ওই যে বললুম, বায়ু।
থাক আর নিজের ডাক্তারি নিজে করতে হবে না। তুমি ছাড়া আমার আর কে আছে বলো তো। তোমার কিছু হলে আমার যে কী হবে।
এ কথায় মহিমের বুকের ভিতরটায় যেন একটা মন্থন শুরু হল। তার এই মেয়েটা যে কত অসহায় তা মহিম জানে। ভাগ্য ভাল যে নিজের আর্থিক সংগতিটা নিজেই করে রেখেছে। কাজকর্ম নিয়ে সংসার ধর্মের অভাব ভুলে আছে। কিন্তু এ তো খেলনা, চুষিকাঠি। মেয়েদের রক্তের ভিতরে তো অন্য স্বপ্ন থাকে। যতই জজ ব্যারিস্টার হোক, তার মাতৃত্বে হাহাকার থাকলে সব ছাইমাটি হয়। আজকালকার মেয়েরা হয়তো বুঝতে চাইবে না। কিন্তু সত্যকে আর কত ঢাকাঁচাপা দিয়ে রাখা যাবে?
মহিম মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল, ওসব ভাবছিস কেন? দুনিয়ায় কারও জন্য কিছু আটকে থাকে না।
ওরকম বোলো না। আজ আমি বড্ড ভয় পেয়েছি।
ভাবিস না। শরীর আমার ভালই আছে।
পায়ের কাছ থেকে মুকুল বলল, ও দাদু, টক করে রাত আটটার সিরিয়ালটা দেখে আসব?
দেখে আয়। আর পায়ে সেঁক দিতে হবে না তোকে। পা গরম হয়ে গেছে।
আধঘণ্টা বাদেই ফের আসব।
আসিস।
হ্যাঁ দাদু, মা জানতে চাইল রাতে কী খাবে?
আজ কিছু না খাওয়াই ভাল।
সন্ধ্যা বলে, না বাবা, শরীর দুর্বল হবে। বরং দুধ-খৈ খেও।
তাই পাঠিয়ে দিতে বলিস।
বলে একটু চোখ বুজল মহিম। মাথা ঘোরার ভাবটা একটু আছে। মাথা নাড়া দিলেই টলটলে একটা ভাব। ঘর দুলে উঠছে। বয়স আশির চৌকাঠ ডিঙিয়েছে। এখন কত কী হতে পারে। বেসুর বাজতে লেগেছে।
রাতে গভীর ঘুম হল মহিমের। সকালবেলা সূর্যাস্তের কিছু আগে ঘুম ভাঙল। পুব আকাশ সবে ফর্সা হতে লেগেছে। মহিম রোজ অন্ধকার থাকতে ওঠে। আজ দেরিই হল।
খুব সাবধানে পাশ ফিরে কাত হয়ে হাতের ভর দিয়ে মাথাটা তুলল সে। প্রথমটায় মনে হল, ঠিক আছে। কিন্তু আর একটু খাড়া হয়ে বসতে যেতেই মাথাটায় এমন চক্কর দিল যে মহিম ধপ করে বালিশে ক্লান্ত মাথাটা ফেলে হাঁফাতে লাগল। কী মুশকিল। সকালে প্রাতঃকৃত্য আছে, পুজোপাঠ আছে। এরকম হলে কী করে চলবে?
সন্ধ্যা পাশেই ক্যাম্পখাটে শুয়ে আছে। একবার ভাবল, সন্ধ্যাকে ডাকবে। তারপর ভাবল, এই অবস্থায় ওকে ডেকেই বা কী হবে! কিছু তো করতে পারবে না। বরং চেঁচিয়ে-মেচিয়ে লোক জড়ো করবে।
তার চেয়ে শুয়ে থাকাই ভাল।
মনে পড়ছিল এই মাথা ঘোরার ব্যামো ছিল তার মায়ের। আর সেই ব্যায়ো নিয়েই মা মরে মরে ঘর-সংসারের কাজ করত। মাঝে মাঝে বাড়াবাড়ি হলে শয্যা নিয়ে পড়ে থাকত। চিকিৎসা বলতে মাথায় ভেজা গামছা চেপে রাখা। স্পন্ডেলাইটিসই হবে বোধহয়। তখন তো লোকে এত জানত না।
বেশ একটু বেলার দিকে মহিম উঠতে পারল। মাথা ঘুরছে বটে তবে সওয়া যাবে। পুজোর ফুল সন্ধ্যাই তুলে দিয়ে গেল। মহিম পুজোপাঠ সেরে রোদে ইজিচেয়ারে বসে রইল ক্লান্ত শরীরে।
বসে ঘুমিয়েই পড়েছিল বোধহয়।
ঘুম ভাঙল সন্ধ্যার চেঁচানিতে, ওম্মা গো, কে এসেছে দ্যাখোসে সব। এতদিনে মনে পড়ল আমাদের, ও জ্যাঠাইমা।
মহিম চমকে চোখ মেলে যাকে দেখল তাকে প্রথম যেন মতের মানবী বলে মনেই হল না তার। শ্বেত শুভ্র বসনে এ যেন শ্বেতপাথরের দেবীপ্রতিমা। বলাকা কদাচিৎ কারও বাড়িতে যান। পাড়া বেড়ানোর অভ্যাস কোনওকালে ছিল না বলাকার, গাঁয়ের মেয়েদের মতো কূটকচালিও করেননি কখনও। আর সেই জন্যই সারা গাঁয়ে এই মহিলার প্রতি প্রত্যেকের ভীতিমিশ্রিত সম্ভ্রমের ভাব আছে।
একবার–জীবনে মাত্র একবার, বহুকাল আগে এক বৈশাখী ঝড়ের দিনে আমবাগানে কিশোরীরবধূ বলাকার প্রতি কামভাব বোধ করেছিল মহিম। সেটা বয়সের দোষ। অমন সুন্দরীর প্রতি কোন পুরুষ না আকর্ষণ বোধ করবে? কিন্তু মহিলা তো মানবী নন, দেবী। চোখ দেখেই কিছু টের পেয়ে এক ছুটে পালিয়ে গিয়েছিলেন বাড়ির ভিতরে। ওই একবারই। তার পর থেকে মহিম এই মহিলাকে সর্বদাই শ্রদ্ধা করে এসেছে। একটু ভয় পেয়েছে।
বউঠান! বলে তড়িঘড়ি উঠতে যেতেই মাথার শত্রুতায় ফের এলিয়ে পড়তে হল মহিমকে।
উঠবেন না। চুপ করে বসে থাকুন তো। বলে বলাকা সন্ধ্যার এগিয়ে দেওয়া কাঠের চেয়ারটায় বসে বলল, আজ সকালে খবর পেয়েই ছুটে এসেছি। কী হয়েছে আপনার?
মহিম ম্লান হেসে বলে, গুরুতর কিছু নয় বোধহয়, ডাক্তার ভরসা দিয়ে গেছে। স্পন্ডেলাইটিস বলে সন্দেহ।
ওসব আজকাল সকলের মুখেই শুনি। রোগটা কী?
ঘাড়ের হাড়ে গোলমাল। তাই থেকে নার্ভের দোষ।
যাক বাবা, সিরিয়াস কিছু না হলেই হয়। আমাদের বয়সিরা তো সব একে একে চলে যাচ্ছে। তাই খবরটা পেয়েই খুব চিন্তা হয়েছিল। কর্তা তো মহিম বলতে অজ্ঞান হতেন।
মহিম ভারী খুশির হাসি হাসল। বলল, দাদা আর আমি ছিলুম হরিহরাত্মা, ছায়া হয়ে ঘুরতুম পিছনে পিছনে। উনি গিয়ে অবধি আমার ভারী একা লাগে বউঠান।
তা জানি। দুজনের বন্ধুত্ব তো দেখেছি।
বলাকা এসেছেন খবর পেয়ে বাড়ির সবাই এসে ঘিরে ফেলল। এটা একটা ঘটনাই বটে। বলাকাকে গাঁয়ের অন্য কোনও বাড়িতে যেতে দেখে না কেউ। এই আসাটা তাই এ বাড়ির পক্ষে একরকম একটা গৌরবজনক ঘটনাই। গৌরহরি যেমন তেজি মানুষ ছিলেন, বলাকাও তেমনি তেজস্বিনী।
বলাকার গায়ে একটা দামি কাশ্মীরি শাল। কী মুখ চোখ, কী গায়ের রঙের জেল্লা। বাড়ি যেন আলো হয়ে গেল।
মহিম কৃশ, দীপশিখার মতো নারীমূর্তির দিকে চেয়ে থেকে বলল, আপনি রোগা হয়ে গেছেন বউঠান।
