দুপুরবেলা খেয়ে-দেয়ে মা যখন শুতে গেল তখন মরণ চুপ করে গাছতলায় তার নিজস্ব শিবঠাকুরের থানে এসে ঘাসের ওপর বসল। এখানে মন্দির নেই, শিবলিঙ্গ নেই, কিছু নেই। তবু মরণের এটাই শিবঠাকুরের থান। এখানেই সে ডাকলে শিবঠাকুর এসে হাজির হন।
আজও সে চোখ বুজে শিবঠাকুরকে খুব প্রাণভরে ডাকল, শিবঠাকুর আজ কি পাপ করে ফেললাম? ক্ষমা করে দিও ঠাকুর। তোমাকে বলছি, আমাকে কিন্তু কেউ ভালবাসে না। আমি কি খুব খারাপ? আজ যদি পুকুরে ডুবে মরে যেতাম তাহলে বুঝি ভাল হত?
শিবঠাকুরের গায়ের বোঁটকা গন্ধটা আজও পেল মরণ। তার সামনেই শিবঠাকুর ব্যোম ভোলানাথ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ না খুললেই তাকে দেখা যায় ভাল।
একটু থেমে খুব লজ্জায় লজ্জায় মরণ বলল, ও যেন আমার দিকে একটু তাকায়-টাকায় ঠাকুর।
এই বলেই ছুটে পালিয়ে এল ঘরে।
এই তো সেদিন জিজিবুড়ি সকালে রোজকার মতো এসে বসে ছিল উঠোনে। রোদ পোয়ানোর নাম করে রোজই আসে, যদিও তাদের বাড়িতে রোদের অভাব নেই। চোখ কুঁচকে মরণকে দেখে বলেছিল, তুই কি একটু ঢ্যাঙা হয়েছিস নাকি রে ভাই?
ভারী লজ্জা পেয়েছিল মরণ। সে যে একটু ঢ্যাঙা হচ্ছে, তা সে খুব টের পায়। শরীরে আরও নানা বদল ঘটছে তার। সুড়সুড়ি বাড়ছে, হাতে পায়ে কেমন একটা অস্বস্তি যেন, চামড়ায় কখনও কখনও ফাটলের মতো দাগ। এসব কী হচ্ছে তা ঠিক বুঝতে পারে না মরণ।
জিজিবুড়ির কথাটা কানে গিয়েছিল বাসন্তীর। কেঁঝে উঠে বলল, নজর দিও না তো মা। এটা তো বাড়েরই বয়স। বাড়বে না তো কী? অত তাকিয়ে থাকার মতো কিছু হয়নি।
মায়ের নানা ভয় আছে। নজর লাগার ভয়, শনির দৃষ্টি, ফঁড়া, আরও কত কী। মাঝে মাঝেই তার আঙুল কামড়ে, শরীরে থুথু ছিটানোর ভান করে কী সব যেন তুকতাক করে মা। তার নামে বারের পুজো দিতে শনি মন্দিরে যায় ফি শনিবার।
আমাকে নিয়ে তোমার এত ভয় কেন মা?
আমার বাপু সবাইকে নিয়েই ভয়।
.
৬০.
এই যে প্রাণের তত্ত্ব শাস্ত্রে এত বলা আছে, তা সেই প্রাণটা কোথায় থাকে এই দেহপিঞ্জরে সেটাই তো আজ অবধি ঠাহর পাওয়া গেল না। প্রাণ কি বিন্দু, না শিখা, নাকি বুদ্বুদ? জিনিসটা খুব একটুখানি। এই শরীর আর মনের নিউক্লিয়াস। তাকে ঘিরেই কি শরীরের অণুপরমাণু আবর্তিত হয়? কে জানে বাবা কী, কিন্তু আছে একটা কিছু। চোখের দেখা, কানের শোনা, বুদ্ধিশুদ্ধি, বুকের ধুকপুকুনি এইসব তার জন্যই হচ্ছে-টচ্ছে। অথচ তার হদিশ করাই মুশকিল।
আজকাল কফি খাওয়ার ঝোঁক হয়েছে মহিমের। জিনিসটা ভাল। শীতে বেশ গা গরম হয়। শরীরটা চনমনে লাগে। তার নাতনি সোহাগ জিনিসপত্র সব এনে দিয়েছে তাকে। শিখিয়েছে কালো কফি খেতে। বলেছে, দুধ দিয়ে খেও না দাদু, ওতে খারাপ হয়।
সন্ধের পর নিজের ঘরে স্টোভ জ্বেলে নিজেই এক কাপ কফি করে মহিম খুব তৃষ্ণার্তের মতো খায়। ওই এক কাপই। লোভে পড়ে একবার তিন কাপ খেয়ে বিপদ হয়েছিল। রাতে কিছুতেই ঘুম আসতে চায় না। উগ্র জিনিস, সাবধানে খেতে হয়।
সন্ধের পর কারেন্ট থাকলে মুকুল এসে তাকে হাত ধরে একরকম টেনে তাদের ঘরে নিয়ে যায়, চলো দাদু, সিরিয়াল দেখবে। মুকুল হল মুকুলিকা, কমলের ছোট মেয়ে। ওদের ঘরে এখন রঙিন টিভি এসেছে, কে কানেকশন নেওয়া হয়েছে। লোকে আজকাল খাক না খাক, টিভি না দেখলে বেজার হয়ে পড়ে। ওয়ান ডে ক্রিকেট থাকলে তো ও-ঘরে ঘেঁষাঘেঁষি ভিড় হয়। সিরিয়াল দেখার তেমন আগ্রহ বোধ করে না মহিম। সবই কৃত্রিম লাগে। বানানো গল্প, বানানো রিঅ্যাকশন। যাত্রা বা নাটকে যে একটা উচ্চগ্রামের ব্যাপার থাকত এসব সেরকম নয়। তবু গিয়ে মাঝে মাঝে ওদের আসরে বসতে হয়।
সেদিন সন্ধেবেলাতেও মুকুল এসে ডেকে গেছে। যাবে বলে তৈরি হয়ে মহিম তার বরাদ্দ কফিটা তৈরি করে সবে ঘুরে চেয়ারের দিকে আসছিল। হঠাৎ মাথায় একটা প্রবল চক্কর। গোটা ঘর যেন টালমাটাল হয়ে দোল খেয়ে গেল, মেঝেটা যেন নেমে যাচ্ছিল পাতালে। প্রথমে মনে হয়েছিল বুঝি ভূমিকম্প। কিন্তু ভূমিকম্প হলে চারদিকে শাঁখ বাজত। কয়েক মুহূর্তেই মহিম ওই অবস্থাতেও বুঝতে পারল, আশি পেরোনো এই শরীরেরই কোনও অধঃপাত। সে কি মারা যাচ্ছে?
কফির কাপটা পড়ে ভাঙল, গরম কফি ছিটকে লাগল পায়ে। চোখে অন্ধকার, কানে ঝিঁঝির ডাক। জ্ঞান হারানোর আগে সে টের পেল, কাপ ভাঙার শব্দ পেয়েই বোধহয় সন্ধ্যা দৌড়ে আসছিল, ও বাবা! কী হল…।
ডাক্তার বদ্যি সারাজীবনে খুব কমই দেখিয়েছে মহিম। একটা জীবনে হোমিওপ্যাথির চর্চা করত। চার পাঁচখানা ইংরিজি এবং বাংলা বই আছে তার। ওষুধের বাক্স আছে। একসময়ে পাড়া প্রতিবেশীরা অনেকেই তার কাছে এসে ওষুধ নিত। তখন গাঁ গঞ্জে ডাক্তার অমিল ছিল খুব। অসুখ হলে দু-তিনজন শখের হোমিওপ্যাথই ভরসা। নইলে বর্ধমান নিয়ে যেতে হত রুগিকে। আজকাল অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। পাশ করা বড় ডাক্তাররা নিয়মিত আসছে গাঁয়ে। তিন চারজন পাশ করা হোমিওপ্যাথ ডাক্তারও আছে।
তাকে দেখতে এল অনল বাগচী। মেডিকেল কলেজে নাকি পড়ায়। খুব নাম। ভারী অমায়িক মানুষ, গোমড়ামুখো গেরামভারি নয়।
প্রেশার দেখে বলল, সামান্য বেশি আছে। এর জন্য ওষুধ খাওয়ার দরকার নেই। একটু হাঁটাহাঁটি করলেই কমে যাবে।
