না, আমার মোবাইল ফোনের দরকার নেই।
রেখে দিন স্যার। আমি কয়েকদিন পরে এসে নিয়ে যাব।
না, আমি আর আপনার মুখ দেখতে চাই না। প্লিজ গো।
অ্যাজ ইউ প্লিজ, বলে ছোকরা বেরিয়ে গেল। পিছু পিছু পিউ।
বুডঢার মুখ রাগে ফেটে পড়ছিল। বলল, তোমরা লোকটাকে ছেড়ে দিলে বাবা? ধোলাই দেওয়ার দরকার ছিল।
কী লাভ? একটা সিন ক্রিয়েট করা হত। লোকটা বদমাশ, কিন্তু ওর চেয়ে বাসুদেব বেশি ক্রিমিন্যাল। আর এই পিউ।
সোফায় বসে মোনা ক্লান্ত স্বরে বলল, আমার শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। বোধহয় প্রেশার বেড়ে গেছে।
সোহাগ গিয়ে তার মায়ের পাশে বেড়ালের মতো গুটিসুটি হয়ে বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, চলো আমার বিছানায় একটু শুয়ে থাকবে। ইউ লুক সিক!
ঘেন্নায় গা রি রি করছে। এই বেডরুমে আজ আর আমি ঢুকতেই পারব না। মা গো! কী জানোয়ার হয়ে গেছে মানুষ! আমি এখনও বুঝতে পারছি না, পিউ এরকম কাজ কী করে করতে পারে। দেখা হলে এমনিতে তো কত ন্যাকা ন্যাকা কথা!
এসব নিয়ে এখন ভাবতে হবে না। একটা সেডেটিভ খেয়ে শুয়ে থাকো। টেক রেস্ট।
মোনা উঠে অমলের দিকে চেয়ে বলল, বাসুদেব এখনও ফিরল না। ও ফিরলে আমাকে ডেকো তো।
অমল বলল, বাসুদেবের ফেরার চান্স খুব কম। আমরা যে এসে গেছি তা ও হয় দারোয়ানদের কাছে জেনে যাবে না হয় তো গ্যারাজে গাড়ি দেখে বুঝবে। সুতরাং হি উইল স্ক্র্যাম।
কী সাংঘাতিক শয়তান বলো তো!
তাই তো দেখছি।
তুমি বরং বাইরের ঘরে সোফাতেই শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দাও। কাল বেডরুম ভাল করে ডেটল ফিনাইল দিয়ে পরিষ্কার না করিয়ে ও-ঘর আমি ব্যবহার করব না। ওয়াশিং মেশিনে চাদর বালিশের ওয়াড় সব কাঁচতে হবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে। তুমি সোহাগের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে থাকো।
মোনা সোহাগের ঘরে গিয়ে শুল।
বুডঢা বলল, বাবা, সোফায় বরং আমি শুচ্ছি, তুমি আমার বিছানায় শুয়ে থাকো।
আরে না। আমার ঘুম চটে গেছে। আমি বরং বসে একটু বই-টই পড়ি, তুই শুয়ে পড় গিয়ে।
সবাই শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়ে পড়ল বোধহয়।
একা অমল বাইরের ঘরে সোফায় অনেকক্ষণ বসে রইল। নৈতিক অধঃপতনের কথাই ভাবছিল সে। অনেক বছর আগে সে কি ওই অরুণ মালিকের চেয়ে উচ্চতর মানুষ ছিল? এক দুরন্ত দুপুরের স্মৃতি যেন হাউড় বাতাসের মতো ধেয়ে এসে তার শ্বাসনালি আটকে দিচ্ছিল। তার হাতে একটি প্রস্ফুটিত ফুল্ল কুসুম ঝরে পড়ে গিয়েছিল। এক সুন্দরকে মলিন করে দিয়েছিল সে।
পতিতাগমনের অভ্যাস তার তৈরি হয়েছিল ইনজিনিয়ারিং পড়ার সময়েই। তারপর পারুল তাকে প্রত্যাখ্যান করায় প্রতিহিংসায় পাগলের মতো হয়ে সে আরও ভেসে গিয়েছিল। আজ মধ্যবয়স্ক, শান্ত ও নির্জীব বটে সে, কিন্তু অনেক প্রায়শ্চিত্তই তার বাকি।
তার কাল অতিক্রান্ত। অরুণ মালিকের মতো এ-যুগের লম্পটরা লুকোছাপার ধার দিয়েও যায় না। তাদের গোপন করার মতোও কিছু নেই। ধরা পড়লেও তারা চোখে চোখ রেখে দিব্যি ঠান্ডা মাথায় কথা কইতে পারে। এ-বিদ্যে অমলের নেই। আজ একটি ঘটনার গ্লানি তার গায়ে এঁটেল মাটির মতো লেগে আছে।
জেনারেশন গ্যাপটা বড় বিশাল। মাত্র কুড়ি বছরের তফাতে এ-দেশের মানুষ কত পালটে গেছে।
তার অন্যমনস্কতার সুযোগে চোখের সামনেই মানুষ কতটা পালটে গেছে তার প্রমাণ অমল পেল পরদিন সকালে।
পিউয়ের স্বামী সুহাস মজুমদার একজন চোখা চালাক মধ্য ত্রিশের লোক। বেশ স্মার্ট হাসিখুশি। ওদের ফ্ল্যাটে প্রায়ই পার্টি-টার্টি হয়। তার একটা কনসালটেনসি ফার্ম আছে বলে অমল জানে। তবে সেটা কীসের কনসালটেনসি তা জানা নেই। একখানা ফিয়াট গাড়ি আছে। সুতরাং পয়সাওলা লোক বলেই মনে হয়। এইসব তথ্য দিয়ে একটা মানুষ সম্পর্কে কোনও অঙ্কই মেলানো যায় না।
অঙ্কটা আজ সকালে আরও বিপথে চলে গিয়ে গোলমেলে হয়ে দাঁড়াল।
অমল মুখোমুখি সুহাসকে ব্যাপারটা বলতে সংকোচ বোধ করছিল বলে সকালে কাছে-পিঠের একটা বুথে গিয়ে ফোন করল।
সুহাসের আহ্লাদিত গলা বলে উঠল, হেল্লো! মজুমদার হিয়ার।
সুহাসবাবু, আমি অমল রায় কথা বলছি।
গলায় আরও একটু আহ্লাদ মিশিয়ে সুহাস বলল, আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন। কী খবর?
ইট মে বি শকিং টু ইউ। কীভাবে বলব তা ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু বলাটাও দরকার।
আরে, সংকোচ করছেন কেন? বলেই ফেলুন না।
ইট ইজ রিগার্ডিং ইওর ওয়াইফ পিউ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।
আমরা কলকাতায় ছিলাম না।
হ্যাঁ, আপনারা তো উইক এন্ডে কোথায় একটা র্যানচ হাউসে যান বলে শুনেছি।
র্যানচ হাউস নয়, আমাদের গ্রামে যাই।
দ্যাটস গুড। তারপর বলুন।
কাল একটু আন-এক্সপেকটেডলি আমরা রাত বারোটা নাগাদ ফিরে আসি। এসে দেখি আমাদের বেডরুমে পিউ আর একটি ছেলের সঙ্গে শুয়ে আছে।
সুহাস মজুমদারের শক অ্যাবজর্ভারগুলো বোধহয় খুবই ভাল। বিন্দুমাত্র না চমকে খুবই আপসোসের ভান করে একটা চুকচুক জাতীয় শব্দ করে সে বলল, দ্যাটস ব্যাড, ভেরি ব্যাড।
আপনি কি কাল রাতে বাড়িতে ছিলেন না?
ছিলাম। তবে নট ইন মাই সেনসেস। বুঝতেই তো পারছেন। তাজ-এ পার্টি ছিল। ড্রাইভার ধরে ধরে এনে ফ্ল্যাটে তুলে দিয়ে যায়।
বলে খুব আহ্লাদের হাসি হাসল সুহাস মজুমদার।
আপনার জানা দরকার যে ছোকরার নাম অরুণ মালিক।
ও। ইটস ওকে মিস্টার রায়। আমি দেখছি।
