কেন রে দিদি, অমন করে চেয়ে আছিস? এত সহজে মরব না রে। ভয় পাস না।
সোহাগ অনেকক্ষণ চুপচাপ চেয়ে থেকে হঠাৎ অদ্ভুত একটা কথা বলল, তুমি এতদিন কোথায় ছিলে দাদু? তোমাকে তো ভাল করে চিনতামই না।
মহিম হেসে বলল, সাহেবদের দেশে থাকলে ওরকমই তো হয়। আর সেইজন্যই আমার ওসব দেশ ভারী অপছন্দ। ওরা রক্তের টানটা মানেই না।
সন্ধ্যা কফি করে নিয়ে এসে বলল, এই মেয়ে, আমার ঘরে চল তো। সকালে কিছু খেয়েছিস? মুখটা তো শুকিয়ে গেছে।
খেয়েছি। টোস্ট আর দুধ।
দুর; সে তো কখন হজম হয়ে গেছে। আমার ঘরে আয়, তোকে চন্দ্রপুলি খাওয়াব।
চলো, বলে উঠে গেল সোহাগ।
মহিম চুপচাপ একা বসে রইল কিছুক্ষণ। সংসারের নানা কাজের শব্দ-সাড়া পাওয়া যাচ্ছে এখানে বসে। রোদটা মুখে লাগছে বড়। গাছের ছায়া সরে যাচ্ছে আস্তে আস্তে।
কফিটা শেষ করে খুব সাবধানে ধীরে ধীরে মাথাটা তুলল মহিম। না, ঘুরছে না তো!
খুব সাবধানে উঠে দাঁড়াল সে। না, ঘুরছে না এখনও। বিশ্বজয়ীর মতো একটা হাসি ফুটল তার মুখে। ধীরে ধীরে হেঁটে সামান্য কয়েক পা হেঁটে নিজের ঘরের দরজায় উঠল সে৷ এখন এইসব ছোটোখাটো অ্যাচিভমেন্টে যুদ্ধজয়ের আনন্দ।
শুয়ে থাকা ব্যাপারটা ভারী অপছন্দ মহিমের। বিছানা জায়গাটা তার কোনওকালেই প্রিয় নয়। সে তাই শুল না। একখানা হোমিওপ্যাথির বই নিয়ে জানালার পাশে চেয়ারে বসল। সন্ধ্যার ঘর থেকে পিসি-ভাইঝির কলকলানি আর হাসির শব্দ আসছে খুব।
মহিম একটু তৃপ্তির হাসি হাসল।
.
সন্ধেবেলা কম্পিউটার নিয়ে বসেছিল বিজু। অখণ্ড মনোযাগে ই-মেল চেক করছে।
দরজার কাছ থেকে মিহি মেয়েলি গলা এল, ও বিজুদা, তোমার কি ইন্টারনেট কানেকশন আছে?
বিজু ভ্রূ কুঁচকে দরজার দিকে চোখ ফিরিয়ে পান্নাকে দেখে বলল, কেন রে বাঁদর, তোর সে খবরে দরকার কী? কতবার তো বলেছি কম্পিউউটার শিখতে, কথা শুনেছিস?
আহা, শেখার সময় বুঝি চলে গেছে!
গেছে নয়, যাচ্ছে। আজকাল বাচ্চা ছেলে মেয়েরাও কম্পিউটার জানে। তোর তো ওইজন্যই ভাল পাত্র জুটছে না। যখনই পাত্রপক্ষ জানবে যে তুই একটা কম্পিউটার-মূর্খ তখনই সম্বন্ধ বাতিল করে দেবে।
আহা, আজ তো আমি কম্পিউটার শিখতেই এসেছি।
তাই বুঝি? আজ বোধহয় পশ্চিমে সূর্য উঠেছে।
তা বলে তোমার কাছে নয়।
তবে কার কাছে?
আমি তাকে সঙ্গে নিয়েই এসেছি।
৬১-৬৫. পান্নার পিছনে সোহাগ
৬১.
পান্নার পিছনে সোহাগকে দেখে ভারী অবাক হল বিজু। মেয়েটা তাকে পছন্দ করে না। কয়েকবার বিজুকে বেশ অপমানও করেছে। একটু খেপা গোছের আছে। কখন কী রকম রি-অ্যাক্ট করবে তার ঠিক নেই। আনপ্রেডিকটেবল মেয়েটিকে সে একটু ভয় পায়। কিন্তু সেটা তো আর প্রকাশ করা চলে না। সে বলল, আরে, এসো তোমরা।
ঘরে ঢুকে সোহাগ নিঃশব্দে চারদিক খুব কৌতূহলী চোখে চেয়ে দেখছিল। বিজু শৌখিন মানুষ। তার ঘরে খুব আধুনিক মিউজিক সিস্টেম, রঙিন টি ভি ইত্যাদি আছে। খাট, আলমারি, টেবিল, বইয়ের র্যাক, ক্যাবিনেট সবই খুব বাছাই ম্যাট ফিনিশ দামি কাঠের তৈরি।
পান্না বলল, সোহাগ আমাকে একটু কম্পিউটার শেখালে তোমার আপত্তি নেই তো।
না, আপত্তি কীসের?
তুমি কম্পিউটারে কোনও কাজ করছিলে নাকি?
না না, তেমন কিছু নয়। তোরা বোস না। আমি বরং একটু ঘুরে আসছি।
যাঃ, তুমি না থাকলে মজাটাই হবে না।
কেন, তুই তো কম্পিউটার শেখার মাস্টারমশাইকে সঙ্গেই নিয়ে এসেছিস। আমি তো আর কম্পিউটার এক্সপার্ট নই। শুধু আমার কাজটুকু করে নিতে পারি।
সোহাগ কম্পিউটারের সামনে বসে যন্ত্রটার চাবি টিপে স্পেসিফিকেশন দেখে মৃদু স্বরে বলল, মডেলটা আপডেট করা দরকার। বেশ স্লো।
বিজু বলল, জানি। তবে আমার তো বেশি সফিস্টিকেটেড জিনিসের দরকার হয় না। কিছু নথিপত্র লোড করে রাখি। বেশির ভাগ সময়েই এটা ব্যবহার করা হয় টাইপরাইটার হিসেবে। আর ইন্টারনেট, তবে নেটওয়ার্ক সিগন্যাল এখানে খুব উইক।
সোহাগ একটু হাসল। আর কিছু বলল না, কিছুক্ষণ মগ্ন হয়ে নানা চাবি টিপে টিপে অনেক কিছু দেখে নিয়ে পান্নাকে বলল, এতে তোমার শেখার কাজ চলে যাবে। তোমার দাদা বোধহয় ই-মেল চেক করেছিলেন, আমরা এসে ডিস্টার্ব করলাম।
বিজু বলল, আরে দুর দুর। ই-মেল আসে নাকি আমার। বেশির ভাগই জাঙ্ক মেল। দু-চারটে কাজের মেল আসে। চেক করা হয়ে গেছে। তোমরা এখন ব্যবহার করতে পারো।
আপনি বসুন না। আমি এসেছি বলেই যদি আপনি চলে যান তা হলে আমার খুব খারাপ লাগবে।
সন্ধেবেলা কি আমি বাড়িতে বসে থাকি নাকি? ক্লাবে ব্যাডমিন্টন খেলতে যাই। তারপর নাটকের রিহার্সাল আছে।
পান্না বলল, আচ্ছা, আজ না হয় আমাদের অনারে একটু বসলেই বাবা। রোজই তো ওসব আছে।
আরে আজ শনিবার। অনেকে আসবে। যারা কলকাতায় থাকে তারা উইক এন্ডে চলে আসে যে।
একদিন না হয় একটু আমাদের সঙ্গেই আড্ডা মারলে।
আড্ডা মারতে তো আসিসনি। এসেছিস তো কম্পিউটার শিখতে।
কম্পিউটার তো আর পালাচ্ছে না। পালাচ্ছ তুমি। চুপ করে বোসো তো ওই সোফাটায়।
বিজু বসল। তবে অস্বস্তি নিয়ে। সোহাগ মেয়েটাকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। এই বেশ মিষ্টি করে কথা বলল, আবার কোন কথায় পালটি খাবে তার ঠিক নেই।
কম্পিউটারে মগ্ন সোহাগ একবার হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকে দেখল, তারপর চোখ ঘুরিয়ে নিল। মেয়েদের চোখের ভাষা পড়বার মতো অভিজ্ঞতা বিজুর নেই। তার বান্ধবী-টান্ধবী নেই। প্রেমিকা নেই, নেই বলে দুঃখও নেই কিছু। তবে মেয়েদের ব্যাপারে অভিজ্ঞতা কম থাকায় কখনও-সখনও একটু অসুবিধেয় পড়তে হয়। এই যেমন এখন। ওই যে সোহাগ একবার তাকাল এটা অর্থহীন না অর্থপূর্ণ তা অনুমান করা তার অসাধ্য। শুধু মনে হল, আর যাই হোক তাকানোটা অন্তত হোস্টাইল নয়।
