কামারপাড়ার রাস্তায় সকালে হঠাৎ বলাইয়ের সঙ্গে দেখা। বাসন্তীর হেক্কোড় দাদা। কানাই আর বলাইয়ের মধ্যে মারদাঙ্গা লেগেই আছে। একসময় বাঙাল ভগ্নীপপিতকে গা-ছাড়া করে বিষয়সম্পত্তি গাপ করার ফন্দি এঁটেছিল। কালু গুণ্ডাকে দিয়ে খুন অবধি করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাঙাল শক্তপোক্ত লোক, সে ভয় খায়নি। মার খেয়েও নিজের দখল ছাড়েনি। গো আছে বটে। মাঝখানে থেকে কানাই বলাইকেই এখন আঁটি চুষতে হচ্ছে।
তাকে দেখেই বলাই হাঁটায় ব্রেক কষে বলল, এই যে ধীরেনকাকা কোথায় চললেন?
গলার চড়া আওয়াজটা ধীরেনের ভাল মনে হল না। বলাই মারমুখো মানুষ। তাই মিনমিন করে বলল, এই একটু বেরিয়েছি বাপু।
ওই শালার কাছে আপনার নাকি খুব যাতায়াত শুনতে পাই!
শালাটা কে তা বুঝতে না পেরে ধীরেন থতমত খেয়ে বলল, না তো! কে বলেছে তোমাকে?
লুকিয়ে তো লাভ নেই কাকা। সব জানি। আপনারা কিছু লোকই তো আসকারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছেন। এখন শালা চোখে ভেলভেট দেখছে। নইলে শুয়োরের বাচ্চার এত সাহস হয়?
ধীরেন বিপদের গন্ধ পাচ্ছিল। বড্ড তেড়িয়া মেজাজ বলাইয়ের। গদগদে একটু হেসে বলল, না বাবা, কে কী রটায় কে জানে। ওসবে কান দিও না।
কেন কাকা, মিছে কথা বলে বুড়ো বয়সে পাপের বোঝা বাড়াচ্ছেন। ওই খানকির ছেলে আপনাদের মাথা খাচ্ছে কী করে? বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে আমাদের গাঁ ছারখার করে দিচ্ছে, দেখছেন না? আমার বোন তখন কুঁড়ি মেয়ে, বোধবুদ্ধি হয়নি। তাকে ফুসলিয়ে শাঁখা সিঁদুর পরিয়ে বিয়ের ভড়ং করল, আপনারা পাঁচজন টু শব্দটি করলেন না। নইলে নাবালিকা হরণের জন্য ওর দশ বছর জেল হয়। ও শালা কী মতলবে একটা বউ থাকতে আবার বিয়েতে বসল সেটা কি বোঝেন না আপনারা?
এইবার কার কথা হচ্ছে তা ধরতে পারল ধীরেন। তবে সম্পর্কটা রাগের মাথায় বড্ড গুলিয়ে ফেলছে বলাই। কে কার শালা তার পর্যন্ত হিসেব করছে না।
আমতা আমতা করে ধীরেন বলল, যা হয়েছে তা তো হয়েই গেছে বাবা। একটা মিটমাট করে নাও বরং।
মিটমাট! ভাল বলেছেন বটে। ও হারামজাদা মিটমাটে আসতে চাইলে তো!
যেন ভারী অবাক হয়েছে এমন ভাব করে ধীরেন বলল, চাইছে না বুঝি?
রাগে বলাই যেন দুনো হয়ে উঠছিল, এ কথায় ফেটে পড়ে বলল, ও শালার পাখা গজিয়েছে, বুঝলেন? পেটে পেটে শয়তানি কি কম? আমার বোনকে ফুসলিয়ে বের করে নিয়েছে, লোককে ধাপ্পা দিয়ে দোহাত্তা জমি গাপ করছে, খোঁজ নিলে দেখবেন আরও কটা বিয়ে করে বসে আছে। এসব বদমাশ লোককে আপনারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন কী করে? ভুবন জ্যাঠা তো বলেছিল, এই গাঁয়ে বাইরের লোক বসান দিতে দেবে না। পঞ্চায়েত না কচু। কিছু পারল করতে, টাকা খাইয়ে সব মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। বেশি নয়, আমার ধূপকাঠির ব্যবসায় দশটি হাজার টাকা ঢাললেই ফুলেফেঁপে উঠবে। খদ্দের ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। মাত্র দশটি হাজার টাকা ধার হিসেবে চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আমার মাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
ধীরেন ভারী অবাক হয়ে বললে, তাই নাকি? এ তো অন্যায় কথা।
অন্যায় নয়! বলে পাঠিয়েছিলুম হ্যান্ডনোট লিখে দিচ্ছি, না হয় বউয়ের নথ বাউটি বাঁধা দিচ্ছি, তা কানেই তুলল না। আপনারা সবাই মিলে এই অন্যায়ের একটা বিহিত তো করতে পারেন। নাকি?
হে হে করে ভারী বুঝদারের মতোই হাসছিল ধীরেন। বাসন্তীর মা বিয়ের সময় মোটা টাকা পণ নিয়েছিল রসিকের কাছ থেকে, সবাই জানে। বিষয়-সম্পত্তিও সবই বাসন্তীর নামে। এদের হয়তো আশা ছিল লোকটাকে হাড়িকাঠে ফেলা গেছে। কিন্তু বাসন্তীকে যত বোকা বলে ধরে নিয়েছিল এরা ততটা বোকা যে বাসন্তী নয়, সেও যে নিজের ভাল-মন্দ বোঝে এটা টের পেয়ে এখন এদের এক গাল মাছি। শুধু তাই নয়, বাসন্তী তার বাঙাল স্বামীকে ভালবাসে খুব। যদিও তার কানে বিষ বড় কম ঢালেনি কানাই বলাইয়ের মা।
তবে এতসব আস্ফালনের ভিতর থেকে পরমহংস যেমন জল থেকে দুধ তুলে নেয় তেমনি ধীরেনও আসল খবরটা পেয়ে গেল। তা হল বাঙাল এসেছে। আর তার মানেই হল সকালে আজ একটা খ্যাটনের ব্যবস্থা হল।
তা এ পর্যন্ত ভালই এগোচ্ছিল ব্যাপারটা। বেগুনক্ষেত দেখে বেড়ানো অবধি, কিন্তু বাধক হচ্ছে বাসন্তীর ওই বমিটা, ওতেই এক বালতি দুধে এক ফোঁটা গোচোনা পড়ে যাচ্ছে।
সে বাঙালের দিকে চেয়ে বলল, তাই বুঝি?
হ খুড়া। ইচ্ছায় হয় নাই। তবে ভগবানের ইচ্ছার উপর তো হাত নাই।
তা তো বটেই।
আমি বউরে কইছি, কষ্ট-টষ্ট হয় হউক, পোষাইয়া দিমু অনে। কিন্তু মুশকিল কী জানেন? প্যাটে তো কিছুই রাখতে পারছে না। যা খায় উগরাইয়া দেয়।
তবে তো সমস্যা।
খুব সমস্যা।
বমির শব্দ থেমেছে। এখন জল কুলকুচি করার শব্দ হচ্ছে। মুক্তার গলার স্বর শোনা গেল, অ বউদি, পেট তো একেবারে খালি করে দিলে। গিয়ে শুয়ে থাকো গে যাও, রান্না-বান্না আমি দেখছি।
বাসন্তীর ক্ষীণ গলায় বলল, না বাপু, শখ করে ইলিশ মাছ এনেছে। বেগুন-ইলিশ খাবে। আমি পারবখন, তুই একটু আগুপিছু করে দিস।
তোমার মাকে একটা খবর দেব কি?
কেন?
শুনেছি নাকি কোন শেকড় বাটা খাইয়ে পোয়াতির বমি বন্ধ করতে পারে।
না বাপু, ওসব জিনিসে আমার দরকার নেই। বমি হচ্ছে তোক। এ তো আর নতুন কিছু নয়।
বাঙাল খুব আনমনে সামনের দিকে চেয়ে বসে আছে। হাম্মি টলোমলো পায়ে দাওয়া ধরে ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে বাপের দিকে ফিরে চেয়ে মোট চারখানা দাঁত দেখিয়ে হাসছে।
