এখানে এলেই সোহাগের মুখে একটা উজ্জ্বলতা দেখা যায়। ভিতরকার আনন্দ যেন ফেটে বেরোতে চায়। শহর ওর ভাল লাগে না, অমল জানে। শরীরও ভাল থাকে না কলকাতায়। মেয়েটা ভারী মানিয়ে নিয়েছে সকলের সঙ্গে।
অমল একটা তৃপ্তির শ্বাস ফেলল। হঠাৎ তার জীবনে সবকিছুই ভারী অনুকূল মনে হচ্ছে। গ্রহনক্ষত্রের খেলা নাকি? কে জানে বাবা! এত ভাল কি সত্যিই ভাল? ভালর আবার গুনোগার দিতে হবে না তো!
.
গাছের তলায় রাজ্যের ছোবড়া, ছুঁটে আর কাঠকুটো দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে ধোঁয়া তৈরি হয়েছে। নিথর বাতাসে ধোঁয়া উঠছে কুণ্ডলী পাকিয়ে। কোনও পতঙ্গই ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না।
সোহাগের হাতে একটা নতুন গামছা দিয়ে পান্না বলল, এটা দিয়ে মাথা মুখ ঢেকে নাও।
ওমা! কেন?
কী জানি বাবা, মৌমাছিদের ঘর ভাঙা হচ্ছে, ওরা যদি রাগ করে ছুটে এসে কামড়ায়!
যাঃ, কিচ্ছু হবে না।
বিজুর পরনে ফুলপ্যান্ট, গায়ে টি শার্ট, কোমরে বাঁধা একটা গামছা, তাতে একটা চকচকে দা গোঁজা। সে খুব সন্তর্পণে টারজানের মতো জামগাছটা বেয়ে উঠে যাচ্ছিল। পিছু পিছু উঠছিল মরণ।
জানো তো, বিজুদা হল গাছ বাওয়ার ওস্তাদ। আর মরণ। কেউ ওদের মতো পারে না।
ঊর্ধ্বমুখে সোহাগ দেখছিল বিজুকে। ছিপছিপে দীঘল সুপুরুষ এই যুবকটিকে সে আজকাল কেন যেন খুব খুঁটিয়ে লক্ষ করে। একটু প্রাচীনপন্থী, ডু গুডার, একটু কুসংস্কারাচ্ছন্নও বোধহয়। কিন্তু লোকটা মন্দ নয়। মেয়েদের সামনে একটু আপসেট হয়ে পড়ে।
বিজু চাকটার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। মরণ ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল, পান্নাদি চাদরটা দুজনে শক্ত করে ধরবে কিন্তু। মস্ত বড় চাক। অনেক মধু।
বিজু বলল, দুজনে পারবি তো! না হলে সুদর্শনকে বরং ডেকে আন।
মৌমাছিদের পাখার শব্দে চারদিকে ঝালা বেজে যাচ্ছে। অনেক মৌমাছি উড়ে উড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে ধোয়ার পরিধির বাইরে। খুব দূরে যায়নি এখনও। বাসার বড় মায়া। কত যত্নে কতদিন ধরে তৈরি করেছে এই চাক।
দাঁড়াও সোহাগ, সুদর্শনদাকে বরং ডেকেই আনি। মস্ত বড় চাক। আমরা পারব না।
পান্না সুদর্শনকে ডাকতে গেল। সোহাগ চেয়ে রইল ওপর দিকে। হঠাৎ যেন মধুর মতোই এক সুস্বাদ সে অনুভব করছিল তার সর্বাঙ্গে। কেন কে জানে।
.
৬৩.
বাইগুনগুলা দ্যাখেন খুড়া, কেমন বোঝেন?
ধীরেন কাষ্ঠর চোখ ভারী জুলজুল করছিল। গোয়ালের পিছন দিকটায় পচাই সার দিয়ে বেগুন ফলিয়েছে বাঙাল। শীতের মাঝামাঝি পার করে তবে ফলেছে বটে বেগুনের মতো বেগুন। কিছু সবজে-বেগুনি দো আঁশলা, কিছু প্রগাঢ় কালচে-বেগুনি রঙের। আখাম্বা বিরাট সাইজের নয়, মাঝারি গড়নের। বড় বড় পাতার আড়ালে আবডালে যেন নববধূর মতো সব আধো-ঢাকা হয়ে উঁকি দিচ্ছে। বেগুন চেনে ধীরেন। এর জাতই আলাদা। গা এত চকচকে যেন কেউ তেলে ডুবিয়ে এইমাত্র তুলেছে।
হাঁটু মুড়ে বসে জহুরির চোখে কয়েকটা বেগুন নেড়েঘেঁটে দেখল ধীরেন। ভারী নরম শরীর, ভিতরে যেন বিচিই নেই মোটে।
বাঙাল হে, এ তো বড় জাতের বেগুন দেখছি। ফলনও তো ধুন্ধুমার।
আইজ্ঞা। আপনারা কাশীর বাইগুন কইতে লোল ফালান, আমি কই ময়মনসিংহের বাইগুন একটু চাইখ্যা দেইখেন, রসগোল্লা ফালাইয়া বাইগুন খাইবেন।
আরও বড় হবে তো!
কন কী! আরও বড় মানে! লাউয়ের লাহান হইব। অখনই কী দ্যাখতাছেন, আর এক মাস পরে দেইখ্যেন, চোখে ধন্দ লাগব।
আজ বাঙালকে বেগুনে পেয়েছে। এক একদিন এক একটা পায় ওকে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, ধীরেন সব বেগুনেরই স্বাদ পায়। পেটে খিদে থাকলে স্বাদ-সোয়াদের অভাব হয় না। তার কাছে কাশীর বেগুন যেমন, ময়মনসিংহের বেগুনও তেমন। তফাত হয়তো আছে, কিন্তু বাছবিচার নেই, তবে মোসাহেবি করা তার রক্তের মধ্যেই আছে, যখন যে যা বলে তাতেই তাল ঠুকে না গেলে ধীরেনের চলেই বা কী করে? সুতরাং সে সারা সকালটা বেগুনের ক্ষেতে ঘুরে ঘুরে বিস্তর হ্যাঁ, হুঁ, বটেই তো বলে যেতে লাগল। বেগুন নিয়ে আরও কিছুক্ষণ কাটত। কিন্তু বাঙালের কোলে তার মেয়ে হাম্মি চড়া রোদে আর থাকতে চাইছে না। সে কান্নাকাটি শুরু করায় বাঙাল বাড়ির দাওয়ায় ফিরে এসে ছায়ায় বসল। মেয়েটাকে ছেড়ে দিল উঠোনে।
একটা মেয়ের বমি করার শব্দ আসছিল কুয়োতলার দিক থেকে। কুয়োতলাটা আবডালে। রান্নাঘরের ওপাশটায় একটা নিমগাছের ছায়ার নীচে। এখান থেকে দেখা যায় না। বাঙাল কুয়োতলাটা বানিয়েছে হিসেব করে। নিমপাতা পড়ে পড়ে কুয়োর জল নাকি শুদ্ধ হবে, তা হবে হয়তো। কিন্তু বমিটা করছে কে? একটু কান খাড়া করে ধীরেন। লক্ষণ ভাল নয়। এ যদি বাসন্তী হয় তা হলে চিন্তার কথা। বমি করে নেতিয়ে-টেতিয়ে পড়বে হয়তো। তা হলে ধীরেনের সকালের খ্যাটনটা গেল।
বমির শব্দটা বাঙালও শুনছিল। মন দিয়েই শুনল। তারপর ধীরেনের দিকে চেয়ে বলল, মাইয়ালোকের এই বড় দোষ।
ধীরেন বুঝতে না পেরে একটা হু দিয়ে দায় সারল।
রসিক নিজেই ফের বলল, প্যাটে বাচ্চা আইলেই বমিছমি কইরা নান্দিভাস্যি কাণ্ড।
এবার ধীরেন বুঝল, বলল, বলো কী। হাম্মি তো এই সবে দাঁড়াতে শিখেছে।
আর কইয়েন না খুড়া। ইচ্ছায় তো হয় নাই অ্যাকসিডেন্টাল কেস। হইয়া পড়ছে আর কী!
এরকম তো হতেই পারে। ধীরেন ব্যাপারটার মধ্যে আর কোনও দোষ দেখতে পেল না। তবে সকালে আজ হাঁটাহাঁটি হয়েছে বিস্তর। মহিমদাদার বাড়িতে আজকাল সকালের দিকে গিয়ে পড়লে একটু কফি জোটে। কফির একটু নেশাও হয়েছে আজকাল ধীরেনের। তা গিয়ে শুনল, কফি ফুরিয়েছে। আজ তাই লিকার চা জুটেছে। লিকার চা নিমকহারাম জিনিস। পেটে গিয়ে ঘুমন্ত খিদেকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে দেয়। তখন ভারী হাল্লাচিল্লা পড়ে যায় পেটে। পেটের সেই হাঁচোড়-পাঁচোড় থেকেই মনে পড়ে গেল আজকাল বিজুদের বাড়িতে সকালের দিকে পাউরুটি সেঁকা হয়, পুরু মাখন লাগিয়ে খায় সবাই। জব্বর জিনিস। গিয়ে শুনল, সকালে সব পিকনিকে গেছে। আজ শনিবার, বাঙালের আজ বিকেলে আসার কথা। রোববার সকালে তার বাঙালের বাড়িতে পাকা বন্দোবস্ত আছে। কিন্তু বাঙাল না-থাকলে সুবিধে হয় না। বাসন্তীর মা এসে সকালবেলায় থানা গেড়ে বসে থাকে। যৌবনের সেই রসে ঢলঢল মেয়েটি এখন কাকতাড়ুয়া বুড়ি। দেখলেই বুকের ভিতরটা গুড়গুড় করে। তার বউয়ের কাছে নালিশও করে এসেছে।
