আর একটা হতাশার চড় তুলেছিল বুডঢা, অমল গিয়ে তাকে আটকাল। বলল, এসব করা ঠিক নয়। ঘরে যা, আমি দেখছি।
বুডঢাকে না আটকালে বুডঢা হয়ত আবার মারত। সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হত না। অবাঙালি ছেলেটা বুডঢার চেয়ে অনেক লম্বা এবং অ্যাথলেটিক চেহারার মানুষ। উলটে সে বুডঢাকে মারলে বিপদ ঘটবে। মারপিট ব্যাপারটা অমল একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
স্কাউলে! ইতর! বদমাশ! বলে গালাগাল দিতে দিতে বুডঢা গিয়ে তার ঘরে ঢুকে একটা বেসবল ব্যাট হাতে করে বেরিয়ে এল।
লোকটা অমলের দিকে সটান তাকিয়ে বলল, আপনার ছেলেকে ঝামেলা করতে বারণ করুন। আই অ্যাম সরি। আমি জানতাম এ-ফ্ল্যাট এসব কাজে ভাড়া দেওয়া হয়।
অমল শান্ত থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু উত্তেজনায় তার গলা কাঁপছে এবং স্বরভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। সে বলল, আপনি এই ফ্ল্যাটে আগেও এসেছেন?
তিন চারবার।
আমি যদি পুলিশ ডাকি?
ছেলেটা অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, ডাকলে ডাকবেন। কী আর হবে বলুন, পুলিশ কিছু টাকা খাবে। তার চেয়ে ইফ ইউ ওয়ান্ট মানি, আই শ্যাল পে ইউ। কেন ওসব ঝামেলায় যাবেন? এটা ফ্যামিলি অ্যাপার্টমেন্ট জানলে আমি আসতাম না।
এ-ফ্ল্যাটের সন্ধান আপনাকে কে দিয়েছে?
উনি। বলে পিউকে ইশারায় দেখিয়ে দিল।
পিউ বেরোতে পারেনি, কারণ, বুডঢা দরজাটা আটকে দাঁড়িয়েছিল তখন থেকে। সে দেওয়ালের দিকে সরে গিয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ।
এবার মোনা তাকে জিজ্ঞেস করল, এসব কী পিউ?
আই অ্যাম সরি বউদি। এক্সট্রিমলি সরি।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু সরি বললেই তো হল না। তুমি কী কাণ্ড করছ তা তুমি জানো?
আমি পরে এসে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলব। প্লিজ, এখন এটা নিয়ে চেঁচামেচি করবেন না।
মোনা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলল, পিউ, তোমার একটা পাঁচ বছর বয়সের মেয়ে আছে। তুমি একজন হাউজওয়াইফ। এই লোকটাকে কোথা থেকে জুটিয়েছ?
আপনাকে পরে বলব বউদি।
তুমি যেমন মেয়েই হও তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু ওসব নোংরামি আমার ফ্ল্যাটে কেন?
পুজোর সময় আপনারা অনেকদিন ছিলেন না। তখন বাসুদেব
ফ্ল্যাট খালি ছিল বলেই সেটাকে অপবিত্র করতে হবে? তোমার বিবেক কি তাই বলে?
পিউ আর কথা বলল না। চুপ করে নতমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মোনা অমলের দিকে চেয়ে বলল, তুমি থানায় ফোন করে দাও। পুলিশ এসে যা করার করুক।
এতক্ষণ বাদে হঠাৎ সোহাগ বলল, আমাদের ফোন তো ডেড।
তাহলে বুডঢা, তুই যা তো দারোয়ানদের ডেকে আন।
স্মার্ট ছেলেটা মোনার দিকে চেয়ে বলল, ম্যাডাম, ব্যাপারটা এত বেশি সিরিয়াসলি নিচ্ছেন কেন? আমি কলকাতায় একা থাকি। আই নিড গার্লফ্রেন্ডস।
তার জন্য তো হোটেল আছে, গেস্ট হাউস আছে, ব্রথেলস আছে। আমার ফ্ল্যাটে কেন, উড ইউ এক্সপ্লেন?
প্লেসটা মেয়েরাই ঠিক করে। ওটাই সিস্টেম। আপনার ফ্ল্যাটে আসাটা আমার ভুল হয়েছে বুঝতে পারছি। আমি বরং কিছু টাকা দিয়ে যাচ্ছি ফর এনি ড্যামেজ আই হ্যাভ ডান। লেট আস মেক পিস। ফাইফ থাউজ্যান্ড ম্যাডাম? ইজ দ্যাট ওকে?
এবার বেসবল ব্যাটটা নিয়ে আর একবার এগিয়ে এল বুডঢা। তাকে ফের ঠেকিয়ে অমল বলল, আপনার নাম কী?
অরুণ মালিক। বিজনেসম্যান। আমার কার্ডটা রেখে দিন বরং। নাথিং টু হাইড অন মাই সাইড। আমি পাটনার লোক। কলকাতায় মাসে দু-চারবার আসতে হয়।
ফুর্তি করতে নাকি?
না স্যার। বিজনেসে আসি।
ছেলেটা তার দামি ওয়ালেট খুলে একটা সুদৃশ্য কার্ড বের করে অমলের হাতে দিয়ে বলল, আই অ্যাম এ জেনুইন পারসন। নট এ ফ্রড। ইচ্ছে করলে আমার মোবাইল ফোন-এ আপনি পাটনার নম্বর ডায়াল করে জেনে নিতে পারেন।
আপনি ম্যারেড?
না স্যার। আমি এখনও ব্যাচেলর। পুলিশ ডেকে যদি ধরিয়ে দেন তাহলেও আমার কিছু হবে না। পুলিশ টাকা পেয়ে ছেড়ে দেবে, কেস দেবে না। তার চেয়ে আমি ফাইভ থাউজ্যান্ড অফার করেছি, প্লিজ হাস ইট আপ।
অমলের খুব ক্লান্ত লাগছিল। আজ সে অনেকক্ষণ টানা গাড়ি চালিয়েছে। চাইনিজ ডিনারটাও বেশি খাওয়া হয়ে গেছে। ঘুম পাচ্ছে। সে মোনার দিকে চেয়ে বলল, কী করবে মোনা?
তুমি কী করতে চাও?
বুঝতে পারছি না। এরকম অদ্ভুত সিচুয়েশনে তো পড়িনি কখনও।
ছেড়ে দাও। কিন্তু কাল সকালেই মিস্টার মজুমদারকে তুমি নিজে গিয়ে ব্যাপারটা জানাবে।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
এরপর লোকটার দিকে চেয়ে অমল বলল, নাউ ইউ মে গো।
হিপ পকেট থেকে একগোছা পাঁচশো টাকার নোট বের করেছিল ছোকরা। অমল সেদিকে তাকিয়ে বলল, আপনি খুব টাকায় বিশ্বাসী, না?
ছোকরা থমকে গিয়ে বলল, না স্যার, ব্যাপারটা ওভাবে নেবেন না। আই অ্যাম জাস্ট ট্রায়িং টু কমপেনসেট।
আপনার কি মনে হয় আমরা যে-শকটা পেয়েছি তা টাকা দিয়ে কমপেনসেট করা যাবে? বিশেষ করে আমাদের ছেলেমেয়েরা যে-শকটা পেয়েছে?
আই অ্যাম রিয়েলি সরি স্যার। ভেরি সরি।
টাকাটা পকেটে রেখে দিন। অ্যান্ড প্লিজ গেট আউট।
ইয়েস স্যার। অ্যাজ ইউ প্লিজ।
মোনা পিউয়ের দিকে চেয়ে বলল, তুমিও যাও।
মোনা আর অরুণ দুজনে দরজার দিকে নিঃশব্দে এগোল। দরজার কাছ থেকে ফিরে অরুণ হঠাৎ বলল, স্যার, যদি কিছু না মনে করেন তবে একটা কথা বলব?
কী?
শুনলাম আপনাদের ফোনটা খারাপ আছে। আপনি ইচ্ছে করলে আমার মোবাইল ফোনটা রেখে দিতে পারেন। রোমিং সিম কার্ড লাগানো আছে। আমার আরও দুটো মোবাইল ফোন আছে, কোনও অসুবিধে নেই। কয়েকদিন কাজ চালিয়ে নিন, আমি কাল সকালে চার্জারটা পাঠিয়ে দেব।
