কিছু বলছ?
হ্যাঁ। কিছু যদি মনে করে তা হলে একটা কথা বলব?
অমল আজকাল তার বউয়ের সঙ্গে বাক্য ব্যবহারে সতর্ক হয়েছে। মাইন পাতা জমির ওপর দিয়ে যেমন পা টিপে টিপে হিসেব করে হাঁটতে হয় ঠিক তেমনভাবে। এই সতর্কতার সুফলও সে পায় আজকাল, ঠিক কথা, তাদের মধ্যে নতুন করে প্রেম জন্মায়নি, মানসিক দূরত্বও দুস্তর। কিন্তু আজকাল তারা মিলেমিশে থাকছে। এ ব্যাপারে মোনাও কি তারই মতো সতর্ক নয়? হ্যাঁ, হয়তো মোনাও দাম্পত্যটাকে অক্সিজেন দেওয়ার চেষ্টা করছে।
অমল অমায়িক হেসে বলল, কী ব্যাপার?
আমাদের তো উইক এন্ড শেষ করে আগামীকাল কলকাতায় ফেরার কথা।
হ্যাঁ।
কিন্তু আমার একদম মনে ছিল না, আগামীকাল সকাল নটায় পার্ক স্ট্রিটে আমার একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে। ডাক্তার বিমল সেনের সঙ্গে।
অবাক হয়ে অমল বলে, ডাক্তার! ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপয়েন্টমেন্ট কেন! কী হয়েছে তোমার?
মোনা ম্লান একটু হেসে বলল, কাছে থেকেও তো আমার খোঁজ রাখো না। হয়েছে একটা কিছু। মেয়েলি ব্যাপার। বিমল সেন ভারী ব্যস্ত ডাক্তার। কালই বিদেশে চলে যাবে। অ্যাপয়েন্টমেন্টটা মিস করা চলবে না।
অমল মোনার দুটো বাহু দুই হাতে ধরে বলল, খুব গুরুতর কিছু নয় তো মোনা? সিরিয়াস কিছু নয় তো!
মোনা হেসেই বলল, তা কী করে বলব? তবে প্রবলেম একটা হচ্ছে।
অমলের মুখ শুকিয়ে গেল। ভালবাসা থাক বা না-থাক, সে কোনও জনকে হারাতে চায় না। মোনা ডিভোর্স করবে বলে হুমকি দেওয়াতেও তার ভুবন শূন্য হয়ে গিয়েছিল। বড্ড অসহায় লেগেছিল তখন। এখন আবার কী বিপত্তি হল কে জানে!
মোনা মায়াভরে একটু হেসে বলল, টেনশনের মতো কিছু হয়নি এখনও। ডাক্তার দেখালে ব্যাপারটা পরিষ্কার বোঝা যাবে।
তা হলে আমাদের তো আজই কলকাতায় ফেরা উচিত।
হ্যাঁ। তবে তাড়াহুড়ো নেই। সন্ধেবেলা রওনা হলেই হবে। গাড়িতে তো মোটে আড়াই ঘণ্টার রাস্তা। এখন তো সবে সকাল।
তা হলে বাসুদেবকে একটা ফোন করে দাও।
ফোন করে লাভ নেই। আমাদের লাইনে কেবল ফল্ট হয়েছে। সাত দিনের ধাক্কা ধরে রাখো।
ঠিক আছে।
তোমার মন খারাপ হল না তো! উইকএন্ডটা এখানে এসে থাকতে তোমার ভাল লাগে।
না মোনা। মন খারাপ হবে কেন? একটা তো মোটে রাত। বরং তোমার কথা শুনে মনটা একটু আপসেট লাগছে।
মেয়ে একটু আপসেট হবে। সে তো এখানে এসে পিসি, পান্না, বড়মা এদের নিয়ে মজে থাকে। সি এনজয়েস হিয়ার ভেরি ম্যাচ।
প্রতি উইক-এই তো আসছি আমরা। ওটা কোনও ব্যাপার নয়। বুঝিয়ে বললেই বুঝবে। ওকে বলেছ তোমার অসুখের কথা?
না। কী জানি কেন, দেখেছি অসুখ শুনলেই সোহাগ কেমন নার্ভাস হয়ে যায়। বিশেষ করে আমার।
শি লাভস ইউ।
এমনিতে তো আমি ওর চোখের বিষ। লোককে বলে, আমি এবং আমরা কেউ নাকি ওকে পছন্দ করি না, ঘেন্না করি।
সেটা ওর বুঝবার ভুল!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মোনা বলল, ভুল বোঝার তো শেষ নেই। তবে আমাকে একটুও পছন্দ করে বলে মনে হয় না। কিন্তু অসুখ-বিসুখ করলে খুব ঘাবড়ে যায় দেখেছি। রীতিমতো আপসেট। তাই মনে হয় একটু মায়া হয়তো আছে।
অমল একটু হাসল মাত্র। বেশি ব্যাখ্যায় গেল না। সে দেখেছে বেশি ব্যাখা-ট্যাখ্যা করতে গেলেই নানা রকম অনভিপ্রেত কথার সৃষ্টি হয় এবং তর্ক ঝগড়া ঘুলিয়ে ওঠে।
অমল শুধু বলল, ঠিক আছে। বিকেল পাঁচটা ছটা নাগাদ বেরোলেই হবে। ফেরার পথে পার্ক স্ট্রিট বা কোথাও ডিনার সেরে নিয়ে বাড়ি ফিরব। কী বলে?
সেটাই ভাল। ওরাও চাইনিজ-টাইনিজ খেতেই ভালবাসে।
অপু তার নিশ্চিন্দিপুর খুঁজতে বেরিয়ে পড়ল। মোনাকে বলল, একটু ঘুরে আসছি। অপু তার নিশ্চিন্দিপুরকে কখনওই আর খুঁজে পাবে না, অমল তা জানে। একমাত্র অন্ধই খুঁজে পায়। সে তার মনের মধ্যে সব গড়ে নিতে পারে।
বিকেলে রওনা হল তারা। আসার সময় ড্রাইভার ছিল। কিন্তু সে থাকেনি। ছুটি নিয়েছে দুদিনের। তাতে অসুবিধে নেই। অমল ভালই চালায়। তবে অভ্যাস কম।
সোহাগ বলল, বাবা, পারবে তো!
খুব পারব।
বুডঢা বলল, দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়েতে কিন্তু আমি চালাব বাবা।
সেটা কি ঠিক হবে? তোর লাইসেন্স নেই।
তাতে কি? ওখানে পুলিশ-টুলিশ থাকে না। আর আমি তো ভালই চালাই।
ঠিক আছে। চালাস কিছুক্ষণ।
শুধু এ ব্যাপারে নিস্পৃহ রইল সোহাগ। সে যন্ত্রপাতি পছন্দ করে না তেমন। গাড়ি চালানোর আগ্রহ তার কখনওই হয়নি।
সে বলল, আজ আমরা কোথায় খাব বাবা?
তোরাই ঠিক কর না।
বুডঢা বলল, তোমরা যাই বলল, আমার ফ্যানটাস্টিক লাগে ধাবা। ধাবার রান্না খেলে অন্য কিছু মুখে লাগে না।
সোহাগ বলল, তোর ধাবা ভাল লাগবে না কেন, তুই তো একটা ছোটোলোক।
তুই খাসনি, তাই বলছিস।
যত তাড়াতাড়ি ফেরা যাবে ভেবেছিল তারা তত তাড়াতাড়ি হল না। ট্রাকের একটা লম্বা জ্যাম পেরোতে গিয়ে ঘণ্টা খানেক মার খেয়ে গেল। তাও নটার মধ্যে পার্ক স্ট্রিটে ঢুকে গেল তারা।
নিজের পরিবারটিকে এতকাল অনুভবই করত না অমল। কত ছাড়া ছাড়া ছিল তারা, কত আলগা ছিল সম্পর্ক। এখন ততটা নয়। কোনও না কোনও সূত্রে তারা একটু কাছাকাছি হচ্ছে। পরস্পরের সঙ্গে তাদের বাক্য বিনিময় একসময়ে এত কম ছিল যে, বোবার বাড়ি মনে হত। এখন ততটা হয় না। পরস্পরের মধ্যে একটা আনন্দিত হাই-হ্যালো সম্পর্ক তৈরি হচ্ছে। ঠিক বেঁধে ওঠেনি এখনও। তবু হচ্ছে। প্রগ্রেস ভালই।
