বাবা, তুমি কি ড্রিংক করবে?
কেন রে? করলে আপত্তি আছে?
না। তবে গাড়ি চালিয়ে বাকি পথটা ফিরতে হবে তো!
মেয়ের দিকে চেয়ে হাসল অমল। তারপর হঠাৎ বলল, ঠিক আছে, আজ শুধু খাবারটাই খাই। দেখি হজম করতে পারি কিনা।
মোনা সামান্য আপত্তি করে বলল, তোমার পুরনো অভ্যাস। একদম ড্রিংক না করলে কি পারবে?
চেষ্টা করা যাক। বলে হাসল অমল।
বুডঢা মন দিয়ে মেনু পড়ছিল। বলল, আমি কিন্তু একটা চিংড়ি খাবোই। আর চাওমিন, তোমরা?
সোহাগ বলল, আমার টেস্ট বাড চেঞ্জ করে গেছে। আজ বড়মা কচুর শাক বেঁধেছিল। সেটা খেয়ে এত মুগ্ধ হয়ে গেছি যে এসব আমার ভাল লাগবে না। জীবনে খাইনি ওরকম জিনিস।
মোনা অমলকে বলল, তোমার মেয়ে কিন্তু আস্তে আস্তে গেঁয়ো হয়ে যাচ্ছে।
তা যাচ্ছি। উচ্ছে চচ্চড়ি, চাপর ঘন্ট, খেজুর গুড় চালতা আর নারকোল দিয়ে অম্বল, পাটিসাপটা ইট ওয়াজ এ রিয়েল ট্রিট।
অমল স্নিগ্ধ চোখে তার পরিবারটিকে দেখছিল।
হ্যাঁ গো, তুমি সত্যিই ড্রিংক করবে না?
না, আজ থাক। তেমন অসুবিধে বুঝলে বাড়িতে ফিরে শোওয়ার আগে একটু খেয়ে নেওয়া যাবে।
খেয়ে-দেয়ে বিল মিটিয়ে উঠতে রাত এগারোটার কাছাকাছি হল। বাড়ি ফিরতে সোয়া এগারোটা।
লিফটে ওপরে উঠে তার হ্যান্ডব্যাগ খুলে দরজার চাবি বের করল মোনা। বলল, হ্যাসবোল্ট দিয়ে না থাকলে বেচারাকে আর জাগানোর দরকার নেই।
হ্যাসবোল্ট দেওয়া ছিল না। চাবি ঘোরাতেই নিঃশব্দে দরজা খুলে গেল। বাঁদিকে পর পর দুখানা শোওয়ার ঘর দুই ভাইবোনের। ডানদিকে অমলের স্টাডি, হলঘরে মৃদু একটা বা জ্বলছে, আর পুরো ফ্ল্যাটটা অন্ধকার। বুডঢা আর সোহাগ তাদের ঘরে গিয়ে ঢুকল।
মোনা শোওয়ার ঘরের দরজায় চাবি দিয়ে খুলতে গিয়ে একটু থমকাল।
অমলের দিকে চেয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চুপ থাকতে ইশারা করে দরজায় কান পেতে কিছু শুনল।
তারপর ফিসফিস করে বলল, ভিতরে কারা আছে বলো তো!
অমল অবাক হয়ে বলল, কে থাকবে!
মেয়ের গলা শুনতে পাচ্ছি।
মাই গড!
দেখ তো, প্যাসেজের ঘরে বাসুদেব আছে কিনা।
অমল গিয়ে দেখল, বিছানা ফাঁকা।
স্কাউড্রেলটা কি বান্ধবী নিয়ে তাদের ঘরে ফুর্তি করছে। সেটা কি সম্ভব? গত দু বছর ধরে আছে, বিশ্বাসী ভাল লোক বলেই তো বিশ্বাস ছিল তাদের।
মোনা তার হাতে চাবিটা দিয়ে বলল, দুজন আছে। ডুয়িং সামথিং… দরজাটা তুমিই খোলো।
বুডঢা তার ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে।
এনিথিং রং ড্যাড?
কিছু সন্দেহ করে সোহাগও বেরিয়ে এল, কী হয়েছে মা? আমি দেখছি।
অমল চাপা গলায় বলল, তোরা ঘরে যা। বি অন দি সেফ সাইড। আমি দেখছি।
বুডঢা অবশ্য এগিয়ে এসে বলল, ইনট্রিউডার?
তাই মনে হচ্ছে।
অমল দরজাটা খুলল না। নক করল।
ভিতরে কথাবার্তা থেমে গেল। একদম চুপ।
অমল ফের নক করে বলল, দরজা খোলো।
কোনও কাজ হল না কথায়। অগত্যা অমল চাবি ঘুরিয়ে দরজাটা খুলে ফেলল।
ভিতরে আবছা আলোয় দুই নগ্ন নরনারী তাড়াতাড়ি তাদের পোশাক পরে নেওয়ার নিষ্ফল চেষ্টা। করছিল। অমল আলোটা জ্বেলে দিল।
দুটি নগ্ন নরনারী তাদের নগ্নতা ঢাকার ব্যর্থ চেষ্টা করতে গিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল।
অমল দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে বলল, আপনারা পোশাক পরে বেরিয়ে আসুন।
মোনা বলল, কারা?
অমল একটা মাথা নাড়া দিয়ে বলল, ছেলেটাকে চিনি না। মহিলা ওপরের তলার সুহাস মজুমদারের বউ।
কে! পিউ?
হ্যাঁ।
সর্বনাশ! পিউ কী করছিল আমার ঘরে?
ওকেই জিজ্ঞেস করো।
ছিঃ ছিঃ। সেই জন্যেই আমার শোওয়ার ঘরে মাঝে মাঝে কন্ডোম পাওয়া যায়! ছেলেটা কে?
কী করে বলব? তবে ভদ্রলোকের মতোই তো চেহারা।
সে ছেলেমেয়ের দিকে চেয়ে বলল, তোদের দেখলে লজ্জা পাবে। তোরা বরং একটু আড়ালে যা।
সোহাগ তেতো মুখে বলল, আমাদের ফ্ল্যাটে এসব কী হচ্ছে বলো তো! কেন এরকম হবে?
অমল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, বাসুদেব স্কাউড্রেলটাকে আজ রাতেই বিদেয় করে দেব বুঝলে?
মোনা বলল, বিদায় করব মানে? ওকে পুলিশে দেব। বুডঢা থানায় ফোন কর তো!
অমল বলল, প্লিজ! অতটা কোরো না। পুলিশ এলে বিচ্ছিরি লজ্জার ব্যাপার হবে।
হোক। তা বলে ছেড়ে দেব? কোথায় গেল বলো তো! নীচে গিয়ে কোথাও আড্ডা মারছে হয়তো।
ধীরে দরজা খুলে মাথা নিচু করে দুজন বেরিয়ে এল। ছেলেটি লম্বা, ফর্সা এবং সুপুরুষ। মেয়েটিকে তারা সবাই চেনে, ওপরের তলার পিউ। চমৎকার ফিগারের জন্য তার প্রশংসা হয়ে থাকে।
কোথাও কিছু না, হঠাৎ বুডঢা একটু খাপ্পা হয়ে এগিয়ে এসে লোকটাকে ঠাস করে একটা চড় মারল।
লোকটা পালাল না। দাঁড়িয়ে একটু অবাঙালি টানে বাংলাতেই বলল, মারছেন কেন? আমি কী করেছি?
কিছু করনি!
অন্যায় কিছু করিনি। এবাড়ির কেয়ারটেকারকে নগদ একশো টাকা দিয়ে তবেই ঢুকেছি। এতে অন্যায়ের কী আছে?
.
৫৮.
লোকটার সাহস এবং স্মার্টনেস দেখে অবাক হন অমল। একজন সৎ ও সাহসী লোকের যে-গুণগুলো থাকে আজকালকার বদমাইশরাও কি সেইসব গুণ অর্জন করছে নাকি? অন্যের ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ঢুকে অন্যের বিছানায় পরস্ত্রীর সঙ্গে ফুর্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। পরিস্থিতি ওর সম্পূর্ণ প্রতিকূল। এই অবস্থায় লোকে ঘাবড়ে যায়, তোতলায়, উলটোপালটা মিথ্যে কথা বলে, হাতে পায়ে ধরে বা কাকুতি-মিনতি করে। এ তো অকুতোভয়, বিন্দুমাত্র ঘাবড়ায়নি এবং বেশ হিসেব করে তেজের সঙ্গে মুখে মুখে জবাব দিচ্ছে! এর তো পিঠ চাপড়ে দেওয়া উচিত।
