ভগবান, আপনি কখনও মাধ্বী বা দ্রাক্ষাসব পান করেননি।
না বৎস।
আপনি কখনও গীত শ্রবণ বা নৃত্য পরিদর্শন করেননি।
না পুত্র।
আপনি কখনও দূতক্রীড়া বা বাজিতে অংশগ্রহণ করেননি।
না ধীমান।
আমি সবই আস্বাদ করেছি। অজ্ঞান, ব্রহ্মজ্ঞানহীন, প্রাকৃতজনেরা এই সকল উৎস থেকেই আনন্দ আহরণ করে। ক্ষণিকের তীব্র সুখানিভূতি তাদের গ্লানি, শ্রম, ক্লান্তি, বিষাদ, উদ্দীপনার অভাব অপনোদন করে। আয়ুষ্কাল পদ্মপত্রে নীরবিন্দু মাত্র। সাধারণ মানুষও এইসব সুখানুভূতির ভিতর ব্রহ্মস্বাদই পেয়ে থাকে। জীবনযাপন সহনীয় হয়।
তোমার এই বাক্য আমাকে বিস্মিত করছে বৎস।
মহাভাগ, বিস্ময় উৎপন্নের হেতু আপনার অনাস্বাদ। আপনি এইসব সুখানুভূতির শরিক নন। শরিক হলে বুঝতেন এও ব্রহ্মেরই আস্বাদ।
বটে!
আজ্ঞা ঋষিশ্রেষ্ঠ।
বৎস, তোমার কথা শুনে ওইসব ক্ষুদ্র ব্রহ্মবিশ্বকে অনুধাবন করার ইচ্ছা হচ্ছে।
অতি উত্তম প্রস্তাব মহর্ষি।
ক্ষণকাল অপেক্ষা করো, আমি প্রস্তুত হয়ে আসছি।
গুরুদেব তাঁর গৃহমধ্যে অন্তর্হিত হলেন এবং কয়েক দণ্ড পর যখন নিষ্ক্রান্ত হলেন তখন শিষ্য বিস্ফারিত লোচনে স্থানুবৎ বসে রইল। কোথায় সেই শ্মশ্রুমণ্ডিত প্রবৃদ্ধ অশীতিপর ঋষি। ইনি যে এক সতেজ, সটান, উজ্জ্বলকান্তি অতীব সুদর্শন এক যুবা পুরুষ।
আপনি কে?
বৎস, আমিই তোমার গুরু। বিস্মিত হয়ো না। আমি সামান্য পরিচর্যা করেছি মাত্র।
সেই লোলচর্মবিশিষ্ট, পলিতকেশ অশীতিপর বৃদ্ধই কি আপনি? হা পুত্র, বৃথা কালক্ষেপে কাজ কী? সন্ধ্যা ঘনায়মান, এই তো প্রমোদের কাল। চলো। কিছুকাল পরে গুরু ও শিষ্য একত্রে নগরের দুর্ধর্ষ নটী রাজবিনোদিনীর আলয়ে প্রবেশ করলেন। সেখানে নগরের শ্রেষ্ঠ ধনী, রাজন্যবর্গ, সেনাধ্যক্ষ, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীবৃন্দ উপস্থিত। প্রত্যেকেরই অঙ্গে মহার্ঘ পোশাক, স্বর্ণালঙ্কার, পেটিকায় প্রভূত স্বর্ণমুদ্রা ও মূল্যবান উপহারসামগ্রী। প্রত্যেকেই রাজবিনোদিনীর আসঙ্গলিন্দু ও স্তুতি-উন্মুখ। প্রমোদশালা গন্ধে, পুষ্পে, রত্নখচিত বস্ত্রসম্ভার ও বর্ণাঢ্য গালিচায় শোভাময়। রাজবিনোদিনী সভাস্থলে অচিরেই প্রবেশ করবেন। সুন্দরী দাসীরা অতিথিবৃন্দকে উত্তম আসব ও নানাপ্রকার খাদ্যদ্রব্য বিতরণে নিরন্তর পরিচর্যা করে চলেছেন। পরিচারকেরা বড় বড় সুদৃশ্য পাখায় ব্যজন করছেন। শিষ্য সমভিব্যাহারে ঋষি প্রবেশ করামাত্র সভাস্থল যেন হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। অতিথিরা সকলেই হতচকিত, বিস্মিত। তারা এরকম দিব্যকান্তি পুরুষ আর দেখেননি। ঋষির পরনে নিতান্তই দুটি বস্ত্রখণ্ড। কিন্তু সেই সামান্য বেশবাসেই তাকে বড় অপরূপ দেখাচ্ছে। সকলেরই বিস্মিত দৃষ্টি তার উপর নিবদ্ধ। যেসব যন্ত্রানুসঙ্গী নানা বাদ্যযন্ত্রে মধুর শব্দলহরী সৃষ্টি করছিল তারাও আচমকা থেমে গেল।
দেবর্ষি, আপনার আগমনে এখানে কিছু রসভঙ্গ হয়েছে।
কিন্তু বৎস, আমি তো রসভঙ্গ ঘটাতে আসিনি। গীতবাদ্য যেমন চলছে চলুক। তুমি সকলকে আশ্বস্ত করো। আমি আজ রসগ্রহণ করতেই এসেছি।
গীতবাদ্য ফের শুরু হল বটে, কিন্তু বেসুর বাজছিল।
উপস্থিত শ্ৰেষ্ঠীদের মধ্যে একজন উঠে পড়লেন। ঘর থেকে নিষ্ক্রান্ত হওয়ার আগে কী ভেবে হঠাৎ এগিয়ে এসে নতজানু হয়ে ঋষিকে প্রণাম করে বিনা বাক্যব্যয়ে চলে গেলেন।
ক্ষণকাল পরে রাজন্যবর্গের একজন অনুরূপভাবেই উঠে পড়লেন। তিনিও বিদায় নেওয়ার আগে ঋষিকে অভিবাদন করে গেলেন।
ক্ষণকাল পরে আরও একজন এবং তার পরে আরও একজন। এমনি করে প্রমোদালয় ধীরে ধীরে শূন্য হতে লাগল।
শিষ্য উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, প্রভো, এঁরা রণে ভঙ্গ দিচ্ছেন কেন তা বুঝতে পারছি না। এঁরা কি আপনাকে অসম প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করছেন? রাজবিনোদিনীর অনুগ্রহপ্রার্থীরা সহজে হার মানার মানুষ নন।
গুরু মৃদু হাস্য করলেন মাত্র।
প্রমোদগৃহ শূন্য হয়ে গেল। শেষ অতিথি রাজ্যের সহসেনাপতি বিদায় নিয়ে যাওয়ার আগে যথাবিহিত প্রণাম করলেন ঋষিকে। তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলতে গিয়েও বললেন না। মাথা নত করে বিদায় নিলেন।
গীতবাদ্যকাররা নীরবে বসে রইল। তাদের কণ্ঠে সুর আসছে না। বাদ্যযন্ত্রে আঙুল স্থির হয়ে আছে।
এমন বিস্ফোরক অবস্থায় নিরানন্দ প্রমোদগৃহে প্রতিহারী অতি নির্বাপিত কণ্ঠে রাজবিনোদিনীর আগমনবার্তা ঘোষণা করল।
আগমন তো নয়, যেন আবির্ভাব। রাজবিনোদিনী সর্বাঙ্গসুন্দরী। কেশদাম থেকে পাদনখ পর্যন্ত যেন কোনও চতুর শিল্পীর কারুকার্য। স্বর্ণ, হীরকখণ্ডের আবরণে যেন বিদ্যুৎ খেলা করছে। অতি মূল্যবান রেশমি বসনের কুশলী বিন্যাস দেহঘষ্ঠিকে আরও প্রকট করেছে। আয়ত দুই চোখে অপ্সরাসদৃশ কটাক্ষ। লীলায়িত দুখানি হাত যেন সর্বদাই নানা নৃত্যের মুদ্রায় আন্দোলিত। রাজবিনোদিনীর চলনেও ছন্দ, নৃত্যবিভঙ্গ প্রকাশ পাচ্ছে। অপরিমেয় এই সৌন্দর্য যে-কারও ধ্যান ভঙ্গ করতে সক্ষম।
রাজবিনোদিনী প্রমোদকক্ষে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল।
এ কী! আজ আমার প্রমোদগৃহ শূন্য! এ যে অবিশ্বাস্য। আমার কি যৌবন অতিক্রান্ত হয়েছে? কেশপাশে কি দেখা দিয়েছে বার্ধক্যের শ্বেতাভাস! আমার নৃত্য কি আকর্ষণ হারিয়েছে? ছলাকলা কি বিস্মৃত হয়েছি? নাকি অতিথিবৃন্দকে যথেষ্ট পরিচর্যা করা হয়নি? নাকি তারা অপমানিত বোধ করে আমার গৃহ ত্যাগ করেছেন?
