মোটা হলে ভাল হত বুঝি? মেয়েরা যত মোটা হবে ততই রোগের আকর হবে। সেদিন এক ডাক্তার তো বলে গেল, আমার নাকি কোনও রোগই নেই।
রোগা হয়ে ভালই আছেন বউঠান। এরকমই ভাল।
ভাল থাকতে কে চায় বলুন তো! বেঁচে থাকার মতো এমন একঘেয়ে জিনিস আর হয় না। উনি যতদিন ছিলেন কিছুই খারাপ লাগত না। এখন প্রতিদিন সকালে মনে হয়, দিনটা কেমন করে কাটবে। কতদিন যে বেঁচে থাকতে হবে তাই ভেবেই ভয় করে।
মহিম একটু হেসে বলল, বেঁচে কি আপনি আছেন বউঠান? যেদিন গৌরদা মারা গেলেন সেদিন আপনি সহমরণে যেতে চেয়েছিলেন, আমার মনে আছে। সেদিনই বুঝেছিলাম গৌরদার সঙ্গে আপনার শরীরটা না গেলেও সত্তাটা সহমরণেই গেছে। আনন্দে আমার চোখে জল এসেছিল।
এখন চুপ করুন তো, অত কথা বলতে হবে না। ওষুধপত্র কিছু খেয়েছেন?
না। ডাক্তার বলে গেছে ওষুধের তেমন দরকার নেই। হাঁটাহাঁটি করলেই হবে।
আমি আপনাকে চিনি ঠাকুরপো। আপনি অ্যালোপ্যাথি করতে ভয় পান।
তা একটু পাই।
কিন্তু পুরনো অভ্যাস আঁকড়ে থাকলে তো চলবে না। মাথা ঘোরাটা না কমালে অচল হয়ে পড়বেন যে।
মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, অচল হওয়াতেই তো ভয। মৃত্যুটা তো ভয়াবহ নয়, ভোগান্তিই আসল ভয়ের জিনিস।
তা হলে ওষুধ আনিয়ে আজ থেকেই খান।
বলাকা বেশিক্ষণ বসলেন না। বললেন, একা সংসার আগলানো যে কী বন্ধন তা কী আর বলব। উনি যে কী অচলায়তনের সঙ্গে জুতে রেখে গেলেন আমাকে। ওই রাক্ষুসে বাড়ি যেন সারাদিন আমাকে গিলতে আসে। হ্যাঁ, ঠাকুরপো, মানুষ এমন বিষয় সম্পত্তির জন্য হেদিয়ে মরে কেন বলতে পারেন? আমার কোন কাজে লাগছে বলুন তো বিষয়-আশয়? ছেলেমেয়ে কেউ কাছে থাকে না, কারও ভোগে লাগে না। কী যে জ্বালা!
মহিম ম্লান হেসে বলে, সব জানি বউঠান। গৌরদা তো বলতেন, দ্যাখ মহিম, এই যে বিষয় সম্পত্তি তিল তিল করে করলাম, এ আবার তিন মিনিটে উড়িয়েও দিতে পারি। তবে না পুরুষ!
তিনি পুরুষ ছিলেন, আমি তো তা নই। আমি তো তিন মিনিটে ওড়াতে পারব না। বড় জ্বলছি ভাই।
বলাকা উঠে বড়বউয়ের সঙ্গে একটু বাড়িঘর ঘুরে দেখল। যাওয়ার সময় বলল, ভাল থাকবেন আর বেঁচে থাকবেন। বুঝলেন?
এটা কি আশীর্বাদ বউঠান?
আপনি বয়সে বড় না? আপনাকে কি আশীর্বাদ করতে পারি?
দেবীরা পারেন। সে যাক, সহজে মরব বলে মনে হয় না বউঠান। ভাববেন না।
বলাকা চলে যাওয়ার পর সন্ধ্যা এসে বলল, চলো তো বাবা, এবার ঘরে গিয়ে একটু শুয়ে থাকবে।
কেন রে, আমাকে রুগি বানাতে চাস কেন? বেশ তো খোলামেলায় বসে আছি। আমার ভালই লাগছে তো।
চোখমুখ তো সে কথা বলছে না। দেখে মনে হচ্ছে ভারী ক্লান্ত আর দুর্বল হয়ে পড়েছ।
ও তোর মনের ভুল। তেমন খারাপ লাগছে না। বরং একটু কফি করে দে, রোদে বসে খাই। কফি বড্ড ভাল জিনিস। শরীর চনমনে করে দেয়।
ভাল না ছাই। ওটা খেয়েই তো এরকমটা হল তোমার।
দুর পাগলি। তোর শাসনেই আমি কাহিল হয়ে পড়ব।
এইসব কথাবার্তার মাঝখানেই উঠোনের বড় আগলটার কাছ ঘেঁষে নিঃশব্দে অমলের ঝকঝকে গাড়িটা এসে থামল।
মহিম ভারী খুশি হয়ে বলল, ওই তো ওরা এসে গেছে!
খাড়া হতে গিয়ে মাথাটা ফের টলোমলো হল মহিমের। সভয়ে মাথাটা পিছনে হেলিয়ে ইজিচেয়ারে চেপে ধরে রইল সে। কী যে হল মাথায় কে জানে বাবা।
প্রথমেই নেমে দৌড়ে এল সোহাগ। হাঁটু গেড়ে বসে মহিমের হাঁটুর ওপর হাতের ভর দিয়ে মুখের দিকে চেয়ে বলল, কী হয়েছে তোমার?
কিছু হয়নি রে তেমন। মাথাটা কাল থেকে বড্ড ঘুরপাক খাচ্ছে দিদি।
জেঠু ফোনে বলেছে স্ট্রোক। সেই থেকে আমার কী মনখারাপ।
আরে না। স্ট্রোক নয়। কমল ভয় পেয়ে বলেছে।
মহিম তার দুর্বল চোখে চেয়ে দেখল তার সামনে যেন ঝলমল করছে চারটে মানুষ। অমল, মোনা, সোহাগ আর বুডঢা। কিছু কাল আগেও বড্ড ম্লান, মলিন, দড়কচা মেরে ছিল ওরা। কোন মন্ত্রে যেন আরোগ্য হয়েছে। সংসারে তো জোয়ার ভাঁটার বিরাম নেই। মাঝখানে তো অমল আর মোনার ডিভোর্সের কথা চলছিল। আজ ওদের দেখে বুকটা ভরে গেল মহিমের। জীবনের শেষ রাউন্ডে এরকম ছোটোখাটো কিছু আনন্দ পাওয়াই তো অনেক পাওয়া।
অমল রাগ করে বলল, দাদা এমনভাবে খবরটা দিয়েছে যে আমি তো ভাবলাম সকালে এলে আর তোমাকে দেখতেই পাব না। এত ভয় পেয়েছিলাম।
মহিম হেসে বলল, ওর দোষ কী? ঘটনাটা এমন অতি নাটকীয়ভাবে ঘটল যে ওরা ভেবেছিল গুরুতর কিছু। ডাক্তার এসে দেখে-টেখে বলল তেমন কিছু নয়। হার্ট ভাল আছে, লাংস ক্লিয়ার।
যে যাই হোক, এবার কলকাতায় চলো তো আমার সঙ্গে। ভাল করে চেক আপ করিয়ে দেব।
মহিম হেসে বলে, আগেই উতলা হওয়ার কী আছে। ডাক্তারবাবুটি বেশ ভাল, বিবেচক। মস্ত বিলিতি ডিগ্রি আছে। এরও চিকিৎসা খারাপ নয়। সামান্য ব্যাপার হলে টানা হ্যাঁচড়ার দরকার কী?
মোনার হাতে প্লাস্টিকের ব্যাগে ফলের ঠোঙা।
আপনার জন্য এনেছি।
ভারী আপ্যায়িত হয়ে মহিম বলল, বাঃ! কত কী এনেছ?
শরীরটা তো একটু শুকিয়েছে দেখতে পাচ্ছি।
এই বয়সে একটু শুকোনোই ভাল বউমা। হালকা পলকা থাকলে রোগ বালাই কম হয়। তোমরা যাও, বিশ্রাম করোগে। এতটা পথ গাড়িতে এসেছ।
শুধু সোহাগ রইল কাছে। দাদুর হাঁটুতে হাত রেখে নিলডাউন হয়ে বসে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে রইল মুখের দিকে। চোখ দুখানা করুণ।
