এসব মরণের কাছে জলভাত, কত সাপ মেরেছে সে। যদি বুদ্ধি থাকত তাহলে সাপেরা মরণের বিরুদ্ধে মিটিং বসাত। সে একখানা আধলা ইট তুলে ঘাঁই করে মেরে দিয়েছিল। তার হাতের টিপ কখনও ফসকায় না। একবারেই সাপের মাথা থেঁতলে দিয়েছিল সে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তখন তার ওই বাহাদুরিতে বাহবা দেওয়ার মতো বড় ছিল না টুপু। আর তখন লক্ষ করে দেখার মতোও ছিল না হাড় জিরজিরে মেয়েটা। এই টুপু অন্য আর একজন, যেন এ-গাঁয়ে নতুন আসা মেয়ে। একে কী বাহাদুরি দেখাতে পারে মরণ? ধারেকাছে তো ফণা-তোলা সাপ নেই!
গাছের একটা আড়া ডাল অনেকখানি এগিয়ে ঝুঁকে আছে পুকুরের ওপর। মরণ হিসেব করে দেখল ওই ডালটা বেয়ে যদি একেবারে শেষপ্রান্তে যাওয়া যায় তাহলে পুকুরের জলে লাফিয়ে পড়া সম্ভব। তবে একটু ভুলচুক হলে ঘাটের সান বাঁধানো সিঁড়িতে পড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। বাহাদুরিটা দেখাতে পারলে এই নতুন টুপু কি নতুন চোখে তাকে দেখবে না? একটু হিরোর মতো ভাববে না তাকে?
আড়া ডালটায় নামা কঠিন নয়, কিন্তু মুশকিল হল, গাছটা পুরনো, পোকা-টোকা লেগে যদি আড়া ডালটার গোড়া কমজোরি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আগার দিকে মরণের ভার বইতে না পেরে মড়মড় করে ভেঙে পড়তে পারে। তা পড়ুক, তাহলেও তো মরণের জন্য একটু আহা উঁহু করবে ওই নতুন টুপু!
ওপরের ডাল থেকে হাতের ঝুল খেয়ে তলার ডালটায় নেমে পড়ল মরণ। আড়া ডালটা মোটা, মরণ গাছের চরিত্র খুব ভাল চেনে, মোটা ডাল মানেই ভারী জিনিস। অনেকখানি ঠেকনোহীন ক্ষীণ ঝুলে আছে বলে এসব ডালই বেশি বিপজ্জনক, যখন তখন ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু অত হিসেব করার সময় নেই। টুপুর চুল ঝাড়া হয়ে গেছে। এবার চলে যাবে। হাওয়াই চটি জোড়া জলে ধুতে সিঁড়িতে নেমে টুপু জলে নামা অন্য কয়েকজন মেয়েছেলের সঙ্গে কথা কইছে। বিশ্বাস বাড়ির বড়বউ রাধিকা, নয়নের বুড়ি পিসি, কাদুর মা।
মরণ বুক হেঁচড়ে ডালটা বেয়ে বেয়ে ঠিক চলে এল ডগায়। ডালটা দোল খাচ্ছে খুব জোর। সামনে কোথাও কাকের বাসা আছে বোধহয়। কাকগুলো খুব ডেকে উঠল হঠাৎ। তাদের ক্রুদ্ধ ডানার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিপদ বুঝলে ঠিক এসে ঠুকরে দেবে মরণকে।
ডালটার ডগায় এসে মরণ বুঝতে পারল ফুটখানেকের হিসেব গোলমাল হয়েছে। লাফ দিলে জলে পড়তে পারে। আবার পৈঠাতে পড়াও বিচিত্র নয়। কিন্তু হিসেব করলে আর বাহাদুরিটা কী হল?
মরণ ডালটা ধরে ঝুলে পড়ল প্রথমে। তারপর ট্রাপিজের খেলোয়াড়ের মতো শরীরটা বারকতক দুলিয়ে নিল ভাল করে। তারপর জলের দিকে ঝুল খেয়ে হাত ছেড়ে লাফিয়ে পড়ল জলে। অনেকটা ওপর থেকে। এত ওপর থেকে কখনও যে জলে লাফায়নি সে এ কথাটা খেয়াল ছিল না তার। টুপু আজ মাথাটা গোলমাল করে দিয়েছে যে!
জলে পড়ার কিছু নিয়ম আছে। খাড়া হয়ে সরু হয়ে না পড়লে মসৃণভাবে জলে ঢুকে যাওয়া যায় না। চিৎপাত হয়ে পড়লে জলের চাটি খেতে হয়। মরণের জুটলও তাই। ডাইভ দিতে জানলে এরকমটা হত না। সে পড়ল নিরালম্ব চিৎপাত হয়েই। জলের প্রচণ্ড চাটি লাগল পিঠে, মাথায়। দম বন্ধ হয়ে এল তার ব্যথায়। সবজে নীল জল কলকল করে ঢুকল কানে, নাকে, চোখে। কয়েক ঢোঁক জল গিলেও ফেলল সে। চোখে অন্ধকার ঠেকল কিছুক্ষণ। কোন তলানিতে চলে যাচ্ছিল সে কে জানে। হাত-পা অসাড় লাগল কিছুক্ষণ। কিন্তু তবু গাঁয়ের পুকুরে দীর্ঘদিন স্নান করার অভ্যাস আছে বলে সে সামলেও গেল। ভুরভুরি কেটে ভুস করে যখন ভেসে উঠল তখন পুকুরধারে গেল গেল বলে শোরগোল উঠে গেছে।
সবার আগে মরণের চোখ পড়ল টুপুর ওপর। ভারী অবাক হয়ে চেয়ে আছে টুপু। মুখে ভয়, চাউনি অবাক।
বাহাদুরিটা ভালই দেখিয়েছে মরণ। সে হি হি করে হেসে উঠল আনন্দে।
কে যেন বলে উঠল, আ মোনলা ওটা কি মরণ নাকি রে? পিলে যে চমকে দিয়েছিলি বাবা।
কোথা থেকে জলে পড়লি রে, ও ভূত!
কী অসভ্য ছেলে রে বাবা।
সবচেয়ে আশ্চর্য কথা বলল টুপু, কী বদমাশ ছেলে রে বাবা!
বলেই মুখটা ফিরিয়ে পৈঠা বেয়ে উঠে গেল ওপরে। তারপর আর দেখাই গেল না তাকে।
ভেজা গায়ে উঠে এল মরণ। জামা প্যান্ট সব ভেজা। কেমন বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। অপমানও বোধ হচ্ছে। তোর জন্যই লাফ দিলাম টুপু, আর তুই-ই ওরকম করলি? তোদের বাড়িতে যে কেউটে সাপ মারলুম, মনে নেই? আমার মতো গাছ বাইতে পারে কেউ? জোরে ছুটতে পারে আমার মতো কেউ? পারে কেউ আমার মতো তেঁতুলবিছের কামড় সহ্য করতে? পারুক তো কেউ দেখি!
ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল বলে মা লক্ষ করল না তাকে। করলে জামা ভিজিয়ে এসেছে বলে বকুনি দিত। গা মুছে জামা প্যান্ট ছেড়ে নিজের পড়ার ঘরখানায় এসে চুপটি করে বসে রইল মরণ। টুপু কি আর কখনও তার দিকে তাকাবে? দেখলেও হয়তো অবহেলায় চোখ ফিরিয়ে নেবে। পাত্তাও দেবে না তাকে! না দিক। তারই বা কী গরজ! এই তো সেদিনও টুপুকে পাত্তা দিত না মরণ। ভারী তো মেয়ে। রোগা, কেলটিস মার্কা। উঁচ-কপালি, চিরুনাতি কোথাকার। অবশ্য উঁচ-কপালি আর চিরুনাতি কাকে বলে তা জানে না মরণ।
লেখাপড়ায় ভাল হলে তাকে কি কেউ এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত? এটা মরণ আজকাল খুব টের পায়। কিন্তু তার যে মোটে পড়তে ইচ্ছে যায় না। কী যে করবে তা বুঝতে পারছিল না সে।
