বৎস, আমার ধারণা হচ্ছে তুমি ঠিক মতো ব্রহ্মচর্য পালন করোনি, যথাবিহিত সংযম অবলম্বন করোনি এবং যথার্থ নিষ্ঠাও তোমার ছিল না।
হে ঋষি, আপনি অযথা আমাকে ভর্ৎসনা করছেন। তপোধন, এই সুবিশাল নৈমিষারণ্যে বহু ঋষিই নানা প্রকার তপস্যায় নিয়োজিত রয়েছেন, তারা সকলেই ব্রহ্মজ্ঞানী, তবু মাঝে মাঝেই তারা চরিত্রভ্রষ্ট হয়ে পড়েন বলে শোনা যায়। অথচ ব্রহ্মজ্ঞানী ব্রহ্মই হয়ে যান বলে কথিত আছে, তাই ব্ৰহ্মজ্ঞানীর পতন সম্ভব নয় বলেই আমরা শুনে আসছি। অথচ তাদের মধ্যে অনেকেই কোপন স্বভাববিশিষ্ট, ব্যভিচারী, লোভী, পরশ্রীকাতর, সংকীর্ণমনা, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অহংকারী। তা হলে ব্রহ্মজ্ঞান আমাদের কোন অভীষ্ট সিদ্ধ করে তা আজ্ঞা করুন।
বৎস, তোমার অনাবিল দৃষ্টি এবং সরল অভিব্যক্তির জন্য তোমাকে সাধুবাদ জানাচ্ছি। অপিচ তোমাকে ইহজীবনের কিছু সারসত্যকেও উপলব্ধি করতে হবে। ঋষিরা কেউ সামান্য মানুষ নন। যাঁরা ব্রহ্মজ্ঞানী তারা সাধারণ হবেন কী করে? তুমি তাদের মধ্যে যে সব অবগুণ প্রত্যক্ষ করেছ তাও ভ্রান্তি। প্রয়োজনে প্রত্যেকেই নির্মোক ধারণ করেন মাত্র। বহিরঙ্গের আচরণে তাদের বিচার না করাই ভাল। অন্তরে এঁরা সকলেই নির্বিকার, অচঞ্চল, স্থিতধী, মহাজ্ঞানী মানুষ। একমাত্র পরম শ্রদ্ধার সঙ্গে অনুগমন করলেই এঁদের স্বরূপ বুঝতে পারা যায়। আবার স্বভাবনিন্দুকদের অপপ্রচারও আছে। রটনার বশীভূত হয়ে এঁদের বিচার না করাই ভাল।
তপোধন, আপনি আমার পূজনীয় গুরু। দীর্ঘ পাঁচ বছর আমি আপনার গোধনের পরিচর্যা করেছি, গৃহকর্মে যথাসাধ্য সাহায্য করেছি, সমিধ ও ফলমূল আহরণ করেছি, নিজহাতে আপনার অঙ্গ সংবাহন করেছি, গোধূমাদি চূর্ণ করেছি। আমার সেবায় কোনও ফাঁকি ছিল না। আমার পরিচর্যায় সন্তুষ্ট হয়েই আপনি আমাকে ব্রহ্মজ্ঞান প্রদান করেছিলেন।
বৎস, একথা অতি সত্য। তোমার সেবা ও সৎকর্মে সন্তুষ্ট হয়েই আমি তোমাকে ব্রহ্মজ্ঞানের উপযুক্ত পাত্র বলে স্থিরনিশ্চয় হয়েছিলাম। তোমার অধ্যয়ন ও পঠনপাঠনও সন্তোষজনক ছিল। আমার সিদ্ধান্তে কোনও ভুল ছিল বলে মনে হয় না।
তপোধন, ব্রহ্মজ্ঞানী যেহেতু ত্রিকালদর্শী হয়ে থাকেন তাই তাদের সিদ্ধান্ত নির্ভুল হতে বাধ্য বলে শাস্ত্রের নির্দেশ আছে। তথাপি যদি আপনার ভুল হয়ে থাকে তা হলে ব্রহ্মজ্ঞানকেই সন্দেহ করতে হবে।
বৎস, তুমি আমাকে যে ধিক্কার দিচ্ছ তা প্রতিহত করা আমার উদ্দেশ্য নয়। ব্রহ্মজ্ঞানও সন্দেহাতীতভাবে সত্য। আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই, ব্রহ্মজ্ঞান তোমার অন্তরকে আলোকিত করল না কেন? পুত্র, তুমি আনুপূর্বিক বলল, কিছু গোপন করো না। আমি যোগযুক্ত হয়ে বসছি।
মহাভাগ, আমি এক সামান্য রাজকর্মচারীর পুত্র। আমার পিতা রাজকীয় কোষাগারের রক্ষক। চিরকাল পরধন প্রহরার কাজে নিযুক্ত। প্রত্যহই তিনি শতসহস্র স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা প্রত্যক্ষ করেন। মাসান্তে সামান্য বেতন নিয়ে গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। আমাদের কায়ক্লেশে দিনাতিপাত করতে হয়। পিতা আমাকে উপযুক্ত শিক্ষা প্রদান করতে বদ্ধপরিকর ছিলেন, যাতে আমি বিদ্যাশিক্ষা করে অধ্যাপক বা আরও কোনও সঙ্কর্মে নিযুক্ত হতে পারি। পিতার উদ্দেশ্য পূরণার্থে আমার চেষ্টার অবধি ছিল না। আমি সাতিশয় মেধাবী এবং প্রখর স্মৃতিশক্তির অধিকারী হওয়ায় আমার অধ্যাপক স্বল্পকাল শিক্ষাদানের পরই বললেন, বৎস, তোমাকে আমার আর কিছুই শেখানোর নেই। তুমি সভাপণ্ডিতের শরণাপন্ন হও। সভাপণ্ডিত আমার মেধার পরিচয় পেয়ে চমৎকৃত হয়ে বললেন, শাস্ত্রাদি, ব্যাকরণ ও কাব্য সবই তোমার কণ্ঠস্থ দেখছি। তোমাকে আমি আর কী শেখাব? তুমি কোনও সর্বজ্ঞ পুরুষের সন্ধান করো। নানা পণ্ডিতদের নানা বিধান শুনে শুনে আমি অবশেষে আপনার কাছে উপনীত হই। কিন্তু পিতা, মেধার বড় জ্বালা, মেধা যে সর্বদাই স্বস্তিদায়ক তা নয়। শাস্ত্রাদি আমার কণ্ঠস্থ বটে, কিন্তু হৃদয়স্থ নয়। উপরন্তু জন্মসূত্রে আমি রূপবান ও সুগঠন। মদনবাণে আমি প্রায়শই জর্জরিত হই। নগরের যুবতী নারী, কুলবধূ, কুমারী, বরাঙ্গনা ও বারাঙ্গনা সকলেই আমার প্রতি সহজেই আকর্ষিতা হয়। আমি কৈশোরকাল থেকেই রমণীগমনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। অবৈধ প্রণয়, ব্যাভিচার, বলাকার কোনওটাতেই আমি অপটু নই। আসঙ্গপিপাসা ও তৃপ্তি ব্রহ্মস্বাদসহোদর বলেই শুনেছি। প্রভো, নারীসঙ্গ আমাকে যে আনন্দ দিয়েছে, ব্রহ্মের জ্ঞান যদি তাদৃশও দিত তা হলেও আমার বলার কিছু ছিল না। এখন আপনিই বলুন পিতা, আমার দোষ কী!
পুত্র, অন্যান্য অনেক ঋষি যেমন বিবাহাদি করে থাকেন আমি তেমন নই। চিরকাল ব্রহ্মচর্যই অবলম্বন করে আছি। নারীসঙ্গ আমি কখনও লাভ করিনি। আসঙ্গপিপাসাও বোধ করি না। সুতরাং তোমার অভিজ্ঞতা কীরকম তা আমি অবগত নই।
হে মহর্ষি, নারীদেহে অবগাহন এক আশ্চর্য আনন্দ, রাজা থেকে ভিক্ষাজীবী সকলেই নারীদেহের বশ। নারীর প্রণয়ও এক বিরল অভিজ্ঞতা। আপনি নারীসঙ্গসুখ কখনও উপভোগ করেননি বলে জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় আপনার অগোচর রয়ে গেছে। প্রভু, আপনি মৃদু হাস্য করলেন কেন?
পুত্র, রমণীগমনের অভিজ্ঞতা বিষয়ে তোমাকে বিশেষ আগ্রহী দেখছি। সত্য বটে আমার সেই অভিজ্ঞতা নেই। কিন্তু নারী বিষয়ে আমি অজ্ঞ নই। বিধাতার সৃষ্টি কিছুই উপেক্ষার বস্তু নয়। তার সৃষ্টি সবকিছুই বিশেষ অর্থ বহন করে। নারী বিনা কোনও মহান অবতার পুরুষেরও মানবজন্ম সম্ভব নয়। বৎস, সৃষ্টিতত্ত্বের অনেক নিগূঢ় কথাই আমি তোমাকে বলেছি। তুমি যে-সম্ভোগের কথা বলছ তার এই স্বল্প মূলে তুমি পিছনেও সৃষ্টিরই অনুপ্রেরণা বিদ্যমান। নর ও নারীর বিহিত মিলন শ্রদ্ধারই ব্যাপার।
