মনটা খারাপ হয়ে গেল ধীরেনের। এখন অভাবে কষ্টে, সংসারের অশান্তিতে বাসন্তীর মা হয়তো ডাইনিবুড়ির মতো একজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এরকম তো ছিল না মহিলা। বিয়ে হয়ে যখন এল তখন রূপের বন্যা বয়ে যায়নি ঠিকই কিন্তু ভারী মিঠে চেহারাখানা ছিল। দাঁতের সারি ছিল দেখবার মতো। একটু পুরু রসালো ঠোঁট। গায়ে বেশ বলাবলি হত তাকে নিয়ে। মনে পাপ নেই তার, তবু ধীরেনের স্বীকার করতে বাধাও নেই, ওইরকম একখান বউয়ের বড় সাধ হয়েছিল তার।
সেই জোয়ান বয়সে ধীরেনের শরীরখানাও বড় কম ছিল না। ইয়া বুক ছিল, দু হাতে ছিল কামারের হাতের মতো জোর। আঁকড়া চুল ছিল। অনেক কটাক্ষই তাকে বিঁধেছে এককালে। বাসন্তীর মাও খুব আড়ে আড়ে তাকাত তার দিকে, মিষ্টি মিষ্টি রহস্যময় হাসত। রসালো কথাটথাও হত মাঝে মাঝে।
না, তার বেশি কিছু হয়নি।
সময়ের পোকা সব কেটেকুটে ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে তাদের। এখন সে বউঠানের চোখের বিষ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধীরেন।
.
মরণ হাঁফাতে হাঁফাতে রান্নাঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল, ওমা!
দুর্বল শরীরে জলচৌকিতে বসে বাঁশের খুঁটিতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে ছিল বাসন্তী। একটু অসাবধানে পেটে এল কুঁচোটা। তাতে বাসন্তী মোটেই বিরক্ত নয়। কিন্তু প্রথম কয়েকটা মাস তার বড় কষ্টের মধ্যে যায়। এই নিয়ে চারবার। প্রথমটা বাঁচেনি। এটাও বেঁচেবর্তে থাকবে কিনা কে জানে। শরীরে মায়া ছড়িয়ে মাকে কষ্ট দিয়ে আসছে তো!
মরণের চেঁচানিতে চোখ খুলে বলল, কী রে?
জিজিবুড়িকে মামিরা তাড়িয়ে দিয়েছে। তেঁতুলতলায় বসে আছে গিয়ে।
সে কী!
হ্যাঁ গো। খুব কাঁদছে বসে, আর রাজ্যের লোক জুটে গেছে সেখানে।
তুই গিয়ে দেখলি?
হ্যাঁ গো। আমি তো গিয়ে হাত ধরে কত টানাটানি করলাম। বললাম, আমাদের বাড়ি চলো।
সোজা হয়ে বসে শুষ্ক মুখে বাসন্তী বলল, তা কী বলল তোকে?
বলল, তোর মাও তো আমাকে সকালে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি কোথাও যাব না। আমি আজ মরব। হা মা, তুমি সত্যিই তাড়িয়ে দিয়েছ?
বাসন্তী একটু চুপ করে থেকে বলল, তাই বলেছে বুঝি? মার যেমন সব কথা! তাড়াব কেন? টাকা চাইতে এসেছিল, দিইনি।
কী হবে মা? জিজিবুড়ি যদি মরে যায়?
কাঁদছে বললি?
হ্যাঁ গো। খুব হাপুস কাঁদছে। মণিবউ বলল, সে নাকি দেখেছে বড় মামি জিজিবুড়িকে চুল ধরে টেনেছে, আরও সব কী করেছে যেন।
বাসন্তী স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ উনুনের দিকে চেয়ে থেকে বলল, মা তো সব কথা চেপে যায়। ওরা যে কী করে কে জানে!
কী হবে মা?
লোক জড়ো হয়েছে কেন রে?
জিজিবুড়ি যে তাদের কাছে সব বলছে।
কী বলছে?
এইসব অত্যাচারের কথা-টথা। তোমার আর বাবার কথাও বলছে।
কী বলছে শুনলি?
বলছিল, তোমরা নাকি মা শাশুড়ি বলে মানো না। সব সময়ে দুরছাই করো। উপোস করলেও খেতে দাও না। শাপশাপান্তও করছিল।
মায়ের জিভে যে বড্ড ধার। তোর বাবা কোথায়?
বাবা তো জমিতে গেছে।
দৌড়ে যাবি বাবা, ডেকে নিয়ে আয় তো মানুষটাকে।
বাবাকে ডাকব? বাবা যে জিজিবুড়িকে দেখতে পারে না।
কে বলল তোকে?
আমি জানি তো।
বাজে কথা। বাবাকে তুমি চেনো না ধন। তোমার বাবার মন বড় ভাল। যা দৌড়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়।
তার চেয়ে তুমি চলো না মা।
না বাবা, পাঁচজনের সামনে আমি মেয়েমানুষ গিয়ে আদিখ্যেতা করতে পারব না। তোর বাবা বিবেচক মানুষ, ঠিক একটা ব্যবস্থা করবে। যা, দেরি করিস না।
মরণ পাঁই পাঁই করে ছুটল। বেশি দূর যেতেও হল না। একটু গিয়েই দেখতে পেল তার বাবা ললিতখুড়োর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
বাবা!
তার বাবা ফিরে তাকিয়ে হঠাৎ সচকিত হয়ে বলল, কী রে, তর মায়ের কিছু হইছে নাকি?
না। মা তোমাকে ডাকছে।
ডাকতাছে? ক্যান রে, শরীর খারাপ লাগে নাকি?
না। মা ঠিক আছে। কী দরকার যেন।
তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল বাড়িতে।
কী হইছে গো?
বাসন্তী উঠোনে বসে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছিল। মুখ তুলে বলল, কী করি বলো তো? বউদিরা মাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কও কী?
তেঁতুলতলায় গিয়ে নাকি বসে আছে, রাজ্যের লোক জুটেছে সেখানে। কী করব বলো তো?
অকালকুষ্মাণ্ডগুলা কই? বাড়িতে নাই?
ওদের তো চেনো। মাকে ওরাই কি ভাল চোখে দেখে? দেখলে কি বউদের এত সাহস হয়?
কাইন্দো না। কী করতে চাও কও।
সেইজন্যই তো তোমাকে ডেকেছি। তুমি বলে দাও কী করব এখন।
যদি এই বাড়িতে আইন্যা রাখতে চাও তো রাখতে পারো।
আমার যে বড্ড ভয় করে। যেই মা এ-বাড়িতে আসবে অমনি দাদারাও ওই ছুতোয় এসে হানা দেবে। মাকে তো চেনো। ছেলেরা বিষ দিলেও ছেলেদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না।
হেইটা তো পরের কথা। অখন চটজলদি তো কিছু করতে হইব।
মাকে নিয়ে আসবে?
তুমি কইলে আনুম। ভাইব্যা কও।
আমার মাথায় কি বুদ্ধি আছে? আমি তো তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছি।
একখান কথা কই?
বলো না।
ঠাইরেনের দম একটু পরেই ফুরাইব। গুটিগুটি বাড়িও ফিরব। কিন্তু হেইটা কথা না। কথা হইল তোমারে লইয়া। এই অবস্থায় বেশি টেনশন ভাল না।
এই অশান্তি আমার আর সহ্য হয় না যে।
হেই লিগ্যাই কই, আমি গিয়া ঠাইরেনেরে লইয়া আসি। দুই দিন থাউক। তারপর ভাল বুঝলে বাড়িতে ফিরা যাইব।
মা তো ইদানীং এ বাড়িতেই থাকতে চাইছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। মায়ের কথাবার্তা আমার ভাল লাগে না। বড্ড খারাপ খারাপ কথা বলে। পান থেকে চুন খসলেই শাপশাপান্ত করে। এখনও নাকি করছে, মরণ শুনে এসেছে।
