মহিম বলল, থোড়ের রস খেলে প্রেশারের উপকার হয় শুনেছি।
অনল ডাক্তার ভারী সুন্দর করে হেসে বলল, টোটকাতে কাজ হতে পারে। ইচ্ছে হলে খেয়ে দেখবেন। আজকাল তো এসব টোটকা ওষুধকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ডাক্তারি শাস্ত্রে থোড়ের কথা অবশ্য নেই। কিন্তু তাতে কী? খাবেন। তবে হাঁটাচলাটা বাদ দেবেন না।
না। হাঁটতে আমার ভালই লাগে।
বয়সের অনুপাতে আপনার শরীর তো বেশ ভালই আছে দেখছি। হার্ট ইজ ওকে, বুকে কোনও কমপ্লিকেশন নেই। তবে মাথার রিলিংটা হয়তো স্পন্ডেলাইটিসের জন্যও হতে পারে। একবার বর্ধমানে গিয়ে ঘাড়ের একটা এক্স-রে করাবেন। আর একটা ব্লাড টেস্ট। সবই প্রেসক্রিপশনে লিখে দিয়েছি।
একটা কথা ডাক্তারবাবু।
বলুন।
আপনারা তো মানুষের শরীরে অনেক কাটাছেঁড়া করেন।
অনল বাগচী মৃদু হেসে বলল, আমি মেডিসিনের লোক। কাটাছেঁড়া সার্জনদের কাজ। তবে ডাক্তারি পড়ার সময়ে ডিসেকশন করতে হয়েছে। যাই হোক, আপনি বলুন।
না, এই মাঝে মাঝে অনেক আবোল তাবোল কথা মনে হত। খুব জানতে ইচ্ছে করে মানুষের আত্মাটা শরীরের ঠিক কোথায় তাকে। ডাক্তাররা শরীর কাটাছেঁড়া করার সময়ে কি সেটা বুঝতে পারে?
অনল বাগচী বিশেষ ভদ্রলোক। এ কথায় একটুও তাচ্ছিল্য প্রকাশ করল না। বরং বেশ সিরিয়াস মুখ করেই বলল, ডাক্তাররা আত্মা দূরে থাক, শরীরেরই বা কতটুকু জানে বলুন। এই তো মানুষের একটুখানি শরীর, কতই বা লম্বা চওড়া। তবু এর মধ্যেই এত অদ্ভুত আর সূক্ষ্ম যন্ত্রপাতি যে তাক লেগে যেতে হয়। এর মধ্যে কত জটিলতা, কত কো-অর্ডিনেটেড সিস্টেম। শরীরকেই তো আজও পুরোপুরি জানি না আমরা। আত্মা তো আরও দুয়ে।
ডাক্তারবাবুটিকে বড় ভাল লেগে গেল মহিমের। সে সাগ্রহে জিজ্ঞেস করল, আপনি কি আত্মা মানেন?
আমি না মানার কে? প্রায় সব ধর্মেই আত্মার কথা বলা আছে। সুতরাং জিনিসটা তো উড়িয়ে দেওয়ার মতো নয়। আমরা যে ভাইটাল ফোর্সের কথা বলি সেটাই হয়তো এই আত্মা।
শুনে বড় ভাল লাগল। আজকাল তো এসব কেউ মানতে চায় না।
মানুষ ভাবতে চায় না বলে মানে না। আত্মার অস্তিত্ব আমি অস্বীকার করতে পারি না।
মহিম একটা স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আমি একটু হোমিওপ্যাথির চর্চা করি। স্পন্ডেলাইটিসের ওষুধ আছে। খাব কি?
নিশ্চয়ই খাবেন। আমার নিজের কোনওরকম পেন-টেন হলে আমিও তো আর্নিকা খাই।
সত্যি?
অনল বাগচী হেসে বলল, বললাম না আজকাল খুব আনকনভেনশনাল ওষুধের গুরুত্ব বাড়ছে। ভারত সরকার তো আদিবাসীদের ওষুধ নিয়ে রিসার্চ করাচ্ছে। বিদেশেও হারবাল মেডিসিনের চল হচ্ছে। কীসে যে কী হয় তা তো আমরা জানি না।
আপনি বড় উদারচেতা মানুষ।
তা নয়, আই ট্রাই টু বি লজিক্যাল। আমাদের লিমিটেশনগুলোও যে আমি জানি।
মহিমের খুব ইচ্ছে হল ডাক্তারবাবুটিকে আশীর্বাদ করে। মুখে শুধু বলল, ঠাকুর আপনার মঙ্গল করুন। বড্ড অমান্যির যুগ পড়েছে বলে ভারী দুশ্চিন্তা হয়। কেউ কিছু মানতে চায় না।
তা ভাবছেন কেন? কিছু লোক মানে, কিছু লোক মানে না। বরাবরই এরকম চলে আসছে। আপনি যা বিশ্বাস করেন সেটা ছাড়বেন কেন? শুধু অন্ধ কুসংস্কার জিনিসটা ক্ষতিকারক। সেটা পেয়ে বসলে মুশকিল।
ডাক্তার চলে যাওয়ার পর অনেকক্ষণ মহিম লোকটার কথা খুব শ্রদ্ধার সঙ্গে ভাবল।
সন্ধ্যা কাছেই বসেছিল। কেঁদে কেটে চোখ লাল। গলা ধরেছে। ডাক্তারের কথা শুনে এখন একটু মুখটা স্বাভাবিক হয়েছে। বাড়ির সবাই ভিড় করে ছিল এতক্ষণ। কমল এখনও আছে। আর মুকুল পায়ের কাছে বসে একটা হট ওয়াটার ব্যাগ ধরে আছে পায়ের তলায়।
কমল বলল, অমলকে ফোন করে দিয়েছি বাবা।
মহিম অবাক হয়ে বলে, কেন?
তুমি মাথা ঘুরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাওয়ায় ভয় পেয়ে ওকে জানিয়েছি।
দেখ কাণ্ড! তাড়াহুড়োর কী ছিল? সে কাজের মানুষ, অফিস কামাই করে হয়তো এসে পড়বে। ডাক্তার তো বলেই গেল কিছু হয়নি।
আহা, আসুক না। আজ তো শুক্রবার। আগামীকাল তো এমনিতেই ওদের আসবার কথা।
তাহলেও দুশ্চিন্তা করতে পারে। হ্যাঁ রে, ডাক্তার কোনও ওষুধ দিয়েছে?
হ্যাঁ, প্রেসক্রিপশনে তিনটে ওষুধের নাম দেখছি।
ওসব ওষুধ আর আনিস না যেন। খাওয়ার কথা কিছু বলে গেল?
শুধু বলল, নুনটা কম খেতে। আর তেল মশলা তেমন না খাওয়াই ভাল। তা খাওয়া নিয়ে আবার কবে তোমার মাথাব্যথা ছিল? তুমি এমনিতেও তো একটুখানি খাও। তোমার বউমা তো বলে, বাবার খাওয়া দিনদিন কমে যাচ্ছে। হ্যাঁ বাবা, কফি ধরেছ বুড়ো বয়সে, তাই থেকেই এসব হল না তো!
দুর পাগল। কফি থেকে কী হবে?
নেশার জিনিস তো!
নেশা মানে তো মদ গাঁজা নয় রে বাবা।
সন্ধ্যা বলল, ও তোমার আর খেয়ে দরকার নেই বাবা। কী থেকে কী হয় কে জানে। তোমার কিছু হলে আমার বাপু হার্টফেল হয়ে যাবে। যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিলে আজ।
আমার কী মনে হয় জানিস?
কী?
পেটে বায়ু হয়ে এরকমটা হয়েছিল। ঊর্ধ্বগামী বায়ু থেকে কত কী যে হয়।
আমার কাছে হজমি আছে। দেব? নিজের হাতে যত্ন করে তৈরি করেছি। যারা খাচ্ছে সবারই উপকার হচ্ছে।
দিস খন। ভয়ের কিছু নেই।
চুপটি করে শুয়ে থাকো। আজ রাতে আমি এ-ঘরেই ক্যাম্পখাট পেতে শুয়ে থাকব।
আবার লেপতোশক টানাহ্যাঁচড়া করতে যাবি কেন? আমি তো ভালই আছি।
ভালই যদি আছ তাহলে মাথা ঘুরল কেন?
