বুড়ো লোকটা মাথা নেড়ে বলল, না, নিশ্চিন্দিপুর কখনও মরে না। ওটা এক আশ্চর্য জায়গা। যত দিন আমি আছি, ততদিন মরবে না। কোল পেতে বসে থাকবে আমার জন্য।
আমার যে খিদে পাচ্ছে দাদু, পা ব্যথা করছে।
খিদে! খিদের কথা বললি নাকি?
বললুম তো।
সেই খিদের গল্পই তো আমাদের সবার গল্প। সারা নিশ্চিন্দিপুর কেবল এক-পেট খিদে নিয়ে বসে থাকত। সকলের খিদে পেত, কেবল খিদে পেত। খিদে কিছুতেই মিটত না। আর ওই খিদে থেকেই তৈরি হত আমাদের গল্প। কত কত গল্প রে! বাঁচার গল্প, মরার গল্প। প্রেম ভালবাসার গল্প। সব কিছুর গোড়ায় ওই এক বাটি খিদে।
এক বাটি খিদে কী গো! খিদের কি বাটি থাকে?
থাকে রে থাকে। নিশ্চিন্দিপুরের যিনি ভগবান তিনিই গাঁয়ের মাঝ মধ্যিখানে কোথায় যেন খিদের বাটিটা লুকিয়ে রেখে দিয়েছিলেন। আর আমরা সারাদিন ধরে সেই বাটিটা খুঁজে বেড়াতাম। আজও তার সন্ধান মেলেনি। কিন্তু বাটি একটা ঠিকই আছে কোথাও।
হ্যাঁ দাদু, নিশ্চিন্দিপুরের ভগবানও কি আলাদা?
তা বইকী! সব জায়গারই আলাদা আলাদা ভগবান। যে যার নিজের ভগবান খুঁজে নেয়। ও তুই বুঝবি না।
ও দাদু, রোদে মাথা গরম হয়ে ভুল বকছ না তো!
ভুল! সেও কি আর বকি না! যত ভুল বকি, ভুল করি, ভুল পথে চলে যাই, চারদিকে কত ভুল কথা, ভুল কাজ, ভুল পথ। ভুল তো হতেই পারে। হ্যাঁ রে, গোরুর গলার একটা ঘণ্টি শুনলুম না!
হ্যাঁ তো।
ওটা আসলে কী যাচ্ছে রে! আমি একটা ছিলছিলে শব্দ শুনতে পাচ্ছি রে।
ও বাবা, মস্ত একটা সাপ যে গো! দাঁড়াশ সাপ।
অন্ধ মানুষটি আনন্দে চিৎকার করে উঠল, ওই! ওই তো এসেছে আমাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে। চল চল, ওর পিছু ছাড়িস না। ওই নিয়ে যাবে নিশ্চিন্দিপুর।
খানিকক্ষণ তারা পড়ি কি মরি করে হাঁটল।
ধুস, সাপটা যে গর্তে ঢুকে গেল গো দাদু!
ঢুকে গেল! তা হলে দাঁড়া। এইখানেই!
এইখানে কী?
এটাই নিশ্চিন্দিপুর। কী দেখছিস বল তো!
এ তো একটা মাঠ, আগাছার জঙ্গল! আর কিছু নেই।
দূর বোকা! ভাল করে দ্যাখ। ওই বাঁদিকে তাকালে শিবমন্দির। সামনে ওই একটা দোতলা বাড়ি দেখছিস না, ওরাই নিশ্চিন্দিপুরের সবচেয়ে বড় মানুষ। আর ওই আশ-শ্যাওড়ার জঙ্গলটা দেখছিস, ওটা পেরোলেই মজা পুকুর। তার ডান পারে আমাদের বাড়ি। দেখ না ভাল করে।
ধুস! কোথায় কী গো!
ওই শুনছিস, কে যেন বলে উঠল, অপু এলি? শুনলি না।
না দাদু। আমার একটু ভয়-ভয় করছে।
বোকা ছেলে, ভয়ের কী? এবার বাতাসে কান পাত। গাছের পাতায় ফিসফিস শব্দ হচ্ছে, ওই আমাদের অপু!
তোমার মাথা ঠিক গরম হয়েছে দাদু।
না রে, না। আমি এসেছি বলে নিশ্চিন্দিপুরের আকাশে বাতাসে জলে স্থলে যে সাড়া পড়ে গেছে। সবাই কেমন খুশি, ডগমগ করছে টের পাচ্ছিস না?
আমি শুধু কাকের ডাক শুনতে পাচ্ছি গো।
ভাল করে দেখ, সব আছে। সব ঠিক সেই আগের মতোই আছে। ভাল করে ঠাহর করে দেখ তো, একজন বুড়ো মানুষকে কোথাও দেখা যাচ্ছে কি না! অল্প অল্প খোঁচা খোঁচা দাড়ি, রোগা, চোখটা একটু ঘোলাটে, গাঁয়ে ছেঁড়া গেঞ্জি, পরনে হেঁটো ধুতি। দ্যাখ কোথাও গাছতলায় বসে আছে কি না, নয়তো কাঠকুটো কুড়িয়ে বেড়াচ্ছে, কিংবা মাঠের ধারে দাঁড়িয়ে আকাশ পানে চেয়ে আছে।
কেউ কোথাও নেই।
তোর একদম চোখ নেই!
ওই বুড়োমানুষটা কে গো দাদু? কার কথা বলছ?
ওই হল নিশ্চিন্দিপুরের ভগবান। আমাদের গরিব গাঁ তো, তাই আমাদের ভগবানও বড্ড গরিব। ছেলেবেলায় কতবার তাকে দেখেছি।
কথা বলেছ?
না। কথা বলতে গেলেই একটু হেসে পালিয়ে যেত। তার ভয় ছিল আমরা পাছে নালিশ করি।
কী নালিশ ছিল তোমার?
কত নালিশ! খিদের কথা, অভাবের কথা, আকালের কথা, রোগভোগের কথা, নির্যাতনের কথা। ভাল কথাও ছিল অনেক বলবার মতো। কী সুন্দর জংলা ফুল ফুটত, গাছে ফল হত, শরৎকালে কী সুন্দর আলো হত!
না গো, তোমার বুড়ো ভগবানকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তোমার ভয়ে সে তা হলে পালিয়ে গেছে।
না রে। সে পালাবে কোথায়? নিশ্চিন্দিপুর ছেড়ে সবাই চলে গেলেও তার যে পালানোর উপায় নেই। সে যে ঘুরে ঘুরে নিশ্চিন্দিপুরের ঘরে ঘরে কখনও দুঃখ, কখনও আনন্দ ছড়িয়ে দিয়ে আসে। সে কত কী চুরি করে নিয়ে চলে যায়, আবার কত কী পূরণও করে দিয়ে যায়।
এই খাড়া দুপুরে মাঠের মধ্যে আর কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকবে গো দাদু? ফিরে চলো।
ফিরে যাবো? কী যে বলিস, তুই এখানে একটু দাঁড়া। আমি সবার সঙ্গে দেখা করে আসছি।
কার সঙ্গে দেখা করবে! এ যে পতিত একটা জায়গা। কেউ কোথাও নেই।
ওই চোখ দিয়ে কি দেখা যায়? আমার চোখ হলে দেখতে পেতি।
তুমি কী করে দেখছ দাদু? তুমি যে অন্ধ!
কে বলল আমি অন্ধ! আমি যে সব স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আজ। নিশ্চিন্দিপুরের ভগবান আজ আমাকে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিয়েছে যে। বাতাসে বলে পাঠিয়েছে আজ তুই দেখতে পাবি। দাঁড়া না, একটু দাঁড়া। আমি দৌড়ে যাব, আসব।
বেশি দেরি কোরো না কিন্তু। দেরি দেখলে আমি ঠিক পালিয়ে যাবো।
তাই যাস। নিশ্চিন্দিপুর যদি আমাকে তার বুকের মধ্যে রেখে দেয় তা হলে তুই একা ফিরে যাস। অন্ধ মানুষটি এগিয়ে গেল। বড় আনন্দ, বড় চঞ্চলতা।
ছেলেটা দাঁড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। দাদু ফিরল না। আর ফিরল না। কোনওদিনই আর ফিরল না।
শোনো! একটা কথা বলছি।
অমল তার আচ্ছন্ন চোখ তুলে মোনার দিকে চাইল।
