সবাই বলে বাঙালের মেজাজটা একটু টং বটে, কিন্তু সে লোক ভাল। কিন্তু মরণ জানে বাবারা কখনও ভাল লোক হয় না। এই যে বাঙাল ফি শনিবার আগেভাগে তার পোস্তার দোকান বন্ধ করে এখানে বিকেল-বিকেল এসে পৌঁছোয় তখন মরণকে তৈরি থাকতে হয়। বাড়িতে পা দিয়েই বাঙাল তার খোঁজ করবে, বান্দরটা গেল কই?
সে ভয়ে ভয়ে সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই বাঙাল তার আপাদমস্তক দেখে নিয়ে হঠাৎ বলবে, এইটার মাথাডা যে কাউয়ার বাসা হইয়া আছে দ্যাখে না কেউ? এই হারামজাদা, মাথা খাউজ্যায় না তর? খাউজ্যায়? এঃ উকুনও হইছে মনে হয়। কাইলকাই নাইপত্যা ডাকাইয়া মাথাটা লাউড়া কইরা দিতে হইব।
রসিক বাঙালের এসব কথা জলের মতো বুঝতে পারে মরণ। যদিও এ তাদের ভাষা নয়, কিন্তু জ্ঞান হওয়া অবধি শুনে শুনে সে বুঝতেও পারে, বলতেও পারে অনেকটাই। রসিক বাঙালের পাল্লায় পড়ে তাকে বার দুই ন্যাড়াও হতে হয়েছে। বাঙালের গোঁ, যেই কথা সেই কাজ।
কখনও বা হাতের নখ দেখে বলে, এ, এইটার তো দেখি, পিচাশের মতো নখ হইছে। ইস রে, নখের মইধ্যে কালা কালা মাটি।
নেল কাটার দিয়ে রসিক বাঙাল ডাব্বিয়ে তার নখ কেটে দেয়। এমন মুড়িয়ে কাটে যে কয়েকদিন তার আঙুলের ডগা টনটন করে।
আর সবচেয়ে দুঃখের কথা, শনি রবি দুদিনই তাকে দুবেলা রীতিমতো পড়তে হয়। টো-টো করে ঘুরে বেড়ানো বন্ধ। শ্বাসটাও ফেলতে হয় হিসেব করে। আর বাঙালের সঙ্গে বাগানের কাজে সাহায্য করতে হয়, ফাইফরমাশ খাটতে হয়।
আর সবচেয়ে যেটা লজ্জার কথা, এই বছর দশ-এগারো বয়সে সে তো বেশ বড়টিই হয়েছে, তবু রসিক বাঙাল মাঝে মাঝেই তাকে কলতলায় নিয়ে গিয়ে ন্যাংটো করে সাবান মাখিয়ে ছোবড়া দিয়ে ঘসে ঘসে চান করিয়ে দেয়। একে ন্যাংটো হওয়ার লজ্জা, তার ওপর ছোবড়ার ঘষটানিতে গায়ের জ্বালা। কিন্তু বাঙালের সঙ্গে এ নিয়ে কথা কইবে কে? না, রসিক বাঙালকে তার মোটেই পছন্দ হয় না। সোমবার সকালে ভাতে ভাত খেয়ে বাঙাল কলকাতার বড়বাজারে তার দোকান খুলতে রওনা হয়ে গেলে হাঁফ ছেড়ে বাঁচে মরণ। মনে হয়, এক সপ্তাহ ছুটি।
রসিক বাঙালকে নিয়ে ঠাট্টা-রসিকতারও প্রচলন আছে। তারাপদদা তাকে ইংরিজি পড়ায়। মাঝে মাঝে বলে, ও হল তোর উইক এন্ড ড্যাডি। আর বন্ধুরা বলে, রসিক বাঙাল হল তার ফিফটি পারসেন্ট বাবা।
কথাগুলো আজকাল বোঝে মরণ। একটু লজ্জা করে, রাগও হয়।
জানালা দিয়ে সাবধানে পাশ-চোখে মরণ দেখল, বাঙাল আগড় ঠেলে উঠোনে ঢুকছে। মাথার লম্বা চুল হাওয়ায় উড়োখুড়ো, মুখখানা চোয়াড়ে বটে, তবে গম্ভীর নয় যেন। হাড়ে মাসে কেঠো চেহারা। এইরকম পাকানো চেহারার লোকগুলোই রাগী হয়।
না, আজ বাঙাল রাগ করে আসেনি। উঠোনে ঢুকেই উঁচু গলায় হাঁক মারল, কই গো, কই গেলা?
মা ওপরে দম বন্ধ করে ছিল বোধহয় এতক্ষণ। বাঙালের হাঁক শুনে বলল, এই যে যাচ্ছি!
হাসিমুখে নেমে এসে বলল, আজ এলে যে!
বাঙাল বারান্দায় বসে পাশে অ্যাটাচি কেসটা রেখে বলে, আর কইও না, সুধীর মণ্ডল খবর পাঠাইছে খালপাড়ের জমিটা বেচব। তাই আর দেরি করলাম না। আইজই রেজিস্টারি।
যাক বাবা, ওই জমিটার ওপর তোমার কত কালের শখ।
অখনই বাইর হইতে হইবো, কখন ফিরুম ঠিক নাই। আইজ আর কইলকাতায় ফিরন যাইব না।
এখনই বেরোবে কি? না খেয়ে বুঝি? চান-টান করো, আমি ভাত বেড়ে দিচ্ছি।
বাঙাল তেমন আপত্তি করল না। বলল, তা হইলে লুঙ্গি গামছা দেও। গরম লাগত্যাছে।
মরণ প্রমাদ গুনল। বাঙাল তাহলে আজ থাকছে। দিনটাই মাটি। ডানধারের জানালা দিয়ে জিজিবুড়ির ভাঙাচোরা মুখ উঁকি মারল, ও ভাই মরণ, দোক্তাগুলো তুলেছিস?
সময় পেলুম কোথায়? বাঙাল এসে পড়ল যে।
ও আমার কপাল, না তুললে যে কে কখন মাড়িয়ে দেবে, কাক এসে মুখ দেবে।
হি হি করে হেসে মরণ বলে, কাক বুঝি দোক্তা খায়?
না খেলেও ছিষ্টি ছড়াবে ভাই, গু-মুত-খাওয়া ঠোঁটে ঠোকরাবে–সে বড় নিঘিন্নে ব্যাপার।
বাঙাল বারান্দায় বসে আছে যে!
চোখ কপালে তুলে জিজিবুড়ি বলে, বসে আছে বুঝি! গোঁসাঘরে যায়নি এখনও?
না গো জিজিবুড়ি, বাঙাল আজ ঝগড়া করে আসেনি।
তবে কী মতলবে?
কী যেন জমিজমা কেনার কথা শুনছি!
বাঙাল ওই করেই শেষ হবে। জমি-জমি করে এমন পাগল আর কাউকে দেখিনি। থাকবে নাকি আজ?
তাই তো শুনছি।
তাহলে গেল আমার অতগুলো দোক্তা।
তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, মুক্তাদি তোমার দোক্তা কুড়িয়ে দিয়ে আসবেখন।
আর দিয়েছে। ও আমার ভূতভুজ্যিতেই গেল। বাঙাল কার জমি কিনছে কিছু শুনলি?
সুধীর মণ্ডলের।
জমি কিনেই শেষ হবে বাঙালটা।
তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, বাঙাল দেখতে পেলে কুরুক্ষেত্র করবে।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। তা বলি বাঙালের নয় মাথার দোষ, পাগলের মতো জমি কিনছে, কিন্তু আমার মেয়েটাই বা অমন মেনিমুখো কেন? দুটো উচিত কথা মুখের ওপর কি বলতে নেই। কী দিয়ে যে বশ করে রেখেছে কে জানে বাবা। স্বামী তো নয়, যেন গুরুঠাকুরটি এলেন। সব সময় হ্যাঁ-হুজুর জো-হুজুর করে যাচ্ছে। জন্মে এমন দেখিনি বাবা। কই, বড় বউ কি ছেড়ে কথা কয় বাঙালকে? দিচ্ছে তো গুষ্টির পিণ্ডি চটকে থোঁতা মুখ ভোঁতা করে। তখন তো ল্যাজ গুটিয়ে এখানে এসে গোঁসাঘরে টান টান হয়ে শুয়ে থাকে, পারে কিছু বলতে গিয়ে তাকে? আমার মেয়েটাই হল গে মেনিমুখো।
