শিবঠাকুরের কাছে মরণ যা চায় তাই শিবঠাকুর দিয়ে দেন। না, সব দেন না। আসলে শিবঠাকুর তো বড্ড ভুলো মনের মানুষ। আধখানা হয়তো দিলেন, বাকি আধখানা দিতে ভুলেই গেলেন। তবুমরণ যা চায় তার সবটাই প্রায় তাকে দিয়ে দেন শিবঠাকুর। তাঁর বরেই না তার মাকে মা বলে ডেকে ফেলল দাদা। দিদিটা তেমন সুন্দর হল না ঠিকই, কিন্তু কেমন ভাব করে গেল মরণের সঙ্গে! তাকে দাদা আর দিদির খুব পছন্দ হয়েছে। তারা বলে গেছে আবার আসবে। হয়তো বড়মাও আসবে একদিন। শিবঠাকুরের কাছে এই বরটা চেয়ে রেখেছে মরণ। হে ঠাকুর, বড়মা এসেও যেন আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তো বাঁদর ছেলে, লেখাপড়ায় নম্বর পাই না, আবার নামটাও ভারী বিশ্রী, তবু যেন বড়মা আমাকে অপছন্দ না করে। যেন বলে, ও মরণ, আমার সঙ্গে কলকাতায় চল তো বাবা! তোকে আমিই মানুষ করব। না, তা বলে মরণ হুট করে চলেও যেতে পারবে না। ঠিক বটে, মায়ের ওপর রাগ হলে সে মাঝে মাঝে কলকাতায় বড়মার কাছে চলে যাবে বলে ঠিক করে ফেলে। আবার এও মনে হয়, মাকে ছেড়ে সে তো থাকতেও পারবে না। মা কেঁদে কেঁদে মরেই যাবে। আর মাকে ছেড়ে নরও খুব মন খারাপ হবে।
জিজিবুড়ি অবশ্য খলখল করে হেসে বলে, ওরে, ও ডাইনি এল বলে। আগে ছানাপোনা পাঠিয়ে তত্ত্বতালাশ নিয়ে রাখল। ওরা হচ্ছে ডাইনির চর। তারপর সে এসে মুষলপর্ব শুরু করবে। তোর মেনিমুখো মা পারবে তার সঙ্গে যুঝতে? বেড়াল-কুকুরের মতো তাড়াবে। কত করে বললুম, ওলো, ভাইদের হাতে দলিল-টলিলগুলো সব দিয়ে রাখ। তারা ভাল উকিল লাগিয়ে সব বুঝে রাখবে। তা শুনল আমার কথা? কিছু কিছু করে টাকাপয়সা সরিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখতে বললুম, তা মেয়ের কী রাগ! ওরে গর্ভধারিণী মাকে অবধি তোর বিশ্বাস হয় না এমন গুণ তোকে কে করল বল তো!
মরণ জানে জিজিবুড়ির অনেক দোষ আছে। কিন্তু মরণের তাকে মোটেই খারাপ লাগে না। জিজিবুড়ি তাকে অনেক গল্প শোনায়। আর কাছে বসলেই জিজিবুড়ির গা থেকে দোক্তার মিষ্টি গন্ধ আসে। আর জিজিবুড়ি খারাপ লোক হলেও মরণকে ভালবাসে খুব। অসুখের সময় তার শিয়রে বসে কী কান্না!
সংসারের এই খারাপ, ভাল লোকের বিচারটা ভাল বুঝতে পারে না মরণ। জিজিবুড়িকে বাড়ির সবাই খারাপ বলে, কিন্তু বুড়িটার জন্য মরণের বড় মায়া। সে অনেক সময়ে চুরি করে জিজিবুড়িকে জিনিসপত্র দেয়। বাঙাল কলকাতা থেকে ফি সপ্তাহে রাজ্যের জিনিস নিয়ে আসে। সংসারের যাবতীয় জিনিস– দড়িদড়া থেকে আচার আমসত্ত্ব সোনামুগের ডাল অবধি। সব জিনিসেরই অবশ্য হিসেব থাকে তার মায়ের। বাবা বেহিসেবি কেনাকাটা করলেও মা সব গুছিয়ে গুনেগেঁথে খাতায় লিখে রাখে। তাই থেকে মাঝে মাঝে জিজিবুড়ি চায়। মা দেয় না। তখন হয়তো চুপি চুপি মরণকে বলে, দিবি ভাই, এক শিশি মধু? বাঙাল নাকি কোথা থেকে খাঁটি চাকভাঙা মধু আনে। তা বাঙালরা খাবার জিনিস খুব চেনে। ওরা রাক্ষসের জাত তো, খেতে-টেতে খুব ভালবাসে।
তা দেয় মরণ। কিন্তু মায়ের কাছে ধরাও পড়ে যায়। মা একদিন গুম করে তার পিঠে কিল দিয়ে বলেছিল, অত আদিখ্যেতা কীসের রে? তুই দিতে যাস কেন? মাকে যখন যা দেওয়ার আমিই তো বুঝে সুঝে দিই। কাঙাল ভিখিরির মতো হাত তো পেতেই আছে সব সময়। সব খাঁই মেটাতে গেলে তো আমার সংসার লাটে উঠবে। দানছত্র তো খুলে বসিনি।
তা জিজিবুড়ির জন্য একটু কষ্ট আছে বটে মরণের। মা বলে, জিজিবুড়ির কথায় নাকি এমন ধার যে লোহা কাটতে পারে। কটর কটর কথা বললেও জিজিবুড়ির কি গুণও নেই? মহাভারতের অত কথা জিজিবুড়ির মতো কেউ জানে? কত অবাক করা গল্প শোনায় তাকে জিজিবুড়ি!
তবে হ্যাঁ, যখন জিজিবুড়ি বড়মাকে ডাইনি ডাকে তখন তার কষ্ট হয়। কিংবা বলে, ওই বড় মাগী কি আর তোর মায়ের মতো বোকা মাথার মানুষ? শহুরে মেয়েছেলে বাবা, জাঁহাবাজ মানুষ, সাত হাটে তোর মাকে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তার ওপর যদি সেও বাঙাল মেয়েছেলে হয়ে থাকে তবে তো আরও চিত্তির। শুনি তো নাকি হুগলির মেয়ে। ও বাপু, আমার বিশ্বাস হয় না। বাঙালরা কত ফেরতাই জানে। দ্যাখ গে খোঁজ নিয়ে, সে মাগীও বাঙাল। এসব শুনলে মরণের ভারী রাগও হয়। বড়মার একটা ছবি সে তার মনের মধ্যে টাঙিয়ে রেখেছে। বড় বড় শান্ত চোখ, মুখে একটু প্রশ্রয়ের হাসি, আর ভারী ঢলঢলে দুর্গা প্রতিমার মতো মুখ। তবে না বড়মা! যদি সত্যিকারের বড়মা ওরকম নাও হয় তবু মরণ ঠিক মানিয়ে নেবে। জিজিবুড়ি যে কেন ওসব বলে।
মা কিন্তু কখনও বড়মা সম্পর্কে খারাপ কথা বলে না। তবে একটু ভয় পায়। মা অবশ্য সব কিছুতেই ভয় পায়। ভয়ের শেষ নেই মায়ের। দাদাকে ভয়, দিদিকে ভয়। বড়মাকে দেখেনি, কেমন মানুষ তাও জানে না। ভয়টা সে কারণেই। কিন্তু মরণ বড়মাকে ভয় পায় না। সে ঠিক জানে, শিবঠাকুর তার বড়মাকেও ঠিক মনের মতোই করে একদিন এই গাঁয়ে নিয়ে আসবেন।
সবাই জানে সে বাঁদর ছেলে। টুপুও তাই জানে। এ-গাঁয়ে মরণের কোনও সুনাম নেই। অনেকদিন আগে টুপুদের বাড়িতে বর্ষাকালে একদিন মেঘ কেটে রোদ ওঠায় তোশক বালিশ রোদে দেওয়া হয়েছিল উঠোনে। বিকেলবেলায় তোশক তুলবার সময় মস্ত এক কেউটে সাপ বেরিয়ে এসেছিল তোশকের ভাঁজ থেকে। প্রবল চিৎকার আর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গিয়েছিল মরণ। বাড়ির সবাই বারান্দায় উঠে পড়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছিল। বিশাল সাপটা বুকসমান ফণা তুলে দুলছিল উঠোনের মাঝমধ্যিখানে।
