে করিনি পান্না। তোমার বিজুদা অনেস্ট অ্যান্ড গুডম্যান, সেটা কিন্তু তার ডিসক্রেডিট নয়। এ-যুগে ওরকম মানুষের সংখ্যা কমে যাচ্ছে।
এটা প্রশংসা হতে পারে, কমপ্লিমেন্টও হয়তো, কিন্তু বড্ড ক্যারেক্টার সার্টিফিকেটের মতো শোনাচ্ছে যে!
সোহাগ একটা কপট দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, কী করব বলো, আমি যে ঠিক গুছিয়ে কথা বলতে পারি না। পুয়োর ভোকাবুলারি।
ধ্যুৎ তুমি ভীষণ বুদ্ধিমতী মেয়ে, তোমাকে আমি চিনি।
তা হলে ওকথাটা এখন থেমে থাক।
পান্না হেসে বলল, থাক।
দুপুরে রোদে ঘুরে লাল হয়ে ঘেমে-চুমে তারা যখন ফিরে এল তখন খাবার সার্ভ করা হচ্ছে। ঘাসের ওপর শালপাতার থালা আর বাটিতে সুস্বাদু সব পদ।
টুসকি অভিমানের গলায় বলল, পিকনিকে আজকাল কত গানবাজনা, নাচানাচি হয়, অন্তাক্ষরী হয়, কমপিটিশন হয়, আমাদের কিছু হল না। বিজুদার পিকনিক তো, বেশি আর কী হবে। যা নীরস লোক।
নিরু ঠোঁটকাটা আছে, বলল নীরস লোক তো তবে লাইন দিয়েছিলি কেন?
টুসকি লাল হয়ে সিঁটিয়ে গেল।
ব্যাপারটা আগাগোড়া লক্ষ করল সোহাগ। এগিয়ে গিয়ে বলল, আমরা একটু সেলিব্রেশন তো করতেই পারি। পিকনিক মানেই তো তাই।
নিরু বলল, কী করে হবে! মিউজিক সিস্টেমই তো আনা হয়নি।
তাতে কী! গান তো গাইতেও পারি আমরা। পারি না?
টুসকি করুণ মুখ করে বলল, ঝিনচাক মিউজিক ছাড়া কি জমবে?
চেষ্টা করতে দোষ কী?
কে কে গান জান বলল। খুব ভাল না জানলেও চলবে।
নবীনা বলল, বিজুদার পারমিশন নিয়ে নাও। নইলে পরে আবার কবে।
চাপা গলায় সোহাগ বলল, বিজুদা তো আমাদের অভিভাবক নন, অত ভয় পাবার কী আছে? ইনোসেন্ট গান, সঙ্গে একটু নাচ তো হতেই পারে। এ তো ডিসকোথেক নয়।
ভয়ে ভয়ে তিন চারজন নাম দিল। একটা জায়গায় কাঠকুটো জড়ো করে আগুন দেওয়া হল চারদিকে গোল হয়ে বসল তারা।
সোহাগ বলল, এটা ক্যাম্পফায়ার। বিকেলের দিকে হলে ভাল হত কিন্তু দুপুরেও দোষ নেই। লেট আস সিং।
পান্না খুব অবাক হয়ে দেখল সোহাগ ভারী সুরেলা গলায় গান ধরেছে, উই শ্যাল ওভারকাম…
সুরটা সকলের চেনাজানা। সহজ গানটার মধ্যে একটা চোরা আবেগ আছে, সহজেই ভাসিয়ে নিয়ে যায়। হাততালির সঙ্গে সঙ্গে এই গানে মুহূর্তেই জমে গেল আসর। যারা দূরে দূরে ছিল সব এসে জড়ো হয়ে গেল চারধারে। একটু বাদে গলা মিলিয়ে ফেলল সবাই। আর নাচবার জন্য কাউকে আহ্বান করতে হল না। প্রথমে শরীরের দোল তারপর নাচের ব্যাপারটা আপনা থেকেই ঘুরতে লাগল। সোহাগ এরপর ডো রে মি.. ধরল। তারপর রবীন্দ্রসংগীত। সব চেনা গান। হিন্দিও হল, গানের উৎসমুখ খুলে যেতেই লজ্জা সংকোচ ঝেড়ে ফেলে সবাই একে একে নিজের জানা প্রিয় গান গেয়ে উঠতে লাগল। গলা মেলাল সবাই।
