ওই কথা কইয়েন না খুড়া, মাইনসে খায় নিজের কপালে।
হালুয়াই চেচেপুঁছে খেল ধীরেন। তারপর চা। লজ্জা হল না তো! লজ্জা-লজ্জা করছেও না তার।
চিন্তা কইরেন না খুড়া। মরণরে পাঠাইয়া দিছি, খুড়িমারে কইয়া আইতে যে আপনে আইজ দুফুরে এইখানে খাইবেন।
ধীরেন একটু ভাবল। আধখানা ডিম বরাদ্দ ছিল আজ। তার বাড়িতে ডিমের ঝোলে তেমন মশলাপাতি পড়তে পায় না। ট্যালট্যালে ঝোল হয়। তাও কিছু খারাপ লাগে না তার। সকাল থেকে ডিমের জন্য মনটা প্রস্তুত হয়ে ছিল বলে একটু খারাপ লাগল ধীরেনের। ভাগের ডিমটা ফাঁকই গেল আজ।
তার বদলে দুপুরে চিতলের পেটি ধীরেনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিল বটে, কিন্তু তবু খুব সূক্ষ্মভাবে একটা অভাববোধও কাজ করছিল। তার বরাদ্দ আধখানা ডিম কি তার জন্য অপেক্ষায় ছিল না!
কত কী চোখে পড়ছে আজকাল তার! চালে লাউডগার মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা কচি লাউ, ওই উঁচু আমগাছের জটিল ডালপালার মধ্যে একখানা মৌচাক। দোতলায় একটা দরজার ওপর একটা ঘোড়ার নাল লাগানো। কই, এসব তো এতদিন চোখে পড়ত না।
এই চোখেই ধীরেন বিকেলে কাঞ্জিলালের পোড়ো জমিটার ধারে একটা মেয়েকে একা বসে থাকতে দেখল। কী যে সুন্দর মেয়েটা! টকটক করছে গায়ের রং, তেমনি সুন্দর মুখের ডৌল। ভারী আনমনে বসে আছে।
ধীরেন দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখল। মেমসাহেব নয় তো!
একটু চেনা-চেনাও ঠেকছিল যেন! কে মনে পড়ছে না।
তারপর মনে পড়ল। এ তো মহিমার নাতনি!
দেখেছে বটে, তবে আবছা চোখে এতদিন বুঝতেই পারেনি যে মেয়েটা এত সুন্দর।
এই যে এইসব সুন্দর ছেলেমেয়ে এরা যে কোথা থেকে আসে কে জানে! ওই যে ক্ষুরধার বুদ্ধির মানুষ, ওই যে রবি ঠাকুর বা আইনস্টাইন, কিংবা যে লোকটা এরোপ্লেন বানিয়েছে এরাই বা হয় কী করে? এই যে তারা কালো ময়লা খবঁটে হাঁদা মানুষ, সাহেবরা তো এমন নয়। তারা কেমন ফর্সা, তাগড়াই, বুদ্ধিমান মানুষ। এই যে এত তফাত এইটেই ভারী অবাক করে দেয় ধীরেনকে।
সন্ধের পর মহিম ঘরেই ছিল। সাড়া পেয়ে বলল, আয় ধীরেন।
ধীরেন ঢুকে দেখল, গরম চাদরে মুড়িসুড়ি দিয়ে মহিম রায় বসা।
আজ যা শীত পড়েছে, হাতে পায়ে যেন সাড়া পাচ্ছি না।
ধীরেন বলল, তা পড়েছে।
তোর তো গায়ে তেমন কিছুই নেই দেখছি। ওই ছেঁড়া হাফ সোয়েটারে শীত মানে?
ধীরেন লজ্জা পেয়ে বলে, তা মানে।
বলিস কী?
ধীরেন বলল, শীত করতে করতে এক সময়ে আর করে না। এক জায়গায় থেমে যায়। শীতেরও তো ধৈর্যের শেষ আছে।
ভাল বলেছিস। চা খাবি?
তা একটু হলে হয়।
ভুল বললুম। চা নয়, কফি।
ও বাবা, সে তো তোফা জিনিস।
নাতনি এবার নিয়ে এসেছে আমার জন্য। একটা হিটার আর সসপ্যানও এনেছে। যা, ওই টেবিলে সব আছে। হিটার জ্বালিয়ে জল বসিয়ে দে তো।
বাঃ, এ তো দিব্যি ব্যবস্থা।
হ্যাঁ। নাতনি বলে, তোমার আর একটু ভাল থাকা উচিত।
বলে বুঝি? দেখতেও হয়েছে মেমসাহেবের মতো। বিকেলে কাঞ্জিলালের মাঠে বসেছিল। যেন পদ্মফুল।
মেয়েও বড্ড ভাল। আগে একটু সাহেবি ভাব-টাব ছিল, এখন ঝরে গেছে।
দুজনে মিলে কফি বানিয়ে খেল। ধীরেনের সবই ভাল লাগে। কফিটাও লাগল। বেজায় ভাল জিনিস।
চোখটা কেমন আছে রে?
একগাল হেসে ধীরেন বলল, চোখের কথা আর কবেন না দাদা। এত দেখছি যে অবাক কাণ্ড! দেখে দেখে যেন আর কূল করতে পারছি না।
এত দেখতে দেখতেই ফিরছিল ধীরেন। রাত হয়েছে। চারদিকে কুয়াশা। তার ফাঁকেই চাঁদ উঠেছে ঠেলে। চারদিকে কুয়াশামাখা জ্যোৎস্না যেন দুনিয়া ছাড়া জিনিস। এরকম জ্যোৎস্না বিলেতে-টিলেতে ওঠে। এদেশের জিনিসই নয়।
আচমকাই যেন বাতাসে একটা ঢেউ দিয়ে কে যেন তার পাশে চলে আসে। পায়ে পায়ে চলে তার সঙ্গেও।
ধীরেন, মেরে ফেললি আমাকে?
সে কবেকার কথা, অত কি মনে রাখতে আছে দাদা?
কিন্তু এখনও ব্যথা করে যে রে! এখনও যে দম বন্ধ হয়ে আসে।
ওসব বোলো না। তুমি কি কিছু কম করেছ?
করব না! আমার বউয়ের সঙ্গে নষ্টামি করলি, তাই তো ওকে মারলুম। আমার সংসার ভাসিয়ে দিলি তুই।
ও মেয়েছেলেকে কি সামলাতে পারতে মিদ্দার দাদা? ও ছিল কেউটে। সাপের মন্তর না জানলে কি বশ করা যেত ওকে?
.
৫৭.
একজন অন্ধ মানুষ নিশ্চিন্দিপুর যাবে বলে বেরিয়েছে, সঙ্গে একটা বাচ্চা ছেলে। তারা হাঁটছে আর হাঁটছে।
ও দাদু, আর কতদূর গো? বেলা যে মজে এল!
ওরে, দূর বইকী! সোজা দূর! অনেক দূর চলে গিয়েছিলুম যে নিশ্চিন্দিপুর থেকে।
ওই যে একটু আগে চাষি লোকটা বলল, আর একটুকুন পথ! তা সেই একটুকুন পথ তো কখন ফুরিয়ে গেছে! তুমি তা হলে ছাড়িয়ে এসেছ নিশ্চিন্দিপুর। চোখে তো দেখতে পাও না, তাই বুঝতে পারোনি।
পাগল! তাই কখনও হয়! নিশ্চিন্দিপুর এলে আমি ঠিক বুঝতে পারব।
কী করে পারবে? নিশ্চিন্দিপুরের হাওয়াবাতাস কি অন্যরকম, নাকি তার কোনও আলাদা গন্ধ আছে? তুমি টের পাওনি।
তাই কি হয় রে! আমি নিশ্চিন্দিপুরে পা দিলেই পুরনো সব গাছপালা ফিস ফিস করে বলে উঠবে, ওই আমাদের অপু। নিশ্চিন্দিপুরের মাটি ঠিক বলে উঠবে, অপু এলি বাবা? বাতাসে মায়ের গায়ের গন্ধ পাবো ঠিক। বাবার কাশির শব্দ, দিদির কান্না সব এখনও নিশ্চিন্দিপুরের বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। তুই বুঝতেও পারবি না সেসব। আমি কিন্তু ঠিক শুনতে পাবো।
ওরকম হয় নাকি! গাঁ কি কাউকে মনে রাখে! তোমার নিশ্চিন্দিপুর নিশ্চয়ই হেজেমজে গেছে। কেউ নেই সেখানে। আমাদের পটাশপুরে সেবার কলেরা হয়ে সবাই মরে গেল। গাঁ উজাড় হয়ে গেল। তারপর আগাছা হল, জঙ্গল হল, সাপ-খোপের বাসা হল।
