কখন?
বুড়ো হলে। তাই বলি, তুমিও বুড়ো হচ্ছ নাকি?
তা তো হচ্ছিই। কী হয়েছে তোমার?
হয়তো কিছুই নয়।
হয়তো কেন?
পরীক্ষা করলে জানা যাবে।
আমাকে বলতে চাইছ না কেন?
ইউটেরাসে টিউমারিক গ্রোথ বলে আলট্রাসোনোতে ধরা পড়েছে।
বিপজ্জনক কিছু?
কে জানে কী। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মোনা।
এটা এমন কিছু গোপন করার মতো ব্যাপার তো ছিল না। তাহলে আমার কাছে গোপন করছিলে কেন মোনা?
একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। তোমার সঙ্গে একটা দূরত্ব ছিল তো। তখন সব কথা চেপে রাখতাম। সেই থেকে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল।
মোনাকে হঠাৎ প্রগাঢ় আলিঙ্গনে বেঁধে অমল বলল, কাছে এসো, আরও কাছে। কত কাছে আসতে পার।
এ বাবা! দম বন্ধ হয়ে আসছে যে! পাগলটা কোথাকার।
অমলের মনে হল, এত কাছে, তবু কি দূরত্ব নেই?
.
৫৯.
টুপুকে সে পুকুরে স্নান করতে দেখেছিল। টুপু বেশ দীঘল, লম্বাটে ঢলঢলে মুখ। চোখ দুখানা খুব ঝকঝকে। এসব আগে কখনও দেখেনি সে। পরশু দেখল। দুপুরবেলা সে উঠেছিল মনু পিসিমার আমগাছে ভীমরুলের চাক ভাঙতে। কষে খুঁটে আর ভেজা তুষ এবং কাঠকুটোর ধোঁয়া দিয়েছিল মনুপিসি। শীতের দুপুরে থম-ধরা বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠতেই ভোঁ ভোঁ করে একটি দুটি ভীমরুল উড়ে যেতে লাগল। ধোঁয়া মোটে সহ্য হয় না ওদের। উড়ন্ত কীট পতঙ্গরা ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না কখনও।
মনুপিসি কদিন ধরেই বলছিল, সবাইকে বলে বলে মুখ ব্যথা হয়ে গেল বাবা, ভীমরুলের চাক ভাঙতে কেউ সাহস পায় না। তুই তো ডাকাবুকো আছিস, দে বাবা ভেঙে, নইলে কবে কোন দুষ্টু ছেলে দূর থেকে ঢিল মেরে পালায়, তখন কি রক্ষে আছে? ভীমরুলের হুল যমের দোর। শয্যে নিতে হবে। দে বাবা ভেঙে, পেট ভরে পিঠেপায়েস খাওয়াব।
মরণ এসব কাজ খুব পারে। বোলতা, ভীমরুল, মৌমাছির হুল কতবার খেয়েছে সে। ওসব তার তেমন লাগে না। গতবার যখন একটা প্রায় এক ফুট লম্বা পাকা তেঁতুলবিছে তাকে কামড়েছিল তখন তো ব্যথায় নাকি তার হার্টফেল করার কথা। কিন্তু সেই আশ্চর্য সাংঘাতিক ব্যথাও প্রায় নীরবে সহ্য করেছিল সে। পাড়ার লোক তাকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায় ভয় পেয়ে। সেখানকার ডাক্তারবাবু পর্যন্ত তাকে অবশ করার ইনজেকশন দেওয়ার সময়ে বলেছিল, এ ছেলেটির ব্যথা সহ্য করার শক্তি তো সাংঘাতিক! এসব কেসে ব্যথায় তো অনেকে মরেও যায়।
মরণ মরেনি। বরং তার মনে হয়েছে, সে এর চেয়েও বেশি ব্যথা অনায়াসে সহ্য করতে পারে। মানুষ ব্যথাকে খুব ভয় পায়। মরণ পায় না। বরং ব্যথাকে তার কখনও কখনও বন্ধু বলে মনে হয়।
আমগাছটা বড্ড পুরনো। বর্ষাকালে মনুপিসির এই আমগাছের কোটর থেকে সে একটা সাপকে বেরোতে দেখেছিল। কে জানে সাপটা হয়তো এখন কোটরের মধ্যে শীতঘুম ঘুমোচ্ছে। মোটা আমগাছটায় হালকা শরীরে দিব্যি উঠে গেল মরণ। কোমরে দা। ভীমরুলের মস্ত মাটির চাকটা অনেক ওপরে। এক-আধটা ভীমরুল থেকেও যেতে পারে হয়তো। কিন্তু এসব ভয় মরণের নেই। সে বিশাল চাকটাকে দা দিয়ে কুপিয়ে ভেঙে ফেলতে লাগল টুকরো টুকরো করে। একটু মায়াই বরং হচ্ছিল তার। কী সুন্দর মসৃণ চাকটা বানিয়েছে ভীমরুলরা, কত কষ্ট করে।
আর তখনই নীচের পুকুরে তাকিয়ে সে টুপুকে দেখতে পেয়েছিল। জলে ডুব দিয়ে উঠছে। লম্বা চুল লেপটে আছে গালে, কপালে। ভেজা ফ্রক আঁকড়ে ধরেছে লতানে শরীর। বুকে সদ্য ফুটে ওঠা দুটি স্তন। দেখতে নেই। ওসব দেখতে নেই। লজ্জার কথা। তবু কি চোখ মানে! পাপ হচ্ছে। শিবঠাকুর। শিবঠাকুর! বলে যে বিড়বিড় করল কয়েকবার। কিন্তু এ যেন আঠাকাঠিতে আটকে পড়া পাখি। তার চোখ বারবার ধেয়ে যায় টুপুর দিকে।–
ডুব দিয়ে উঠে ফের সাঁতার কাটছিল টুপু। গাঁয়ের মেয়েরা ভাল সাঁতার জানে না। ঘুপ ঘুপ করে জল ভেঙে ভেঙে এগোয়। আমগাছে ডালপালার আড়ালে বসে চোরের মতো দেখছিল মরণ।
নীচে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনুপিসি।
ও মরণ! সবটা ভেঙেছিস তো বাবা? ভাল করে জায়গাটা চেঁছে দে। বাসার গোড়া থাকলে আবার এসে জোটে।
না পিসি, আর জুটবে না। ভাল করে চেঁছে দিয়েছি।
তাহলে নেমে আয় বাবা। পরের ছেলে, পড়ে-উড়ে গেলে বড় পাপ হবে।
মরণ তবু একটু অপেক্ষা করল, টুপু জল থেকে উঠে গামছা নিংড়োচ্ছে, দুটো হাত তুলে মাথা মুছছে। চুলে গামছার ঝটকা মারছে। মুগ্ধ চোখে দেখছিল সে।
টুপুকে সে পুকুরে স্নান করতে দেখছে। টুপুর বয়স চৌদ্দ। তার চেয়ে দু বছরের বড়। কিংবা তাও নয়। এক বছর কয়েক মাস।
কেউ তাকে বারণ করেনি তবু তার মনে হয়, বড় মেয়েদের এভাবে দেখতে নেই। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকলে মেয়েরা রাগ করে। দোষ হয়। টুপু অবশ্য তেমন বড় মেয়ে নয়। মরণের চেয়ে একটু বড়। ওরও ক্লাস সিক্স। এই তো সেদিনও টুপু গোল্লাছুট কি দড়ি লাফানো কি চারা ছুঁড়ে এক্কাদোক্কা খেলত, দুই বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেত। কতবার তাদের বাড়ি এসেছে নুন, তেল, চিনি ধার করতে। মায়ের সঙ্গে ষোল গুটি খেলেছে দুপুরে। কখনও তাকিয়েও দেখেনি মরণ। আজ সেই গুয়ের গ্যাংলা মেয়েটার ভিতর থেকে কি রাজকন্যা বেরিয়ে এল? রাজকন্যা বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। রাজকন্যাদের থাকে দুধে-আলতায় গায়ের রং–সেটা কীরকম রং তা অবশ্য মরণ জানে না। আর থাকে কুঁচবরণ কেশ। কুঁচফল খুব চেনে মরণ, তাদের বাড়ির বেড়াতেই তো কত লতিয়ে ওঠে। ছোট্ট দানার আধখানা লাল, বাকি অর্ধেক কালো। এত সুন্দর ফল যে কেন খাওয়া যায় না কে জানে। কুঁচবরণ কেশ কি লাল না কালো তা নিয়ে ধন্ধ আছে মরণের। রাজকন্যাদের আরও কী কী সব যেন থাকে। না, টুপু মোটেই রাজকন্যার মতো নয়। তবু টুপুর ভিতর থেকে এক অচেনা টুপু বেরিয়ে এসে ওই চান করছে পুকুরের জলে। মরণ তাকে দেখছে, আর পাপ করছে। শিবঠাকুর এত পাপ সইবে কি? শিবঠাকুরকে তার বড় ভাল লাগে। সব দেবতার মধ্যে শিবঠাকুর তার সবচেয়ে প্রিয়। আর শিবঠাকুরকে মরণ যখনই ডাকে তখনই যেন এসে হাজির হন। না, চোখ খুললে দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু কষে চোখ বন্ধ রাখলে ঠিক তাঁর গায়ের সুন্দর বোঁটকা গন্ধটা পায় মরণ। শিবঠাকুর তো আর সাবান মাখে না, তার ওপর শ্মশান-মশানে পড়ে থাকে, গায়ে ছাই-টাই মাখে, বোঁটকা গন্ধ হতেই পারে। সেই গন্ধটা খুব ভাল লাগে মরণের।
