লড়াইটা করতে গিয়ে তার ঘুমের বারোটা বাজল। মাথা গরম হয়ে যাওয়ায় সে উঠে ওডহাউসের একটা উপন্যাস পড়ার চেষ্টা করল কিছুক্ষণ। তারপর সেটা রেখে একটা থ্রিলার খুলে বসল। তাতেও মন লাগল না দেখে কম্পিউটারে একটা গেম খেলল কিছুক্ষণ। আর খেলতে খেলতেই হঠাৎ ভারী অবাক হয়ে সে মৃদু খুব মৃদু একটা সুবাস পেল নাকে।
কোথা থেকে সুন্দর মৃদু গন্ধটা আসছে? সে এদিক ওদিক তাকাল। সন্দেহজনক কিছু দেখা গেল না কোথাও। গন্ধটা এতই মৃদু যে, আছে না নেই তা নিয়েই খানিকটা ধন্দে পড়তে হয়।
হঠাৎ মনে পড়ল ওরা দুই বান্ধবী যখন ঘরে ঢুকেছিল তখনই গন্ধটা পেয়েছিল সে। তখন খেয়াল করেনি। এরকম গন্ধ পান্না মাখে না। এ গন্ধ আটলান্টিকের ওপারের গন্ধ।
এমনিতেই বিজু খুব ভোরে ঘুম থেকে ওঠে। একটু ধ্যান করে। তারপর দৌড়তে বেরোয়। এসব তার অনেক দিনের অভ্যাস। স্বামী বিবেকানন্দ তার এক সময়ে আদর্শ ছিল। আজকাল আর ততটা কঠোরভাবে সব দিক বজায় রাখতে পারে না। তবু অভ্যাসটা এখনও আছে।
শেষ রাতে ঘুমিয়েও ঠিক পাঁচটাতেই ঘুম ভাঙল আজও। প্রচণ্ড শীত। বাইরে এখনও অন্ধকার। শরীরটা ম্যাজম্যাজ করছে। তবু উঠে অভ্যাসমতো ধ্যান করতে বসে গেল সে। আর কী আশ্চর্য! ধ্যানের শুরুতেই সোহাগের মুখ দপ করে ভেসে উঠল আজ্ঞাচক্রে। কী গেরো রে বাবা!
ফের লড়াই। এবং সোহাগের প্রস্থান।
গায়ে পুলওভার চাপিয়ে, জার্সি এবং জুতো মোজা পরে দৌড়তে বেরিয়ে পড়ল বিজু। আজ সে পাগলের মতো দৌড়াল। যেন নিজের কাছ থেকে পালানোর চেষ্টা, চেষ্টা যে ফলবতী হচ্ছে, এমনটা তার মনে হল না। গাঁয়ের নির্জন রাস্তায় তাকে তাড়া করছে নারীচিন্তা, যৌবনের জ্বালা, পতনের আহ্বান। সে হাঁপিয়ে পড়ছিল আজ। ঘুমহীনতার ক্লান্তিই হবে বোধহয়।
দৌড়তে দৌড়তে হঠাৎ একটা কথা মনে পড়ায় সে বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে পড়ল। আজ রবিবার। রবিবার সকালে যে সে দৌড়োয় না। সপ্তাহে একদিন বিশ্রাম নেয়। কথাটা একদম খেয়াল ছিল না তার। এত অন্যমনস্কতা তো ভাল নয়! কেন এরকম হচ্ছে? কেন হবে?
আজ তার ব্যায়াম করার কথা নয়। তবু ঘরে ফিরে সে রোজকার মতো ব্যায়াম সারল। গা ঘেমে গিয়েছিল শীতের মধ্যেও। তোয়ালে দিয়ে গা মুছে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে স্নান সেরে নিল ঠান্ডা জলে। মনের অস্থির চঞ্চল ভাবটা কিছুতেই যেতে চাইছে না। বড্ড ক্লান্ত করে দিচ্ছে তাকে। সে এরকম নয়। সে এরকম হতে চায়নি কখনও। এর পর থেকে দেখা হলেই সে সোহাগের সঙ্গে ইচ্ছে করেই খারাপ ব্যবহার করবে। পাত্তা দেবে না। তেমন হলে অপমানও করবে। সবচেয়ে ভাল অবশ্য দেখাই না হওয়া। কিন্তু ওরা আজকাল নিয়মিত প্রতি উইক এন্ডে গাঁয়ে আসে। তা হলে বিজু শনি আর রবিবার গাঁ থেকে গায়েব হয়ে যাবে?
কী করা উচিত সে বুঝতে পারছিল না। তবে এই ফেজটা কেটে যাবে বলেই তার মনে হয়। সে শক্ত মনের ছেলে। সে বিবেকানন্দের ভাবশিষ্য। তাকে একটা ন্যাকা খুকি যদি নাকে দড়ি পরিয়ে ঘোরায় তা হলে এই লজ্জা সে রাখবে কোথায়?
রবিবার সকালটায় সে বড়মার কাছে জলখাবার খেতে যায়। এটা প্রায় নিয়মেই দাঁড়িয়ে গেছে। রবিবার বড়মার বাড়িতে কড়াইশুটির কচুরি, না হয় লুচি বা পরোটা কিছু একটা হবেই। বড়মা অপেক্ষাও করে থাকে।
আজ তাকে দেখেই বলাকা বলল, তোর মুখটা অমন শুকনো কেন রে?
আর বোলো না। রাতে ঘুম হয়নি।
ওমা! ঘুম হয়নি কেন?
বায়ু চড়া হয়ে গিয়েছিল।
বলাকা হাসল, তোর জ্যাঠারও হত মাঝে মাঝে। গোলমেলে মামলা নিয়ে পড়লে মাঝে মাঝে রাতে ঘুম হত না। তখন আমাকে ঠেলে জাগিয়ে নিত।
কেন?
গল্প করবে বলে। ও মানুষটা তো ওরকম ধারাই। আমার সঙ্গে যত কথা ছিল তার। সব কথা আমাকেই বলত।
তোমাদের দারুণ প্রেম ছিল বড়মা।
সে কি আর তোদের মত ফচকে প্রেম রে? ওটা অন্য জিনিস। সে আর আমি ছিলুম যেন একই দেহের সত্তা। কিংবা কে জানে বাবা ভুলভাল বললুম কি না।
যা-ই বলো, বুঝে নিয়েছি।
.
৬২.
গুরু বললেন, ওহে শিষ্য।
শিষ্য বলল, আজ্ঞা করুন গুরুদেব।
বলি, তোমাকে যে চারিপাদ ব্রহ্মজ্ঞান দিলাম তা কি হৃদয়ঙ্গম হয়েছে?
আজ্ঞে গুরুদেব, হয়েছে।
হয়ে থাকলে তোমার মুখমণ্ডলে ব্রহ্মজ্ঞানের দীপ্তি প্রকাশ পাচ্ছে না কেন? বলো তো কী বুঝেছ, ব্রহ্ম ব্যাপারটা কী?
আজ্ঞে গুরুদেব, ব্ৰহ্ম হচ্ছে হাওয়ার নাড়ু।
বৎস, সেটা কী বস্তু।
হাওয়া দিয়ে নাড়ু পাকালে যা হয় আর কী। পুরোটাই ফক্কিকারি।
বৎস, তুমি যে ব্রহ্মকে একেবারে বোঝানি তা নয়। ব্ৰহ্ম অনেকটা এরকমই বটে। কিন্তু আগে কহো আর।
যদি অভয় দেন তো বলি।
ভীত হওয়ার কিছু নেই বৎস। নির্ভয়ে বলল।
আজ্ঞে ব্ৰহ্ম-ট্রহ্ম কিছু নেই। ব্রহ্মের আকার নেই, প্রকার নেই, গুণ নেই, বাক্য বা মন দিয়ে তার হদিশ মেলে না। সুতরাং ও বস্তুর থাকাও যা, না-থাকাও তাই। ব্ৰহ্ম হচ্ছে কিছু মানুষের অলীক কল্পনা। ব্রহ্ম আমাদের কোনও কাজে লাগে না, ব্ৰহ্ম ব্যবহারযোগ্য নয়, সুতরাং তার জ্ঞানেও আমাদের কোনও প্রয়োজন নেই।
বৎস, তা হলে গত পাঁচ বছর ধরে তুমি আমার সন্নিধানে কায়ক্লেশে অবস্থান এবং সাধনাদি করলে কেন? তোমার উদ্দেশ্য কী?
ব্ৰহ্মসাধনই আমার উদ্দেশ্য ছিল বটে, কিন্তু হে আচার্য, সাধনা করতে গিয়েই ধীরে ধীরে এই সাধনার নিরর্থকতাও আমি হৃদয়ঙ্গম করেছি। ব্ৰহ্ম আছেন এটাও যেমন জ্ঞান, ব্রহ্ম নেই এটাও তেমনই জ্ঞান। সাধনা করে আমি বুঝতে পেরেছি ব্ৰহ্ম-ট্রহ্ম কিছু নেই। এই নেতিবাচক জ্ঞানটির জন্যই সাধনার প্রয়োজন ছিল।
