মায়ের সামনে বাবাকে বাঙাল বললে মা রাগ করে। তাই সে ভয়ে ভয়ে বলে, এমনি।
মা শুধু বলল, ওরকম করতে নেই।
নিকোনো উঠোন থেকে জিজিবুড়ির পড়ে যাওয়া দোক্তা বাঁ হাতের তেলোতে তুলে জড়ো করতে করতে মরণ বলল, বাবা আসছে শুনে জিজিবুড়ি এমন ভয় পেল যে দোক্তা ফেলে পালিয়েছে।
মা বাঙালের ভেজা লুঙ্গি তারে মেলতে মেলতে বলল, মায়ের যেমন কাণ্ড! ভয় পাওয়ার আর দোষ কী? কম লেগেছিল লোকটার পিছনে? এখন মুখোমুখি হলে লজ্জায় মাথা কাটা যায়।
ঘটনাটা জানে মরণ। মায়ের সঙ্গে বাঙালের বিয়ে দিতে গিয়ে এককাঁড়ি টাকা আদায় করেছিল জিজিবুড়ি। বিয়ের পরেও নানা অভাবের কথা বলে টাকা নিত। নিজের দুই পাষণ্ড ছেলে কানাই আর বলাইকে লাগিয়েছিল বাঙালের চাষ আবাদে। তারা ধান-চালের হরির লুট ফেলে দিয়েছিল। বাঙালের গোলায় ফসল আর উঠতই না। মতলব ছিল বাঙালকে তাড়িয়ে সম্পত্তি দখল করার। কারণ সম্পত্তি সবটাই প্রায় মেয়ের নামে। তা সেটা প্রায় ঘটেও গিয়েছিল। কলকাতার সংসারে যখন অশান্তি লাগে তখন বাঙালের যাতায়াত গিয়েছিল কমে। সেই ডামাডোলে বাঙাল যখন প্রায় নেই হয়ে গেছে সেসময় দুই ভাই এসে বোনকে নানা কানমন্তর দিত। বাঙাল যে খারাপ লোক, সে যে ঘুরে ঘুরে বিয়ে করে বেড়ায় এবং তার যে আরও নানা দোষ আছে সেসব কথা। সেই দুর্দিনে মায়েরও খুব মনের কষ্ট গেছে। পেটে তখন মরণের বড় বোনটা, যেটা বাঁচেনি। বাঁচার কথাও নয়। সেই সময়ে মন খারাপের চোটে মূৰ্ছা রোগ হয়েছিল। কয়েকবার মাথা ঘুরে পড়ে গিয়ে মেয়েটা পেটের মধ্যে মরে গেল।
বাঙাল যখন ফিরে এল বিষয়ী মানুষের চোখে তখন পরিস্থিতি বুঝে নিতে দেরি হয়নি। দুই শালাকে তাড়িয়ে নিজের বউকে আগলে যখন সে রুখে দাঁড়াল তখনই জিজিবুড়ি আর তার ছেলেদের সঙ্গে সম্পর্কটা বিষ হয়ে গেল। মারাত্মক ঘটনাটা ঘটল তার পরেই। কানাই আর বলাই দুটো গুণ্ডা ভাড়া করে লাগাল বাঙালকে নিকেশ করতে। সেটা হলে বোনের সম্পত্তির দখল নিতে আর বাধা হত না। দুটো গুণ্ডা বাঙালকে কুপিয়েও দিয়েছিল বাসরাস্তার কাছে বাঁশবনে। কিন্তু বাঙাল একটাকে পেড়ে ফেলেছিল। ধরা পড়ে দুজনেই কবুল করেছিল তারা কানাই বলাইয়ের টাকা খেয়ে এ কাজ করেছে।
মোকদ্দমা হতে দেয়নি বাসন্তী। বাঙালের হাতেপায়ে ধরে ভাইদের বাঁচিয়ে দিয়েছিল। কেলেঙ্কারির ভয়ে বাঙালও বেশি কিছু করেনি। কিন্তু সেই থেকে বাঙাল এলে ও বাড়ির কেউ ভয়ে আর এবাড়িতে আসে না। কিন্তু বাঙাল না থাকলে তারা এখনও এসে টাকাটা সিকেটা ধানটা চালটা মেগে-পেতে নিয়ে যায়।
এসব ঘটনার পর মরণ হয়েছিল। ওপরের বোন মারা যাওয়ায় তার নাম রাখা হয়েছিল মরণকুমার। যমকে খুশি করতেই রাখা।
জিজিবুড়ি বলছিল, জমি কিনে কিনেই বাঙাল একদিন শেষ হয়ে যাবে।
জমি কিনে শেষ হবে কেন? জমি রাখতে জানলে জমির মতো জিনিস নেই। আর শোনো, তুমি এখন বড় হয়েছ, এখন আর বাবাকে তাঁর আড়ালেও বাঙাল বলবে না।
সবাই বলে যে, তাই মুখে এসে যায়।
অন্যের কাছে উনি যা, তোমার কাছেও কি তাই? একটা মান্যিগন্যি নেই?
আছে বাবা, খুব আছে। মরণ তার বাপকে যমের মতো ভয় খায়। আর ভয় খায় বলেই আড়ালে বাঙাল ডেকে সেই ভয়টার সঙ্গে লড়াই করে।
বাঙালের লুঙ্গিটা টান টান করে খুব যত্নের সঙ্গে মেলে দিয়ে ক্লিপ আটকাচ্ছে মা, অনেক সময় নিয়ে। এমন আদুরে ভাব, যেন লুঙ্গিটাই বাঙাল। তেমনি যত্ন করে গামছাটা মেলতে মেলতে মা আপনমনে বলল, তোমার বাবা ভাল লোক।
জিজিবুড়ি ঠিক উলটো কথা বলে, ও হল বাঙাল দেশের লোক, ওদের জাতজন্মের ঠিক নেই। তেলি সাউ না শুঁড়ি সাউ কে জানে বাবা, ভোল পালটে সব আসে। আর কথারই বা কী ছিরি। উর্দু বলছে না পার্সি বলছে বোঝার জো নেই। মুড়িকে বলে হালুম, কাদাকে বলে প্যাক। ছিছিক্কার যাই বাবা। তার ওপর ঊর্ধ্ববায়ু, রগচটা মুষল। ওরা কি সব ভাল লোক? ভাল লোকেরা কি লুকোছাপা বিয়ে করে বাপ? আরও কটা করে বসে আছে তার খোঁজ নেয় কে? কপালটাই আমার অমন, লোভ দেখিয়ে মেয়েটার সব্বোনাশ করল।
তাই যদি হবে তাহলে বাঙাল এলে মায়ের চেহারায় একটা ভেজা ভেজা স্নিগ্ধ ভাব কেন ফুটে ওঠে? চোখ দুখানা কেন অমন নরম হয়ে যায়? বাঙালের লুঙ্গি আর গামছাখানা কেমন টান টান করে মেলে দিল মা, আর কারও জামাকাপড় অত যত্ন করে মেলে না তো! হাঁ করে দেখছিল মরণ। বাঙাল ভাল লোক না খারাপ লোক এই অঙ্কটা তার মিলতে চায় না কিছুতেই।
জিজিবুড়ি পিছনের দিকের খিড়কি দরজায় কচুপাতার আড়াল থেকে উদয় হয়ে সাবধানে মুখ বাড়িয়ে বলল, বাঙালটা বিদেয় হয়েছে?
কথাটা শুনে মায়ের ভ্রূ কোঁচকাল।
জিজিবুড়ি উঠোনে ঢুকতে ঢুকতে বলল, দিন নেই ক্ষণ নেই এসে উদয় হলেই হল। এমন আঁতকে উঠলুম যে পানের বাটাখানা পড়ে সব ছয়ছত্রখান। পিলে চমকানো লোক বাপু। দিলি ভাই তুলে দোক্তাটুকু? সুপুরিও পড়ে আছে দেখ কয়েক কুচি।
বাসন্তী একটু ঝাঁঝের গলায় বলে, সবসময় অমন ঠেস মেরে বাঙাল-বাঙাল বলো কেন বলো তো! শুনে শুনে বাচ্চারাও শিখছে। তোমার যে কবে আক্কেল হবে!
ও মা! বাঙালকে বাঙাল বলব না তো কী? নবদ্বীপের গোসাঁই তো নয় রে বাপু। ওসব মনিষ্যি আমাদের মতো তো আর নয়।
