প্রমোদগৃহের এক কোণ থেকে শিষ্য উঠে দাঁড়িয়ে বিনয় সহকারে বলল, না ভদ্রে, প্রমোদগৃহ একেবারে শূন্য নয়। আমরা তোমরা দর্শনাভিলাষী হয়ে অপেক্ষা করছি।
অপরূপ নারী এবার তাদের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করল। চোখে বিরক্তি। মুহূর্তকাল মাত্র। তার পরেই রাজবিনোদিনীর দুটি আয়ত চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল। প্রমোদগৃহের এক কোণে দীপশিখার আলো তেমন উজ্জ্বল নয়। অথচ সেখানে যেন একটি দীপদণ্ড দাউ দাউ করে জ্বলছে। না, দাউ দাউ করে জ্বলছে না। অগ্নিরেখার মতো স্থির ও দীপ্ত হয়ে আছে। এ কে? কোনও প্রণয়প্রার্থী? প্রমোদপ্রিয়? সংগীতরসজ্ঞ?
বিভ্রান্ত রাজবিনোদিনী চঞ্চল হল। পদক্ষেপে স্বর্ণমঞ্জরীর নিক্কণ তুলে কয়েক পা এগিয়ে গেল অতিথিদ্বয়ের দিকে। তারপর বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। তার সর্বাঙ্গ প্রকম্পিত হচ্ছিল এক অজ্ঞাত ভয়ে। বুকের মধ্যে এক সুগভীর দুন্দুভি বেজে উঠল যেন। আর বিস্ফারিত লোচন হঠাৎ সিক্ত হল অকারণ অশ্রুতে। স্থাণুবৎ কিছুক্ষণ দণ্ডায়মান থেকে আচমকা প্রবল বাত্যায় উৎপাটিত বৃক্ষের মতো ভূপাতিত হল রাজবিনোদিনী। সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করার পর অতি ধীরে নিজেকে উত্তোলন করে দুই পদ্মপত্রের মতো চোখে তাকিয়ে রইল ঋষির দিকে। মুখে বাক্যস্ফুর্তি হল না।
শিষ্য সবিস্ময়ে বলে উঠল, মহাতপ, এ কী! এই প্রমোদগৃহকে যে আপনি বিষাদগৃহে পরিণত করেছেন!
গুরু শুধু মৃদু হাস্য করলেন।
রাজবিনোদিনী তার স্খলিত অঞ্চল তুলে নিয়ে নীরবে নতমস্তকে প্রমোদগৃহ থেকে নিষ্ক্রান্ত হলে গুরুদেব গাত্রোত্থান করে বললেন, চলো বৎস, আমাদের নৈমিষারণ্যের তপোবনে ফিরে যাওয়ার সময় হয়েছে। আর কালক্ষেপ বৃথা।
শিষ্য স্তম্ভিত মুখে গুরুদেবের অনুসরণ করতে লাগল।
নিশাকালে জনবিরল শব্দহীন তপোবনে গুরুদেবের পদপ্রান্তে বসে শিষ্য প্রশ্ন করল, গুরুদেব ব্রহ্মজ্ঞান আসলে কী বস্তু তা আজ্ঞা করুন।
গুরুদেব সহাস্যে বললেন, বৎস, ব্রহ্মজ্ঞান কোনও অলীক কল্পনা নয়, ধরাছোঁয়ার বাইরের ব্যাপারেও নয়, তোমার হাওয়ার নাড়ও নয়। ব্রহ্মজ্ঞান হল কাণ্ডজ্ঞান বা বাস্তব চৈতন্য।
মহাশয়, আপনি বিস্তারিত বলুন। আমার কোথায় ভুল হয়েছিল?
বৎস, মানুষ যৌবনের অনিত্যতার কথা জানে, প্রমোদের ক্লান্তির কথাও জানে, সৌন্দর্যের অবসানের কথাও জানে। জীবনের শেষে যে মৃত্যু অপেক্ষমাণ তার কথাও কি মানুষ জানে না? তবু নিজেকে সে ভুলিয়ে রাখতে চায়। যে-জ্ঞান সব ধাঁধাকে ধ্বংস করে বস্তুর মর্মে পৌঁছয় তাই ব্ৰহ্মজ্ঞান। তুমি আবার সাধনায় ব্যাপৃত হও।
যথা আজ্ঞা গুরুদেব।
.
শীতের প্রকোপ কমে আসছে। মাঝে মাঝে দক্ষিণের হাওয়া বয়ে যায় আজকাল। গাঁয়ে বসন্তকালের দেখাসাক্ষাৎ পাওয়া যায় এখনও। ভারী আরামদায়ক একটি আবহাওয়ায় সকালে নিজের ঘরে বসে আপনমনে লিখছিল অমল। আজকাল তার মন ভাল আছে। রাতে ঘুম হয়। আবার প্রশ্নও জাগে, ভোতা হয়ে যাচ্ছি নাকি? বুড়ো হয়ে গেলাম না তো! কিংবা কে জানে, আর পাঁচজন এলেবেলে মানুষের মতো আমিও হয়ে যাচ্ছি নিরীহ গৃহপালিত একটি প্রাণী। মেধাবী অমলের এ কি অধঃপতন? প্রশ্ন কমছে, জীবনের রহস্যময়তা হ্রাস পাচ্ছে, গণ্ডিবদ্ধ সংসারে দিব্যি খাপে খাপে বসে যাচ্ছে সে৷ মোনার সঙ্গে যে আকচা-আকচিটা ছিল সেটাও আর নেই। এখন সে খুবই ভদ্রভাবে অনুগত স্বামীর মতো বেশির ভাগ কথাতেই সায় দিয়ে চলে। ভিতরের সব অঙ্গার খাক হয়ে গেল নাকি তার? মাঝে মাঝে এই খাতাকলম নিয়ে বসা। এটাই তার একমাত্র অ্যাডভেঞ্চার। এইসব খণ্ডচিত্র কোনও নাটক নভেল নয়, উপন্যাস বা গল্পও নয়, শুরু-মধ্য-শেষ বলে কিছু নেই। এগুলোর নেই কোনও ভবিষ্যৎও। তবু এই একমাত্র তার আবরণহীন হওয়ার ক্ষেত্র।
গতকাল শুক্রবার গেছে। অফিসের পর গাড়ি নিয়ে সন্ধের মুখেই তারা বেরিয়ে পড়েছিল উইকএন্ডে। একটু রাতের দিকেই পৌঁছেছে গাঁয়ে। এটা আজকাল তাদের প্রিয় অভ্যাস। এক সময়ে নাকি মোনার খুব গাছপালার শখ ছিল। বিদেশবিভূঁইয়ে আর সেসব শখ বজায় রাখা যায়নি। কলকাতার ফ্ল্যাটে টবে কিছু গাছপালা পালনের চেষ্টা হয়েছিল, সুবিধে হয়নি। মোনাকে তার শ্বশুরমশাই একটা ফাঁকা জমি ঘিরে দিয়ে বলেছে, তোমার এত গাছপালার শখ, আমি তোক ডেকে লাঙল দিয়ে দিচ্ছি। তুমি ইচ্ছেমতো গাছ লাগাও। সারা সপ্তাহ জল-টল আমরা দিয়ে দেবখন।
মোনা কলকাতার নার্সারি থেকে ইচ্ছেমতো ফুলের গাছ কিনে এনে লাগাচ্ছে তিন সপ্তাহ হল। তার চোখমুখে নতুন খেলনা পাওয়ার উত্তেজনা। সকাল থেকেই বাগানে পড়ে আছে। অন্য কোনও দিকে খেয়ালই নেই।
থাক, একটা কিছু নিয়ে থাক। যারা একটা কিছু নিয়ে মেতে থাকে তাদের মাথায় শয়তানের বাসা হয় কমই। মোনা আজকাল অশান্তি কমই করে।
বাবা।
অমল তার অন্যমনস্ক চোখ ফিরিয়ে মেয়েকে দেখল, কী রে?
একটু ঘুরে আসছি। আজ চাক ভাঙা মধু খাব।
অমল হাসল। সব মধুই তো চাক ভাঙা।
হ্যাঁ। কিন্তু ভাঙা চাক থেকে টপ টপ করে মুখে গরম মধু পড়ার মতো তো নয়। খাবে? তা হলে তোমার জন্য নিয়ে আসব ক্যারিব্যাগে করে।
আনিস।
ওই রকম করে খেতে হবে কিন্তু। স্কুইজ এ লিটল, ড্রিংক এ ড্রপ অর টু।
তাই করব। কার বাড়িতে চাক ভাঙছে রে?
পান্নাদের জামগাছে। ইয়া বড় চাক।
