ভারী সুন্দর সব দৃশ্য। ছানি-পড়া চোখে এসব দৃশ্য আবছা হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার সব ফুটে উঠেছে। ভারী ভাল দেখছে আজকাল ধীরেন। পেটে খিদে আঁচড়াচ্ছে। তবু কিছু খারাপ লাগছে না এখন। মনটা ভাল থাকলে এমন ধারা হয়! তখন খিদে-টিদে সব চাপা পড়ে থাকে।
মনটা ভাল হতে বেশি কিছু লাগে না! মানুষের এক-একটা উচ্চারণই যেন যুগযুগান্তের কুয়াশা কাটিয়ে রোদের আলো ছড়িয়ে দেয়! ওই যে কুয়োতলায় বাসন্তীর ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল, বমি করে উঠে হাঁফ ধরা গলায় বলছে, না বাপু শখ করে ইলিশ মাছ এনেছে। বেগুন-ইলিশ খাবে। আমি পারবখন, তুই একটু আগুপিছু করে দিস।
একটুকুই তো কথা, কিন্তু এই কথাটুকুই বড় বিহ্বল করে ফেলেছে তাকে। তাও বাসন্তী হল গিয়ে বাঙালের দ্বিতীয় বউ। আইনে যার স্বীকৃতি নেই। তার উপর ভিনদেশি মানুষ, গোঁয়ারগোবিন্দ, ভাষাটাও রাক্ষুসে। তা বলে কি ভালবাসায় ভাটা হল? নাঃ, বাঙালটার কপাল আছে। পুরুষও বটে।
বুঝলেন খুড়া, টাকাপয়সা বিষয়সম্পত্তি কোনও কামের জিনিস না। যার লিয়া করি সেই হইল আসল। হ্যায় যদি না থাকে তাহইলে হলই ফাঁক। বুঝলেন?
বুঝেছি হে। বাসন্তীর জন্য ভাবছ তো! আরে, চিন্তা কী? ও গাঁয়ের মেয়ে, শহুরে মেয়ের মতো ফুলের ঘায়ে মূৰ্ছা যায় না।
উপর্যুপরি হইয়া গেল তো, তাই একটু ডরাই।
আগে তো বাপু সব উপর্যুপরিই হত। তখন তো আর আটকানোর উপায় ছিল না।
খুড়া, বাসন্তীরে ভাল কইরা আশীর্বাদ কইরেন তো। আপনে একজন সজ্জন মানুষ, মনে কালিঝুলি নাই, প্রাণ ভইরা আশীর্বাদ কইরেন তো। গর্দিশটা য্যান পার হইতে পারে।
তার আশীর্বাদের কোনও দাম আছে বলে যে কেউ বিশ্বাস করে এটাই ধীরেনের কাছে অবিশ্বাস্য। বিল থেকে বিহ্বলতর লাগতে লাগল তার। এতটাই যে, চোখে জল এসে গেল। বুড়ো বয়সে কিছুই আটকানো যায় না। না পেচ্ছাপ, না চোখের জল। সুড়সুড় করে চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নেমে এল।
ধুতির খুঁটে চোখ মুছে ধরা গলায় ধীরেন বলল, কোনও কাজ হবে কিনা জানি না, তবে পাপীতাপী মানুষেরও মনে আশীর্বাদ জমা হয়ে থাকে, বাসন্তীর কিছু হবে না হে বাঙাল, তুমি দেখো।
বড় চিন্তা হয় খুড়া। মাইয়াটা বড় ভাল। ভালগুলাই তো টিকতে চায় না কিনা।
টিকবে হে টিকবে। শশধর ডাক্তারের সঙ্গে একবার দেখা কোরো। পুরনো ডাক্তার। এরকম হোমিওপ্যাথ পাবে না।
না, পেটের হাঁচোড়-পাঁচোড়টা আর নেই ধীরেনের। মন উপচে আনন্দটা চলকে পড়েছে বুঝি পেটেও। বেশ ভরা ভরা লাগছে।
চলি হে বাঙাল। বলে উঠতে যাচ্ছিল সে।
আরে, কই যান খুড়া? গিরস্তের অকল্যাণ চান নাকি?
কী যে বলো বাঙাল। তাই চাইতে পারি?
এই বাড়ি থিক্যা একটা কাউয়া পইর্যন্ত শুধু মুখে যায় না। বহেন বহেন।
আবার চোখে জল আসে ধীরেনের। স্খলিত কণ্ঠে বলে, আজ থাক।
পাগল নাকি? আপনারে খাওয়াইলে তো আমারই লাভ খুড়া। পরকালের বোঝা কমব। বহেন।
তা বসল ধীরেন। মনের বিহ্বল ভাবটা যাচ্ছে না। বড় অন্যরকম লাগছে চারদিকটা। ভারী ভাল লাগছে। জীবনে বোধহয় এরকম দিন দুটো-একটাই আসে।
মুক্তা এসে প্রথমে চা দিয়ে গেল। খাঁটি দুধের জিনিস, চা-পাতাটাও বেজায় ভাল। এরকম চা কোথাও খায়নি কখনও ধীরেন।
একটু বাদেই এল লুচি আর নতুন লালচে ছোট আলুর শুকনো দম।
খান খুড়া, প্যাট ভইরা খান।
আজ ধীরেন খিদের জন্য খেল না। লোভেও না। খেতে খেতে মনে মনে বলল, এদের দোষঘাট যা আছে তা সব আমার হোক ঠাকুর। এদের ভাল হোক। এই এদের সব গ্রহের দোষ, সব রিষ্টি, ফাড়াসব আমার গ্রাসে গ্রাসে মিশে যাক।
খুড়া।
অ্যাঁ।
প্যাট ভরছে?
ওঃ, খুব ভরেছে হে বাঙাল।
এইবার এক গ্লাস দুধ খান। নূতন গোরুর দুধ।
নাঃ হে, একদিনে এত ভাল নয়। পেট ছেড়ে দেবে।
আরে ধুর, আপনেরে তো অনেকদিন দেখতাছি। পারবেন।
দুধ খেতে হল। তারপর উঠল ধীরেন।
সকালটা আজ বড় ভাল কাটল। এখন বাকি দিনটা যেমনই কাটুক কিছু যায়-আসে না। দিন কেমন কাটবে তার একটা আন্দাজও আছে ধীরেনের। এই গাঁয়ের ঘাটায়-আঘাটায় চরকিবাজি করে বেড়ানোই তার জীবনযাপন। কোনও অর্থকরী কাজ নেই, লাভালাভ নেই, উপার্জন নেই। বাড়ি ফিরলে অশান্তি হয় বলে আজকাল বাইরেই সময়টা কাটিয়ে দেয় সে। কেউ বসতে বললে বসে। চুপচাপ ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে তার কোনও কষ্ট নেই। কত কী দেখে, কত কী শোনে। সূর্য মাথায় চড়ে বসলে ঘরমুখো হয়।
বাড়ি ফিরতেই তার বউ আজ বলল, বাঙাল বাড়িতে কিছু মেগে-পেতে এসেছ নাকি?
ধীরেন সভয়ে বলল, না তো!
তবে যে বড় ঝুড়িভর্তি আনাজ পাঠিয়েছে। কী ব্যাপার?
অবাক হয়ে ধীরেন বলে, পাঠিয়েছে নাকি?
হ্যাঁ। মেলা পাঠিয়েছে। সঙ্গে একটা খোকা ইলিশ অবধি।
আমি কিছু চাইনি। বাঙাল দিলদরিয়া লোক।
সে তো বুঝলুম। সে তোক খারাপ নয় জানি। কিন্তু তার খাণ্ডার শাউড়ি এসে না ফের ঝেড়ে কাপড় পরায়।
ধীরেন কী বলবে, চুপ করে রইল।
শুনলুম, ছেলের বউরা মিলে নাকি আজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তেঁতুলতলায় পুঁটুলি বগলে বসে আছে গিয়ে।
কার কথা বলছ?
বাঙালের শাউড়ির কথাই বলছি। এতকাল ঝগড়াঝাঁটি হত, কিন্তু ঘরের বার করে দেয়নি। আজ দিয়েছে।
কেন?
তা অত কে জানে? ভুতোর মা বলে গেল ছেলের ব্যবসার জন্য বাঙালের কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল। বাঙাল দেয়নি বলে বুড়ির ওপরে গিয়ে রাগ পড়েছে। তাই বুড়িকে বেড়ালপার করতে চাইছে। কর্মফল তো আছে রে বাবা! আমাকে সেদিন বিধিয়ে কত কথাই বলে গেল তোমাকে নিয়ে।
