কথাটা ঠিক নয়। তার মায়ের সঙ্গে রসিক বাঙালের কখনও-সখনও ঝগড়া হয়। তবে সেটা বেশি দূর গড়ায় না। মা পায়ে-টায়ে ধরে মিটিয়ে ফেলে। মরণের আগে মনে হত, মা রসিক বাঙালকে খুব ভয় পায়। আর শুধু ভয়ই পায়। আজকাল বুঝতে পারে, মা বাঙালকে ভালও বাসে খুব। এইটে মাঝে মাঝে মরণের তেমন পছন্দ হয় না।
বাঙাল উঠোনে দাঁড়িয়েই লুঙ্গি গলিয়ে প্যান্ট, জাঙ্গিয়া ছাড়ল, জামা গেঞ্জি খুলে ফেলল। মা সেগুলো নিয়ে উঠোনের তারে মেলে দিল ঘাম শুকোনোর জন্য। বাঙাল গেল টিউবওয়েলে চান করতে।
বাঙালদের জমির নেশা থাকে বলে শুনেছে মরণ। সেই নেশাতেই একদিন জ্ঞাতিভাই মাখন দত্তের সূত্রে এখানে এসে জমিজিরেত কিনেছিল বাঙাল। ইচ্ছে ছিল এখানেই থাকবে, ডেলি প্যাসেঞ্জারি করে কলকাতার ব্যবসা বজায় রাখবে। কিন্তু বাঙালের বউ শেষ অবধি গাঁয়ে এসে টিকতে পারেনি৷ রসিক তখন ফাঁপড়ে। কে এই জমিজমা, বাড়িঘর দেখে! ভাড়া করা লোক দিয়ে তো আর সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ হয় না। বেচে দিয়ে চলে যাওয়ার পরামর্শই লোকে দিয়েছিল, কিন্তু বাঙালের গোঁ যাবে কোথায়! সে বলল, বেচুম ক্যান? জমির লগ্নির মাইর নাই।
বাঙালের সেইসব গল্প আজও লোকের মুখে মুখে ফেরে। নিজের মায়ের কাছে খানিক, আর খামচা খামচা নানা জনের মুখে শুনেছে মরণ। সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক হল বউ। তাই বাঙাল একদিন ঠিক করে ফেলল, এখানে আর একটা বিয়ে করবে। খুঁজে খুঁজে স্বজাতি স্বঘর গরিবের একটা মেয়েকে পছন্দও করে ফেলল সে। আর তখনই গাঁয়ে বিরাট শোরগোল উঠল। বাঙাল দেশ থেকে এসে একটা লোক গাঁয়ে নষ্টামি করছে। বাঙালকে মারধর করারও চেষ্টা হল। পুলিশ ডাকা হল। সে অনেক ঘটনা।
বাঙাল তখন গিয়ে ধরে পড়ল গৌরহরি চাটুজ্যেকে। মস্ত উকিল, মান্যগণ্য বিচক্ষণ মানুষ। গৌরহরি চাটুজ্যে তলচক্ষুতে খানিকক্ষণ বাঙালকে দেখে নিয়ে নাকি বলেছিল, বুকের পাটা আছে হে!
বুকের পাটা আর টাকা এ দুটো যার থাকে তাকে জব্দ করা কঠিন। গৌরহরি চাটুজ্যে একদিন মিটিং ডেকে সবাইকে বলল, রসিক সাহা একটা মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে বলে তোমরা আপত্তি করছ শুনলাম। আপত্তি ওঠারই কথা। তবে বাপু, রসিক বিয়ে না করে যদি চারটে মেয়েমানুষ রাখত তাহলে তোমরা কী করতে? বড় জোর আড়ালে-আবডালে ফিসফাস গুজগুজ বা নিন্দেমন্দ। তার বেশি কিছু নয়। আমি বলি কী, এ লোক তো বুকের পাটা আছে বলেই বিয়ে করছে। বাইগ্যামির চার্জে যদি ওর বউ ওকে জেলে পাঠায় তো পাঠাবে। সে দায় ওর। তবে বাসন্তী যাতে ফাঁকে না পড়ে তার জন্য রসিক সাহা বাসন্তীর নামে সম্পত্তি লিখে দিতে রাজি আছে। সে ভার আমিই নিচ্ছি।
একজন মাতব্বর বলেছিল, দাদা, আপনি জেনেশুনে এই বে-আইনি কাজকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন?
গৌরহরি বললেন, মানুষের প্রয়োজন বুঝেই বরাবর আইন তৈরি হয়েছে, সেরকমই হওয়া উচিত। মানুষের প্রয়োজনে কাজে না এলে আইন বোঁদা জিনিস। রসিক ফুর্তি করার জন্য তো আর একটা বিয়ে করছে না। তার সম্পত্তি দেখাশোনার জন্যই দ্বিতীয় স্ত্রীর প্রয়োজন। প্রাচীন কালে সামাজিক প্রয়োজনেই মানুষকে এরকম বিয়ে করতে হয়েছে। উদ্দেশ্য খারাপ না হলে আমি অন্তত দোষ দেখছি না।
অনেক গণ্ডগোলের ভিতর দিয়ে বিয়েটা অবশ্য হয়ে গেল। কিন্তু খবরটা কলকাতায় রসিক বাঙালের বাড়িতে পৌঁছোনোর পর হয়েছিল আরও সাংঘাতিক কাণ্ড। বাঙালের বউ দুবার গলায় দড়ি দিতে গেল, থানা-পুলিশ হল, বাঙালকে ধরে নিয়ে গিয়ে ফাটকেও পুরল পুলিশ।
কিন্তু তারপর ধীরে ধীরে কালের নিয়মে উত্তেজনা প্রশমিত হল, রাগের পারদ নেমে গেল। বাঙাল তার দুই সংসারের মধ্যে ভাগ হয়ে দিব্যি চলতে শিখল।
কলকাতার মা বা বড়মা কেমন তা অবশ্য জানে না মরণ। তার একটা দাদা আর একটা দিদিও আছে। তাদের কখনও দেখেনি সে। কিন্তু সে মাঝে মাঝে খুব ঝুম হয়ে বসে তাদের কথা ভাবতে চেষ্টা করে। দেখা হলে তারা কি মরণকে দুর-দুর ছাই-ছাই করবে? করবে বোধহয়। কিন্তু মরণের মনে হয়, তারা বোধহয় তার খুব পর-মানুষ নয়। বাঙাল কাঠখোট্টা লোক, কলকাতার বাড়ির কথা বিশেষ তার মুখে শোনা যায় না। তবে মাঝে মাঝে যে ও বাড়িতে খুব ঝগড়া হয় তা টের পায় তারা, যখন বাঙাল মুখ গোমড়া করে অসময়ে এসে হাজির হয়।
মায়ের ওপর রাগ করে মরণ কখনও কখনও বলে, আমি একদিন বড়মার কাছে, দাদা দিদির কাছে চলে যাব।
মা বলে, যা না, তা-ই যা, গিয়ে বুঝবি কত ধানে কত চাল। গালভরে আবার বড়মা বলা হচ্ছে। গিয়ে বুঝবি পেটে ধরা মা আর ডাকের মায়ের তফাত কী।
তফাত বোঝার মতো বয়স হয়নি মরণের। কিন্তু কলকাতার বাড়ি, বড়মা, দাদা বা দিদি সম্পর্কে তার একটা রূপকথার মতো কুহক আছে। তারা হয়তো খুব সুন্দর মানুষ, বাড়িটা হয়তো রাজপ্রাসাদের মতো। তারা হয়তো দুরছাই করবে না তাকে।
বাঙাল বারান্দায় বসে ভাত খেল। তারপর জামা-প্যান্ট পরে রওনা হওয়ার সময় বলল, তা হইলে আসি গিয়া।
এসো। তাড়াতাড়ি ফিরবে কিন্তু?
হ। দুর্গা দুর্গা।
দুর্গা দুর্গা।
বাঙাল চলে গেল। মরণ ঘর থেকে বেরিয়ে লাফ দিয়ে উঠোনে নেমে হোঃ হোঃ করে দু হাত ওপরে তুলে দু চক্কর নেচে নিল।
মা ভ্রূ কুঁচকে বলে, ও মা! অমন করছিস কেন?
